দেশজুড়ে প্রতি বছর যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। শ্রমিক অধিকার, ন্যায্য মজুরি এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশের দাবিতে দিনটি প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে। তবে বাস্তবতা বলছে, আনুষ্ঠানিক খাতের তুলনায় অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কোটি কোটি শ্রমিক এখনও রয়ে গেছে ন্যূনতম অধিকার থেকে বঞ্চিত। ফলে মে দিবস ঘিরে যতই আলোচনা-সেমিনার হোক, বৈষম্যের এই গভীর চিত্র তেমন পরিবর্তিত হয়নি।
অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত: অর্থনীতির মেরুদণ্ড, অথচ উপেক্ষিত
বাংলাদেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। রিকশাচালক, নির্মাণ শ্রমিক, গৃহকর্মী, ক্ষুদ্র দোকানকর্মী, পরিবহন শ্রমিক থেকে শুরু করে কৃষি শ্রমিক—এই বিশাল জনগোষ্ঠী দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখলেও তারা প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা ব্যবস্থার বাইরে। এদের বেশিরভাগের নেই লিখিত নিয়োগপত্র, নেই নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, নেই ওভারটাইমের নিশ্চয়তা। দুর্ঘটনা, অসুস্থতা বা বেকারত্বের সময় কোনও সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোও তাদের জন্য কার্যকর নয়।
অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের স্বীকৃতি মেলেনি
দেশের বিপুলসংখ্যক শ্রমশক্তি এখনও রাষ্ট্রীয় আইনের সুরক্ষার বাইরে রয়ে গেছে। সম্প্রতি পাস হওয়া শ্রম সংশোধন বিলে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের ব্যাপক অংশ অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় শ্রমবাজারে বৈষম্যের চিত্র আরও স্পষ্ট হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইন সংশোধনের বড় সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এই খাতের শ্রমিকদের স্বীকৃতি না দেওয়া একটি বড় নীতিগত ঘাটতি। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশে মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৮৫ শতাংশই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। অথচ নতুন আইনে এদের মধ্যে কেবল গৃহশ্রমিক এবং কৃষি খামারে নিয়োজিত কিছু শ্রমিককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে—যা মোট অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকের প্রায় ৫ শতাংশের বেশি নয়। ফলে প্রায় ৮০ শতাংশ শ্রমিকই শ্রম আইনের সুরক্ষা, সুবিধা ও প্রতিকার ব্যবস্থার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট শ্রমশক্তি প্রায় ৬ কোটি ৩৫ লাখ। এর মধ্যে ৫ কোটি ৬৫ লাখই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। অথচ এই বিশাল জনগোষ্ঠীর বড় অংশের জন্য শ্রম আইনে কার্যকর কোনও স্বীকৃতি বা সুরক্ষা রাখা হয়নি।
শ্রম বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শ্রম আইন সংশোধনের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ছিল সব শ্রমিককে আইনি কাঠামোর আওতায় আনা। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ বলেন, ''সংস্কার কমিশনের সুপারিশে সব শ্রমিককে আইনের আওতায় এনে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলা হলেও তা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। এতে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের বিশাল অংশ কার্যত আইনের বাইরে থেকে গেছে।'' তিনি আরও বলেন, ''ক্ষতিপূরণ, বকেয়া মজুরি আদায়, কিংবা শ্রমিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নতুন আইনে সুস্পষ্ট কোনও বিধান নেই। বরং কিছু ক্ষেত্রে মালিকপক্ষের সুবিধা বাড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ট্রেড ইউনিয়নের সংখ্যা কমানো, শ্রমিকের সংজ্ঞা সীমিত করা এবং কিছু ধারা দ্রুত পরিবর্তনের বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।''
ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে নতুন বিধান
নতুন আইনে ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের ক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন কোনও প্রতিষ্ঠানে ন্যূনতম ২০ জন শ্রমিকের সম্মতিতে ইউনিয়ন গঠন করা যাবে। তবে প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকসংখ্যা অনুযায়ী এই সংখ্যা পরিবর্তিত হবে। পাশাপাশি একটি প্রতিষ্ঠানে সর্বোচ্চ তিনটি ট্রেড ইউনিয়ন থাকতে পারবে—যা আগে পাঁচটি ছিল। কোনও শ্রমিক একাধিক ইউনিয়নের সদস্য হতে পারবেন না, এ ক্ষেত্রে জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
কালো তালিকা নিষিদ্ধ
আইনে শ্রমিকদের 'কালো তালিকাভুক্ত' করার প্রথা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের তথ্যভান্ডারে অন্তর্ভুক্ত করে ভবিষ্যতে চাকরি থেকে বঞ্চিত করার সুযোগ আর থাকবে না—এ বিধানকে শ্রমিকদের জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন
আইনে কয়েকটি কল্যাণমূলক পরিবর্তনও আনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—মাতৃত্বকালীন ছুটি ১১২ দিন থেকে বাড়িয়ে ১২০ দিন। বার্ষিক উৎসব ছুটি ১১ দিন থেকে বাড়িয়ে ১৩ দিন। প্রতি তিন বছর পর মজুরি বোর্ড গঠন। ১০০ বা তার বেশি শ্রমিকের প্রতিষ্ঠানে প্রভিডেন্ট ফান্ড বা জাতীয় পেনশন স্কিমে অন্তর্ভুক্তির সুযোগ। এ ছাড়া কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষা ও জেন্ডার সমতার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মজুরি বৈষম্য ও অনিশ্চয়তা
অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের অন্যতম বড় সমস্যা হলো—অনিয়মিত ও অপ্রতুল মজুরি। একই ধরনের কাজে নিয়োজিত হলেও প্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের তুলনায় তারা অনেক কম পারিশ্রমিক পান। অনেক ক্ষেত্রে দৈনিক মজুরিও বাজার দরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, মূল্যস্ফীতির চাপে যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে, তখন এই শ্রমিকদের প্রকৃত আয় ক্রমেই কমছে। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে তারা হিমশিম খাচ্ছেন।
সামাজিক সুরক্ষার অভাব
সরকার বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু করলেও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের বড় অংশই এর আওতার বাইরে। বয়স্কভাতা, ভিজিডি বা অন্যান্য সহায়তা কর্মসূচি থাকলেও সেগুলো পর্যাপ্ত নয় এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত শ্রমিকরা এসব সুবিধা পান না। কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা বা স্বাস্থ্যঝুঁকির ক্ষেত্রেও নেই কোনও কার্যকর বিমা বা ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা। ফলে একটি দুর্ঘটনাই একটি পরিবারের আর্থিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
নারী শ্রমিকদের দ্বিগুণ বঞ্চনা
অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নারীরা আরও বেশি বৈষম্যের শিকার। গৃহকর্মী, কৃষি শ্রমিক বা ক্ষুদ্র উৎপাদন কাজে নিয়োজিত নারীরা প্রায়ই পুরুষদের তুলনায় কম মজুরি পান। পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা, সামাজিক স্বীকৃতির অভাব এবং শ্রম আইনের সুরক্ষা থেকেও তারা বঞ্চিত।
নীতিগত ঘাটতি ও বাস্তবায়নের দুর্বলতা
শ্রম আইন ও নীতিমালায় অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতকে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হলেও বাস্তবায়নে রয়েছে বড় ঘাটতি। নিবন্ধন প্রক্রিয়া জটিল, তদারকি দুর্বল এবং শ্রমিক সংগঠনের উপস্থিতিও সীমিত। ফলে এই খাতের শ্রমিকরা সংগঠিত হয়ে তাদের দাবি তুলে ধরার সুযোগও কম পান।
অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি প্রয়োজন
অর্থনীতিবিদ ও শ্রম বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতকে মূলধারায় আনতে হলে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে—শ্রমিকদের নিবন্ধনের সহজ ব্যবস্থা চালু করা, ন্যূনতম মজুরি কাঠামো নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা সম্প্রসারণ, স্বাস্থ্যবিমা ও দুর্ঘটনা বিমা চালু করা, নারী শ্রমিকদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা ও সমান মজুরি নিশ্চিত করা।
প্রতীকী দিবস বনাম বাস্তবতা
মে দিবসে শ্রমিক অধিকার নিয়ে নানা অঙ্গীকার করা হলেও বাস্তবে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জীবনে তার প্রতিফলন খুবই সীমিত। শ্রমবাজারে এই বৈষম্য দূর না হলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনও কঠিন হয়ে পড়বে। আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই এখন সময়ের দাবি।



