ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিকল্প জ্বালানি উৎসের খোঁজে ছুটছে বিভিন্ন দেশ। এই পরিস্থিতিতে সরবরাহব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসছে। চলতি মাসে ভারত যেসব দেশ থেকে অপরিশোধিত তেল কিনেছে, তার মধ্যে তৃতীয় বৃহত্তম উৎস এখন ভেনেজুয়েলা। জ্বালানি পরিবহন-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলের তুলনায় চলতি মে মাসে ভারতে ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ।
ভেনেজুয়েলার তেলের সম্ভাবনা
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি তেলের মজুত রয়েছে ভেনেজুয়েলায়। দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশের মাটির নিচে আনুমানিক ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল তেলের মজুত রয়েছে, যা বিশ্বের মোট তেলসম্পদের প্রায় ১৭ শতাংশ। অর্থাৎ সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও বেশি তেলের মজুত আছে দেশটিতে। তবে দীর্ঘদিনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও সরকারি অব্যবস্থাপনার কারণে ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মার্কিন কৌশল ও ভারতের ভূমিকা
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় বৈশ্বিক তেলের বাজারে সরবরাহ কমে আসছে। এই প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটন আবারও ভেনেজুয়েলার তেল বৈশ্বিক বাজারে নিয়ে আসতে আগ্রহী। চলতি বছরের জানুয়ারিতে মার্কিন বাহিনী কারাকাস থেকে ভেনেজুয়েলার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের পর যুক্তরাষ্ট্র দেশটির তেল খাতের নিয়ন্ত্রণ নেয়। বিশ্লেষকদের ধারণা, মূলত ইরান যুদ্ধের কারণে যে তেল সংকট হবে, সেই হিসাব মাথায় রেখেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এভাবে ভেনেজুয়েলার তৎকালীন প্রেসিডেন্টকে অপহরণ করে নিয়ে আসে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলের মজুত এখন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে। যদিও এই তেল উত্তোলন করতে সময় লাগবে।
ভারতের তেল আমদানি ও ভূরাজনীতি
ইরান যুদ্ধের জেরে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক জ্বালানিসংকটের মধ্যে ভারত রাশিয়া থেকে আরও বেশি তেল কিনছে। এতে ওয়াশিংটনের বিরক্তি বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এই তেল বিক্রির আয় ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার ব্যয় মেটাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ফেব্রুয়ারিতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, রাশিয়ার তেল কেনা কমিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলা থেকে বেশি তেল আমদানি করবে ভারত।
ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে ইউরোপের বাজার অনেকটাই হারিয়েছে রাশিয়া। ফলে ভারত ও চীন এখন রাশিয়ার তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। ছাড়মূল্যে বিপুল পরিমাণ তেল কিনে ভারতও লাভবান হয়েছে। এখন মার্কো রুবিও বলছেন, ওয়াশিংটন চায় ভারত সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করুক।
হরমুজ সংকটে ভারতের ওপর প্রভাব
সাধারণত ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় অর্ধেকই হরমুজ প্রণালি হয়ে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে আসে। একই পথে আসে বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও পেট্রোলিয়াম গ্যাস। কিন্তু ইরানকে ঘিরে সংঘাত তীব্র হওয়ায় এই নৌপথ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। সাত বছর বিরতির পর সীমিত পরিসরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ায় ভারত গত এপ্রিলে আবার ইরান থেকে তেল আমদানি শুরু করে। কিন্তু চলমান মার্কিন নৌ অবরোধের কারণে এ মাসে ইরান থেকে ভারত কোনো তেল পায়নি। একই সময়ে ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম সরবরাহকারী সৌদি আরব থেকেও তেল সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
ভারতের উদ্বেগ ও বিকল্প খোঁজা
উপসাগরীয় অঞ্চলের সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ভারত। দেশটির ১৩টি জাহাজ ওই অঞ্চলে আটকে আছে। ভারতীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাহাজগুলো নিরাপদে ফিরিয়ে আনার আগে নতুন কোনো জাহাজ পাঠাতে চায় না নয়াদিল্লি। সম্প্রতি হরমুজ প্রণালি ও ওমান উপকূলের কাছে ভারতের বা ভারতের তেল পরিবহনকারী বেশ কয়েকটি জাহাজ হামলা বা জব্দের শিকার হয়েছে। এই অস্থিরতার কারণে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা মারাত্মক চাপে পড়েছে এবং বিকল্প তেলের চাহিদা বেড়েছে। ফলে ভেনেজুয়েলার মতো দেশগুলোর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ও ভেনেজুয়েলার তেল
মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের (ইআইএ) তথ্য অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল প্রমাণিত তেলের মজুত রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটি বর্তমানে বৈশ্বিক সরবরাহের ১ শতাংশেরও কম তেল উৎপাদন করে। ২০০৭ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজ ভেনেজুয়েলার তেল খাতের বড় অংশ জাতীয়করণ করেন। এর জবাবে ওয়াশিংটন সময়-সময় কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। বর্তমানে ভেনেজুয়েলায় কার্যক্রম চালানো একমাত্র বড় মার্কিন তেল কোম্পানি শেভরন।
ভেনেজুয়েলার তেল আন্তর্জাতিক বাজারে ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র একাধিক লক্ষ্য অর্জন করতে চাইছে। একদিকে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনায় ইরানের প্রভাব কমানো, অন্যদিকে ভেনেজুয়েলার জ্বালানি খাতকে আবার মার্কিন পুঁজির প্রভাববলয়ে নিয়ে আসা।
ভেনেজুয়েলার তেলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক
ভেনেজুয়েলার তেল খাতের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ওএনজিসি ২০০৮ সালে ভেনেজুয়েলায় বিনিয়োগ শুরু করে। ২০১০ সালের মধ্যে ভারতীয় কনসোর্টিয়াম ওরিনোকো অয়েল বেল্টের কারাবোবো-১ প্রকল্পসহ কয়েকটি বড় প্রকল্পে অংশীদারত্ব অর্জন করে। ২০১২ সালে চীনকে ছাড়িয়ে ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে বড় এশীয় তেল আমদানিকারক হয় ভারত। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা কঠোর হওয়ার আগে ভেনেজুয়েলা ছিল ভারতের অন্যতম বড় তেল সরবরাহকারী। কিন্তু পিডিভিএসএর ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর যুক্তরাষ্ট্রের পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি এড়াতে ভারতীয় শোধনাগার ও ব্যবসায়ীরা তেল কেনা কমিয়ে দেয়।
পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে চলতি বছরের জানুয়ারিতে। মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্র তুলে নিয়ে যাওয়ার পর কারাকাসে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নতুন তেল সরবরাহের চুক্তি করে ভারত। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসে ভেনেজুয়েলা থেকে ভারত দৈনিক প্রায় ৪ লাখ ১৭ হাজার ব্যারেল তেল আমদানি করেছে, যা এপ্রিল মাসে ছিল ২ লাখ ৮৩ হাজার ব্যারেল।
রুশ-ভারত সম্পর্কে প্রভাব
ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে ইউরোপের বাজার অনেকটাই হারিয়েছে রাশিয়া। ফলে ভারত ও চীন এখন রাশিয়ার তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। ছাড়মূল্যে বিপুল পরিমাণ তেল কিনে ভারতও লাভবান হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত যদি ধীরে ধীরে রুশ তেলের পরিবর্তে ভেনেজুয়েলার তেলের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তাহলে রাশিয়ার জন্য তা অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক—উভয় দিক থেকেই অস্বস্তিকর হবে। তবে ভারতের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক বহুমাত্রিক। ভারতের সামরিক সরঞ্জামের বেশির ভাগই রাশিয়া থেকে কেনা। অর্থনৈতিক সম্পর্কও তারা বহুমাত্রিক করার চেষ্টা করছে।
পররাষ্ট্রনীতিতে ভারত সাধারণত কোনো বলয়ের মধ্যে পুরোপুরি ঢুকে যায় না। তাই ভেনেজুয়েলার তেল কেনা শুধু বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি ভারতের বহুমাত্রিক ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার অংশ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।



