বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে গড়ে উঠছে এক সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ। যেখানে উন্নয়ন, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছে। এক সময়ের বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপ এখন গভীর সমুদ্র বন্দর, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলকে কেন্দ্র করে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক উপকেন্দ্রে রূপ নিয়েছে। এসব বৃহৎ প্রকল্পের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলছে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে 'মাতারবাড়ী পোর্ট এক্সেস রোড' নির্মাণ।
নির্মাণ ও অংশীদারিত্ব
প্রকল্পটির নির্মাণ কাজ পরিচালনা করছে জাপানি প্রতিষ্ঠান 'টোকিউ কন্সট্র্যাকশন লিমিটেড' এবং বাংলাদেশের 'ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড'। প্রতিষ্ঠান দুটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে পরিবেশ সুরক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। মাতারবাড়ী পোর্ট এক্সেস রোড কেবল একটি সড়ক নয়, এটি স্থানীয় ও জাতীয় অর্থনীতির লাইফলাইন। এই সংযোগ সড়কটি চালু হলে বন্দরের পণ্য পরিবহন সহজতর হবে, যাতায়াতের সময় কমবে এবং স্থানীয় জনগণের জন্য নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। আধুনিক যাতায়াত ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানকে উন্নত করার পাশাপাশি কৃষি ও মৎস্য সম্পদের বাজারজাতকরণে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসবে।
আন্তর্জাতিক মান ও প্রযুক্তি
ম্যাক্স এই প্রকল্পে জাপানি অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক নির্মাণ স্ট্যান্ডার্ড এবং আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ প্রয়োগ নিশ্চিত করছে। কেবল অবকাঠামো নির্মাণ নয়, বরং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে একটি দীর্ঘমেয়াদি টেকসই জাতীয় সম্পদ গড়ে তোলাই এই প্রকল্পে ম্যাক্সের মূল অঙ্গীকার।
সৌরশক্তির ব্যাপক ব্যবহার
সৌরশক্তির বৃহৎ প্রয়োগ, বাংলাদেশে প্রথম অবকাঠামো উন্নয়ন মানেই সাধারণত পরিবেশের সঙ্গে কিছু না কিছু আপোষ করা—এই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে ম্যাক্স প্রচলিত নির্মাণ ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহারের এক অনন্য নজির স্থাপন করতে চলেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে যেকোনো বড় অবকাঠামো প্রকল্পের ক্ষেত্রে এমন উদাহরণ এই প্রথম। ম্যাক্স এই প্রকল্পে পুরোপুরি সৌরশক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করবে। অবকাঠামো প্রকল্পের বিশাল লোড সামলাতে সাধারণত গ্রিড বিদ্যুৎ বা ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করা হয়। এই প্রকল্পের আবাসন, স্ট্যাকইয়ার্ড এবং নির্মাণ সাইটের বিভিন্ন কাজে দৈনন্দিন বিদ্যুৎ চাহিদা প্রায় ৪১৫ কিলোওয়াট-ঘণ্টা। এই বিশাল চাহিদা মেটাতে ম্যাক্স প্রায় ৪২ একর এলাকা জুড়ে একটি বৃহৎ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনা বাস্তবায়ন করার পরিকল্পনা করছে। এটি ব্যাচিং প্ল্যান্ট ছাড়া সাইটের অন্যান্য লোড টানা ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত সচল রাখতে সক্ষম হবে। প্রকল্প এলাকার ভেতরের সমস্ত স্ট্রিটলাইট এবং ফ্লাডলাইট সৌরশক্তিতে পরিচালিত হবে। এর ফলে বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থা হিসেবে সাধারণ যে ৫০০ কেভিএ ডিজেল জেনারেটর সেটের প্রয়োজন হতো, তা আর প্রয়োজন পড়বে না।
পরিবেশবান্ধব নির্মাণ সামগ্রী
আধুনিক নির্মাণে পরিবেশ-বান্ধব উদ্ভাবন পরিবেশ সুরক্ষায় ম্যাক্সের আরেকটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হলো এই প্রকল্পে প্রথাগত লাল ইটের পরিবর্তে অটোক্লেভড এয়ারেটেড কংক্রিট ব্লক ও প্যানেলের ব্যবহার। প্রকল্পের সাইট অফিস, শ্রমিক আবাসন এবং অন্যান্য স্থায়ী-অস্থায়ী ভবন নির্মাণে ম্যাক্সক্রিট লিমিটেড (ম্যাক্সের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান) উৎপাদিত এই আধুনিক উপকরণ ব্যবহার করা হচ্ছে।
গ্রিন লজিস্টিকস
ম্যাক্স এই ধারণাকে আমূল বদলে দিয়ে মাতারবাড়ী প্রকল্পে 'গ্রিন লজিস্টিকস' বা পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা প্রবর্তন করার পরিকল্পনা করেছে। প্রকল্পের অভ্যন্তরীণ তদারকি এবং লজিস্টিকস সাপোর্টের জন্য ম্যাক্স বৈদ্যুতিক যানবাহন যুক্ত করবে। বৈদ্যুতিক যানবাহন চলাচলের সময় কোনো প্রকার ক্ষতিকারক ধোঁয়া বা কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গত করে না। প্রচলিত ইঞ্জিনের তুলনায় বৈদ্যুতিক মোটর প্রায় নিঃশব্দে কাজ করে। ৪০ মাস মেয়াদি এই প্রকল্পে ইভি ব্যবহারের ফলে কয়েক হাজার লিটার ডিজেল সাশ্রয় হবে।



