বাংলাদেশে ইভি চালুতে বাধা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও চার্জিং স্টেশনের অপ্রতুলতা
বাংলাদেশে ইভি চালুতে বাধা বিদ্যুৎ ও চার্জিং স্টেশনের অপ্রতুলতা

বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) ব্যবহারের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, চার্জিং স্টেশনের অপ্রতুলতা, ব্যাটারি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং সমন্বিত নীতিমালার অভাব এ খাতের বিকাশে প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিকাঠামো প্রণয়ন ছাড়া এ শিল্পের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।

শনিবার (২৭ জুন) রাজধানীর ঢাকা চেম্বার অডিটোরিয়ামে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) ও বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক যানবাহনের (ইভি) ব্যবহার: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা উঠে আসে।

মূল প্রবন্ধে চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী কার্বন নিঃসরণ কমানো ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশেও সরকার কর ও শুল্ক সুবিধাসহ বিভিন্ন নীতিগত সহায়তা দিলেও চার্জিং অবকাঠামো, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, প্রযুক্তিগত মানদণ্ড ও বেসরকারি বিনিয়োগে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তিনি জানান, দেশে বর্তমানে প্রায় ৬০ লাখ থ্রি-হুইলার চলাচল করলেও বিআরটিএতে নিবন্ধিত ইভি গাড়ির সংখ্যা মাত্র ৬৬৯টি। সম্ভাবনাময় এ খাতের বিকাশে দ্রুত সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বান জানান তিনি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের গুরুত্ব

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ গবেষণা কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওয়াহিদ হোসেন বলেন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত না হলে ইভি খাতের প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন সম্ভব নয়। একই সঙ্গে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সমন্বয়ে একটি কেন্দ্রীয় সেল গঠন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

শিল্প সচিব আব্দুন নাসের খান জানান, ইভি খাতের জন্য একটি নীতিমালার খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। আন্তঃমন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনের মতামত নিয়ে শিগগিরই একটি বাস্তবসম্মত ও যুগোপযোগী নীতিমালা চূড়ান্ত করা হবে। এর মূল লক্ষ্য হবে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশের জ্বালানি সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।

সঠিক পরিসংখ্যানের প্রয়োজনীয়তা

আলোচনায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শিবির বিচিত্র বড়ুয়া বলেন, সরকারি হিসাবে মাত্র ৭০০টি ইভি নিবন্ধিত থাকলেও বাস্তবে দেশে এর সংখ্যা অনেক বেশি। তাই সঠিক নীতিনির্ধারণের জন্য নির্ভুল পরিসংখ্যান জরুরি। তিনি জানান, শুল্ক ও অশুল্ক বাধা কমাতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এনবিআরের সঙ্গে কাজ করছে।

রানার অটোমোবাইলস পিএলসির চেয়ারম্যান ও বামার সভাপতি হাফিজুর রহমান খান বলেন, ইভি শিল্প নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং যন্ত্রাংশ উৎপাদন ও রফতানির মাধ্যমে দেশের রফতানি বহুগুণ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করেছে।

চার্জিং স্টেশন ও মান নিয়ন্ত্রণ

স্রেডার পরিচালক মো. আমিনুর রহমান জানান, এখন পর্যন্ত ৩২টি ইভি চার্জিং স্টেশনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৯টি চালু হয়েছে। তিনি চার্জিং স্টেশন ও আমদানিকৃত যানবাহনের মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী মো. মফিজুল ইসলাম বলেন, নিবন্ধনের অভাবে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের প্রকৃত সংখ্যা ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য সরকারের কাছে নেই। নিম্নমানের ব্যাটারির কারণে বিদ্যুতেরও অপচয় হচ্ছে।

জ্বালানি সাশ্রয় ও পরিবেশগত সুফল

বুয়েটের অধ্যাপক ড. মো. এহসান বলেন, দেশে বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলারের ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে প্রতিবছর প্রায় ১৫ লাখ টন ডিজেল আমদানি কমেছে, যা বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বিএসআরইএর সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, পরিবহন খাতে প্রতিবছর প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকার জ্বালানি প্রয়োজন, যার বড় অংশই আমদানিনির্ভর। ইভির ব্যবহার বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তাও জোরদার হবে।

দ্রুত চার্জিং ও অর্থায়নের আহ্বান

ইডকলের সহ-সভাপতি তানভীর ইবনে বাশার দ্রুত চার্জিং স্টেশন স্থাপন, আমদানি প্রক্রিয়া সহজ করা এবং দীর্ঘমেয়াদি ঋণ সুবিধা দেওয়ার আহ্বান জানান। আকিজ মোটরসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ আমিন উদ্দিন বলেন, ইভিতে জ্বালানি ব্যয় প্রায় ৩০ শতাংশ কম হওয়ায় এ প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়ানো প্রয়োজন।

মুক্ত আলোচনায় বারভিডার সভাপতি আব্দুল হক দেশীয়ভাবে ইলেকট্রিক থ্রি-হুইলার ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশ উৎপাদনে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান। ডিসিসিআইর সাবেক সহ-সভাপতি এম আবু হোরায়রাহ বলেন, ঢাকায় দুই হাজার ইলেকট্রিক বাস চালুর আগে একটি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।

সমঝোতা স্মারক সই

সেমিনার শেষে জ্বালানি নীতিমালা, উদ্ভাবন এবং ইভি বাজার উন্নয়নে যৌথভাবে কাজ করার লক্ষ্যে ডিসিসিআই ও বিএসআরইএর মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়।