ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হাওর অঞ্চলের কৃষকরা এবার পাটের বাম্পার ফলন পেয়ে খুশি হলেও দাম নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে জেলার গ্রামাঞ্চলে পাট কাটা, আঁশ ছাড়ানো ও শুকানোর কাজ জোরেশোরে চলছে। তবে প্রচুর উৎপাদন সত্ত্বেও বাজারে কম দাম ও সরকারি ন্যূনতম সমর্থন মূল্যের অভাবে কৃষকরা হতাশ।
উৎপাদন খরচ বনাম বাজার দর
স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, ক্রমবর্ধমান উৎপাদন খরচ তাদের মুনাফা মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিয়েছে। কোনো অগ্রিম মূল্য গ্যারান্টি না থাকায় তারা সদ্য কাটা পাট মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে ন্যায্যমূল্যের চেয়ে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এক সময় বাংলাদেশের 'সোনালি আঁশ' হিসেবে পরিচিত পাট দেশের রপ্তানি অর্থনীতির ভিত্তি ছিল। বৈশ্বিক আধিপত্য কমলেও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হাজার হাজার কৃষক পরিবার এখনও এই ফসল চাষ করে।
কৃষকের বক্তব্য
এলাকার পাটচাষি সেলিম মিয়া জানান, এক কানি (প্রায় ৩০ শতাংশ) জমি চাষ করতে ৮,০০০ থেকে ১০,০০০ টাকা খরচ হয়। ফসল কাটার খরচও বেড়েছে, শ্রমিকরা প্রতিদিন ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা নিচ্ছেন। সেলিম বলেন, 'চাষে এত খরচ করেও বিনিয়োগ তুলতে পারছি না, কারণ বাজারদর খুবই কম। মধ্যস্বত্বভোগীরা কৃষকদের কাছ থেকে সস্তায় পাট কিনে মজুদ করে পরে অনেক দামে বিক্রি করে। সরকারের উচিত ফসল কাটার আগেই ন্যূনতম ক্রয়মূল্য ঘোষণা করা, যাতে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পান।'
আরেক কৃষক প্রিয়তোষ সহজী একই উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, উৎপাদন খরচ বাড়লেও বিক্রয়মূল্য অনিশ্চিত। 'সরকার যদি আগেই দাম ঠিক করে দেয়, তাহলে আমরা নিশ্চিন্তে পাট বিক্রি করতে পারি। কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের আবেদন, কৃষকদের সুরক্ষায় একটি ন্যায্যমূল্য ব্যবস্থা চালু করা হোক।'
সরকারি কর্মকর্তাদের মতামত
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) কর্মকর্তারা অবশ্য সামগ্রিক পরিস্থিতিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া ডিএই-এর উপপরিচালক ড. মোস্তফা এমরান হোসেন জানান, নাসিরনগর, সরাইল, বিজয়নগর, নবীনগর ও বাঞ্ছারামপুরের হাওর উপজেলায় প্রায় ৪,৫৭৫ হেক্টর জমিতে দেশি, তোষা, কেনাফ ও মেস্টা জাতের পাট চাষ করা হয়েছে। তিনি বলেন, 'অনুকূল আবহাওয়ায় এ বছর চমৎকার ফলন হয়েছে। বর্তমান বাজার পরিস্থিতি উৎসাহজনক, এবং আমরা আশা করছি কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাবেন। এ বছর পাট উৎপাদনের আনুমানিক মূল্য প্রায় ১০০ কোটি টাকা।'
এদিকে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া কৃষি বিপণন কর্মকর্তা আবু বকর জানান, তাদের বিভাগ ১১ দিনের 'অন-দ্য-জব' প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে পাটের ব্যবহার সম্প্রসারণে কাজ করছে। তিনি বলেন, 'আমরা অংশগ্রহণকারীদের রপ্তানিযোগ্য মূল্য সংযোজিত পাটপণ্য উৎপাদনের প্রশিক্ষণ দিই। পাটভিত্তিক উদ্যোগ গড়তে আগ্রহী যে কেউ প্রযুক্তিগত সহায়তা ও প্রশিক্ষণের জন্য আমাদের অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন।'
সরকারি হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা
সরকারি কর্মকর্তারা আশাবাদী হলেও কৃষকরা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্বের জন্য শক্তিশালী সরকারি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। তারা মনে করেন, নিশ্চিত ন্যূনতম মূল্য প্রবর্তন, বাজার তদারকি জোরদার এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমানো ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে এবং বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পাট উৎপাদনকারী অঞ্চলে পাট চাষ অব্যাহত রাখতে সহায়ক হবে।



