আজ মে দিবস। বিশ্বজুড়ে শ্রমিক ইউনিয়নগুলো মজুরি, পেনশন, অর্থনৈতিক অসমতা এবং গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যুতে সংহতি প্রকাশের জন্য এই দিনটিকে বেছে নিয়েছে। সিউল থেকে জাকার্তা, ইস্তাম্বুল থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অধিকাংশ রাজধানী এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে আজ বড় ধরনের বিক্ষোভের পরিকল্পনা করা হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এপি এ খবর জানিয়েছে।
ইউরোপের ট্রেড ইউনিয়নের অবস্থান
৪১টি ইউরোপীয় দেশের ৯৩টি ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠনের প্রতিনিধিত্বকারী ইউরোপিয়ান ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশন বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধের দায়ভার বহন করতে রাজি নয় কর্মজীবী মানুষ। আজকের এই সমাবেশগুলো প্রমাণ করে যে, কর্মজীবী মানুষ আর নীরব দর্শক হয়ে থাকবে না এবং নিজেদের চাকরি ও জীবনযাত্রার মান ধ্বংস হতে দেবে না।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির বিরোধিতাকারী কর্মীরা বিভিন্ন পদযাত্রা ও বয়কটের পরিকল্পনা করছেন।
জীবনযাত্রার ব্যয় ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের জেরে জীবনযাত্রার ব্যয় ও জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি মে দিবসের এবারের বিক্ষোভে মূল আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুক্রবার বিশ্বজুড়ে শ্রমিকরা মজুরি বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক স্বস্তির দাবিতে রাজপথে নেমেছেন।
ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় শ্রমিকদের বড় সমাবেশের প্রস্তুতি চলছে। বামপন্থী রাজনৈতিক গ্রুপ বায়ান-এর নেতা রেনাতো রেয়েস অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন, জ্বালানির দামের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণে মজুরি বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক স্বস্তির দাবি আরও জোরালো হবে। শ্রম ফেডারেশনের জোট সেন্ট্রো-র নেতা জোশুয়া মাতা বলেন, প্রতিটি ফিলিপিনো শ্রমিক এখন বুঝতে পারছে যে পরিস্থিতি বৈশ্বিক সংকটের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
ইন্দোনেশিয়ায় শ্রমিক ইউনিয়নগুলো দেশে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপের বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছে। ইন্দোনেশিয়ান ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট সাইদ ইকবাল বলেন, শ্রমিকরা এখন কোনোমতে দিন পার করছেন।
পাকিস্তানে মে দিবস সরকারি ছুটি হলেও অনেক দিনমজুরের তা পালন করার সামর্থ্য নেই। ইসলামাবাদের কাছে নির্মাণ শ্রমিক ৫৫ বছর বয়সী মোহাম্মদ মাসকিন বলেন, কাজ না করলে ঘরে শাকসবজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে যাব কীভাবে?
উল্লেখ্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং মিত্র দেশগুলোর আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল পাকিস্তানে জ্বালানির উচ্চমূল্য মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিয়েছে। সরকারি হিসাবে দেশটিতে বর্তমানে মূল্যস্ফীতির হার প্রায় ১৬ শতাংশ।
ইউরোপে পরিস্থিতি: প্রতিবাদ ও বিতর্ক
ফ্রান্সে শ্রমিকরা ‘রুটি, শান্তি ও স্বাধীনতা’ স্লোগান দিয়ে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রেক্ষাপটে শ্রমিকদের দৈনন্দিন উদ্বেগকে এই স্লোগানের সাথে যুক্ত করা হয়েছে। ফ্রান্সে মে দিবস নিয়ে এবার বিশেষ বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দেশটিতে মে দিবস একমাত্র সরকারি ছুটি, যেদিন অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান বাধ্যতামূলকভাবে বন্ধ থাকে। সরকার সম্প্রতি একটি বিল উত্থাপন করেছে, যেখানে বেকার ও ফুল বিক্রেতাদের মে দিবসে কাজ করার অনুমতি দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
ইতালিতে পরিস্থিতি ভিন্ন। সেখানে সরকার চলতি সপ্তাহে প্রায় ১ বিলিয়ন ইউরোর (১.১৭ বিলিয়ন ডলার) কর্মসংস্থান প্রণোদনা অনুমোদন করেছে। এর লক্ষ্য—তরুণ ও সুবিধাবঞ্চিত নারীদের নিয়োগ উৎসাহিত করা এবং প্ল্যাটফর্ম-ভিত্তিক কাজে শ্রম শোষণেরোধ করা। তবে বিরোধী দলগুলো এই পদক্ষেপকে ‘বিশুদ্ধ প্রোপাগান্ডা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
পর্তুগালে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত। দেশটিতে সরকার শ্রম আইন পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে, যার প্রতিবাদে গত বছর থেকেই দেশটিতে সাধারণ ধর্মঘট ও বিক্ষোভ চলছে। ইউনিয়ন ও মালিকপক্ষের মধ্যে নয় মাসের আলোচনা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত কোনও সমঝোতা হয়নি। ইউনিয়নগুলোর দাবি, বর্তমান প্রস্তাবগুলো শ্রমিকদের অধিকার খর্ব করবে এবং ওভারটাইম সীমা বাড়িয়ে দেবে।
যুক্তরাষ্ট্রে ‘শ্রমিক বনাম বিলিওনেয়ার’
যুক্তরাষ্ট্রে মে দিবস কোনও সরকারি ফেডারেল ছুটি থাকে না। তবুও সেখানে ‘মে ডে স্ট্রং’ জোটের ব্যানারে কর্মীরা ‘শ্রমিক বনাম বিলিওনেয়ার’ স্লোগান দিয়ে রাজপথে নেমেছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন সংক্রান্ত কড়াকড়ি এবং বিভিন্ন নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার রয়েছেন তারা। সংগঠকরা দেশজুড়ে হাজার হাজার কর্মসূচি এবং ‘নো স্কুল, নো ওয়ার্ক, নো শপিং’ স্লোগানে অর্থনৈতিক ধর্মঘটের ডাক দিয়েছেন।
ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে শ্রম ও অভিবাসী অধিকারের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ২০০৬ সালে মার্কিন অভিবাসন আইনের বিরুদ্ধে শিকাগোসহ পুরো দেশে প্রায় ১০ লাখ মানুষ রাজপথে নেমেছিল।
মে দিবসের শিকড়: ১৮৮৬ সালের শিকাগো
মে দিবস বা আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসটির পেছনে রয়েছে এক শতাব্দীর বেশি পুরনো মার্কিন শ্রম ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৮৮০-র দশকে আট ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে শ্রমিকরা ধর্মঘট ও বিক্ষোভ করেন। ১৮৮৬ সালের মে মাসে শিকাগোর হে মার্কেটে এক সমাবেশে বোমা বিস্ফোরণ ও পুলিশের গুলিবর্ষণের ঘটনায় পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। সেই ঘটনায় বেশ কয়েকজন শ্রমিক নেতাকে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তাদের স্মরণে ১ মে দিনটিকে শ্রমিক দিবস হিসেবে পালন করা হয়। শিকাগোর হে মার্কেট স্কয়ারের স্মৃতিস্তম্ভে এখনও খোদাই করা রয়েছে: ‘বিশ্বের সকল শ্রমিকের প্রতি উৎসর্গীকৃত’।



