শ্রম আইন সংশোধনী নিয়ে বেকমিয়ার তীব্র আপত্তি
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বেকমিয়া) সংশোধিত শ্রম আইন অধ্যাদেশ-২০২৫ এর বেশ কয়েকটি ধারা পুনর্বিবেচনার জোরালো দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটির নেতৃত্ব দাবি করছেন যে, অধ্যাদেশে প্রশাসনিক, তত্ত্বাবধায়ক বা ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের 'শ্রমিক' সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করা হলে শিল্পখাতে মারাত্মক বিভ্রান্তি ও অস্থিরতার সৃষ্টি হতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে বেকমিয়া নেতাদের বক্তব্য
রোববার বেকমিয়া কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম এই অভিমত প্রকাশ করেন। এই অনুষ্ঠানে বেকমিয়ার নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামিম এহসান, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট অমল পোদ্দার এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট শামিম আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। মোহাম্মদ হাতেম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, সংশোধিত অধিকাংশ ধারা গ্রহণযোগ্য হলেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধারা বাস্তবায়নের আগেই জরুরি ভিত্তিতে পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ত্রিপক্ষীয় সিদ্ধান্ত প্রতিফলিত হয়নি বলে অভিযোগ
বেকমিয়া সভাপতি অভিযোগ করেন যে, নিয়োগকর্তা, শ্রমিক ও সরকারের প্রতিনিধিদের সাথে অনুষ্ঠিত ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের সকল সিদ্ধান্ত সংশোধিত অধ্যাদেশে প্রতিফলিত হয়নি। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, পূর্ববর্তী আইনে প্রশাসনিক, তত্ত্বাবধায়ক বা ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের কর্মচারীরা 'শ্রমিক' সংজ্ঞার বাইরে ছিল। কিন্তু সংশোধিত ধারায় বেতনভোগী কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও শ্রমিক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা কারখানায় অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। তিনি দাবি করেন যে, এই বিষয়টি ত্রিপক্ষীয় পরামর্শক কাউন্সিল (টিসিসি) এর সিদ্ধান্তকে প্রতিফলিত করে না।
চাকরি চুক্তি সমাপ্তির ক্ষতিপূরণ সময়সীমা নিয়ে আপত্তি
বেকমিয়া চাকরি চুক্তি সমাপ্তির ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের সময়সীমা নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে। অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, স্থায়ী শ্রমিকরা তিন বছর পর্যন্ত প্রতি বছরের জন্য সাত দিনের মজুরি, তিন থেকে দশ বছরের জন্য ১৫ দিনের মজুরি এবং দশ বছরের বেশি চাকরির জন্য ৩০ দিনের মজুরি পাবেন। তবে মোহাম্মদ হাতেম দাবি করেন যে, টিসিসি তিন থেকে পাঁচ বছরের কম সময়ের জন্য সাত দিনের মজুরি এবং পাঁচ থেকে দশ বছরের কম সময়ের জন্য ১৫ দিনের মজুরির প্রস্তাব করেছিল। বেকমিয়া সভাপতি সংশোধিত সময়সীমাকে 'অযৌক্তিক' বলে অভিহিত করেন।
সম্মিলিত দরকষাকষি এজেন্ট নির্বাচনের বিধান নিয়ে উদ্বেগ
তিনি সম্মিলিত দরকষাকষি এজেন্ট (সিবিএ) নির্বাচনের বিধান নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। অধ্যাদেশ অনুযায়ী, একটি কারখানায় কেবল একটি ট্রেড ইউনিয়নকে দরকষাকষি প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া যাবে এবং সিবিএ হতে হলে কমপক্ষে ৫১% শ্রমিকের নির্বাচনের মাধ্যমে সমর্থন পেতে হবে।
পুনর্বিবেচনার জন্য প্রস্তাবিত অতিরিক্ত ধারা
এছাড়াও বেকমিয়া সভাপতি গ্র্যাচুইটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড, মাতৃত্বকালীন সুবিধা এবং কর্মস্থলে বৈষম্য, সহিংসতা ও হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠনের বিধানসহ বেশ কয়েকটি ধারা পুনর্বিবেচনার প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন যে, দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে সংশোধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে প্রায় ৩০০ প্রস্তাব থেকে ১০১টি প্রস্তাব কমিয়ে আনা হয় এবং পরে কারিগরি কমিটির পর্যালোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হয়। এর মধ্যে ৭৯টি ধারা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।
শেষ মুহূর্তে ধারা যোগের অভিযোগ
তবে তিনি অভিযোগ করেন যে, কিছু ধারা সংশ্লিষ্ট পক্ষের পূর্ব সম্মতি ছাড়াই শেষ মুহূর্তে যোগ করা হয়েছে। এই কারণে বেকমিয়া নেতারা সংসদে উত্থাপনের আগেই অধ্যাদেশটি পুনর্বিবেচনার দাবি জানান। একটি প্রশ্নের জবাবে মোহাম্মদ হাতেম বলেন: "১২৪টি সংশোধিত ধারার মধ্যে আমরা মাত্র চার-পাঁচটি বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছি। বাকি অধিকাংশ ধারা শ্রমিকবান্ধব হওয়ায় আমরা সমর্থন করি। তবে শিল্পখাতের ক্ষতি হতে পারে এমন ধারা এড়িয়ে যৌক্তিক প্রস্তাবগুলো বিবেচনায় নেওয়া উচিত।"
গত বছরের ১৭ নভেম্বর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংশোধিত শ্রম আইন অধ্যাদেশ জারি করে। বেকমিয়ার এই দাবি শিল্পখাতের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের মধ্যে আলোচনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।



