বাগেরহাটের ফকিরহাটে সরকারি প্রকল্পের আওতায় বরাদ্দকৃত গরুর জন্য ঘুষ না দেওয়ায় তারাপদ বিশ্বাস নামে এক দরিদ্র জেলে বঞ্চিত হয়েছেন। একইসঙ্গে তার নামে বরাদ্দকৃত গরুটি অন্য ব্যক্তির কাছে তুলে দিয়ে পরে বিক্রি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে অনিয়ম ধরা
অনুসন্ধানে একই ইউনিয়নের অন্য এক ব্যক্তির গোয়ালে ওই গরুটি পাওয়া গেছে। যা প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়মের গুরুতর অভিযোগকে সামনে এনেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার নলধা-মৌভোগ ইউনিয়নের ডহর মৌভোগ গ্রামের বাসিন্দা তারাপদ বিশ্বাস পেশায় একজন দরিদ্র জেলে এবং উপজেলা মৎস্য অফিসের তালিকাভুক্ত সুবিধাভোগী।
প্রকল্পের বিবরণ
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ‘দেশীয় প্রজাতির মাছ ও শামুক সংরক্ষণ ও উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে একটি গরু বরাদ্দ দেওয়া হয় তাকে। এদিকে প্রকল্পের বিতরণ তালিকায় তার নাম অন্তর্ভুক্ত থাকলেও বাস্তবে কোনো গরু তিনি পাননি বলে অভিযোগ করেন।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ
অভিযোগপত্রে ভুক্তভোগী জানান, স্থানীয় ডহরমৌভোগ গ্রামের ১নং ওয়ার্ডের একটি রাজনৈতিক দলের নেতা মোহিত বালা গরু দেওয়ার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তার জাতীয় পরিচয়পত্র ও জেলে কার্ড সংগ্রহ করেন। পরে ‘অফিস খরচ’ বাবদ ১০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। ওই দরিদ্র জেলে টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে তার নামে বরাদ্দকৃত গরুটি তাকে না জানিয়ে অন্যের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এ বিষয়ে শুক্রবার (১ মে) তারাপদ বিশ্বাস জানান, তালিকার ৩৯ নম্বরে তার নামে বরাদ্দকৃত প্রায় ৬০ কেজি ওজনের বকনা বাছুরটি অন্যত্র বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। বহুবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করেও তিনি কোনো প্রতিকার পাননি। এসময় শুধু তিনি নন, বরং একই দিনে বিতরণ হওয়া ৬০টি গরুর মধ্যে একাধিক তালিকাভুক্ত জেলে গরু পাননি বলে দাবি করেন ভুক্তভোগী।
অন্য ব্যক্তির বক্তব্য
একই ইউনিয়নের শ্রীনাথ বৈরাগীর পরিবারের কাছে ওই গরুটি রয়েছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। এ বিষয়ে তার ছেলে শ্রীবাস বৈরাগী ও তার বোন বলেন, গরু দেওয়ার জন্য আমাদের কাছেও টাকা চাওয়া হয়েছিল। পরে দরকষাকষি করে ৪ হাজার টাকা দিই। এরপর উপজেলা মৎস্য অফিস থেকে গরুটি নিয়ে আসি। পরে জানতে পারি, গরুটি অন্য একজনের নামে বরাদ্দ ছিল।
শ্রীবাস বৈরাগী আরও বলেন, গরু নেওয়ার সময় মাস্টার রোলে তারাপদ বিশ্বাস নামে যে স্বাক্ষর রয়েছে, তা তিনি দেননি। গরু নেওয়ার সময় তারাপদ বিশ্বাসের কোনো জাতীয় পরিচয়পত্র বা জেলে কার্ডও দেখানো হয়নি। তিনি ভেবেছিলেন টাকার বিনিময়ে এটা তার নামে বরাদ্দ হয়েছে।
ভয়ভীতি প্রদর্শন
এদিকে বিষয়টি লিখিতভাবে জানানো হলেও উল্টো তাদের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে অভিযোগ করে ভুক্তভোগীর ছেলে প্রহলদ বিশ্বাস বলেন, একইভাবে আরও কয়েকজনের কাছ থেকেও গরু দেওয়ার নামে টাকা নেওয়া হয়েছে যা তালিকা ধরে খুঁজলে বের হয়ে আসতে পারে।
অভিযুক্তের অস্বীকৃতি
অভিযুক্ত মোহিত বালা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, কাউকে সরকারি গরু পাইয়ে দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। মৎস্য অফিস কাকে গরু দিয়েছে বা দেয়নি, সে বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই।
মৎস্য কর্মকর্তার ব্যাখ্যা
সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা শেখ আসাদুল্লাহ জানান, তারাপদ বিশ্বাস প্রকৃত তালিকাভুক্ত জেলে। তিনি উপস্থিত না থাকায় কার্ড দেখে তার ছেলে পরিচয়দানকারী একজনের কাছে গরুটি দেওয়া হয়েছে। তবে যাচাই-বাছাই ছাড়া অন্য ব্যক্তির কাছে গরু হস্তান্তরের বিষয়ে তিনি সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দেননি। এ ঘটনায় মাঠ সহায়ক কর্মীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তার বক্তব্য
এ বিষয়ে বাগেরহাট জেলা মৎস্য কর্মকর্তা রাজ কুমার বিশ্বাস বলেন, অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে দায়িত্বে অবহেলা বা অনিয়ম প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



