পোশাকশ্রমিকদের কালো তালিকা বাতিলের পরও ভোগান্তি
পোশাকশ্রমিকদের কালো তালিকা বাতিলের পরও ভোগান্তি

সাভারের একাধিক পোশাক কারখানায় ১৫ বছর ধরে কর্মরত ছিলেন মো. মাইনুদ্দিন। সবশেষ চাকরি করতেন আশুলিয়ার স্কাই লাইন পোশাক কারখানায়। ২০২৪ সালের অক্টোবরে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনের পর চাকরিচ্যুত হন। এরপর তার নাম উঠে যায় বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) তথ্যভান্ডারে, যা 'কালো তালিকা' নামে পরিচিত এবং 'ব্ল্যাকলিস্টিং' বলে ডাকা হয়।

এরপর একাধিক কারখানায় গেলেও তথ্যভান্ডারে নাম থাকায় চাকরি মেলেনি। শ্রমিক ও শ্রমিক সংগঠনের দাবির মুখে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই তথ্যভান্ডার বাতিল করে অধ্যাদেশ জারি করে। পরে বিএনপি সরকার সেটিকে আইনে রূপান্তর করে। তবে এরপরও ভাগ্য খোলেনি মাইনুদ্দিনের। সাভার, আশুলিয়া অঞ্চলের একাধিক কারখানায় চাকরি চাইতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে ফিরেছেন। শুধু মাইনুদ্দিনই নন, এমন আরও অনেকে দীর্ঘদিন কর্মরত থাকার পরও তথ্যভান্ডারের নামের গ্যাঁড়াকলে পড়ে বেকার হয়ে বসে আছেন।

বিজিএমইএর বক্তব্য

যদিও বিজিএমইএ বলছে, এমন কোনও তালিকা বর্তমানে আর পরিচালনা করা হচ্ছে না। তবে ভুক্তভোগী শ্রমিক ও তাদের নিয়ে কাজ করা শ্রমিক সংগঠনের নেতারা বলছেন, এখনও চলছে কালো তালিকাভুক্তির কাজ। এমন তালিকা বাতিল করা অথবা তালিকাটি সরকারের কোনও সংস্থার মাধ্যমে পরিচালনা করতে হবে। তবে সেখানে চাকরিচ্যুত করার কারণ উল্লেখ করা চলবে না।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শ্রম আইনে কী আছে

বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬ এ ব্ল্যাকলিস্টিং হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, ব্ল্যাক লিস্টিং অর্থ কোনও প্রতিষ্ঠানের মালিক বা মালিকদের কোনও সংগঠন কর্তৃক গৃহীত এমন কোনও কার্যক্রম, যা ওই প্রতিষ্ঠানের বা মালিকদের কোনও সংগঠনের অধীন কোনও প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিকের সাময়িক ও বদলি শ্রমিকসহ ছাঁটাই, ডিসচার্জ, বরখাস্ত, অপসারণ, অবসর গ্রহণ বা অন্য কোনও কারণে চাকরি অবসানের পর নতুন করে কারখানা বা প্রতিষ্ঠানে চাকরি লাভের ক্ষেত্রে অযোগ্য ঘোষণা করার উদ্দেশ্যে তালিকা বা ডাটাবেজ তৈরি করা। আইনে মালিকের পক্ষে অসৎ শ্রম আচরণ সম্পর্কিত নিয়মের (ড) ধারায় বলা হয়েছে, কোনও শ্রমিক বা ইউনিয়নের কোনও সদস্যকে কোনও কারণে চাকরি থেকে অবসান করা হলে, ব্ল্যাকলিস্টিং করে নোটিশ জারি বা ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করবে না।

২০২১ সালে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বিজিএমইএ জানিয়েছিল, পোশাকশ্রমিকদের জন্য বায়োমেট্রিক আইডেনটিটি অ্যান্ড ওয়ার্কার্স ইনফরমেশন সিস্টেম তৈরি করা হয়েছে। এই তথ্যভান্ডারে শ্রমিকদের আঙুলের ছাপসহ তাদের পরিচয়, রক্তের গ্রুপ, কর্মসংস্থান ইত্যাদি নানা তথ্য রয়েছে। তালিকার আওতায় অনেক শ্রমিককে 'কালো তালিকাভুক্ত' করা হয়। এ কারণে ওই শ্রমিক কোনও কারখানায় চাকরিচ্যুত হলে বিজিএমইএভুক্ত অন্য কারখানায় চাকরি পান না। যদিও সেটি পরবর্তীতে আইন করে বাতিল করা হয়।

শ্রমিকদের গলার কাঁটা

তবে ভুক্তভোগী শ্রমিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতারা বলছেন, তৈরি পোশাক খাত সংশ্লিষ্টদের সুবিধার্থে গঠন করা এই তালিকা শ্রমিকদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইন বাতিল হওয়ার পরও কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার কারণে চাকরি পাচ্ছেন না বলে জানালেন অনেক শ্রমিক।

কয়েক সপ্তাহ আগে সাভারের কলমা এলাকার একটি পোশাক কারখানায় চাকরির খোঁজে গিয়েছিলেন পোশাক খাতে প্রায় দেড় দশক ধরে কর্মরত শ্রমিক মো. মাইনুদ্দিন। তবে কারখানা কর্তৃপক্ষ তাকে চাকরিতে নিতে অস্বীকৃতি জানায়। কারণ জানতে চাইলে, পুরোনো কারখানায় চাকরিচ্যুতির কথা উল্লেখ করে তাকে নেওয়া যাবে না বলে জানিয়ে দেওয়া হয়।

মো. মাইনুদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'আমি স্কাই লাইন কারখানায় চাকরিরত ছিলাম। সেখানে আন্দোলন হলে এরপর অনেকের মতো আমিও চাকরি হারাই। এরপর থেকে আর চাকরি পাচ্ছি না। গেলো কিছু দিনের মধ্যে আমি কলমার ডাইনেস্টি, জামগড়ার প্রীতি গ্রুপসহ বিভিন্ন কারখানায় চাকরির খোঁজে যাই। কিন্তু কোথাও চাকরি পাইনি। কারখানায় তো বায়োমেট্রিক নেওয়া হয়, সেই অনুযায়ী কী জন্য চাকরি গেলো, সেসব লেখা থাকে। স্কাই লাইনে যে চাকরি গেলো, ওই কারণেই এখন আর কোনও কারখানায় চাকরি পাচ্ছি না। ব্ল্যাকলিস্টে ফেলে দিয়েছে আমাকে। এজন্য এখন আমি আর কোথাও চাকরি পাচ্ছি না।'

একই কথা জানালেন আশুলিয়ার ইউনিকর্ন সোয়েটার্স কারখানা থেকে চাকরি হারানো মোহাম্মদ শরিফুল ইসলাম। তিনি বলেন, 'আমি ইউনিকর্নে প্রায় চার বছরের বেশি চাকরি করেছি। শেষের দিকে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম। তখন কারখানায় আন্দোলন চলছিল। পরে যেদিন কারখানায় যাই, দেখি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ আর ছাঁটাই তালিকা। সেখানেই আমার নামও ছিল। এরপর দুই বছর ধরে চাকরি পাচ্ছি না। অন্য কারখানায় যাই কিন্তু চাকরি হয় না। আমি ব্ল্যাকলিস্টে পড়ে যাই। এখন কখনও ছোট সাব কন্ট্রাক্টের কারখানায় কাজ করি, কখনও দোকানে, এভাবেই চলছি। বলা যায়, বেকার অবস্থায় দিন কাটাচ্ছি।'

শ্রমিকনেতারাও বলছেন ব্ল্যাকলিস্টিং এখনও আছে

একই অভিজ্ঞতার কথা জানালেন পোশাক খাতের সংশ্লিষ্ট শ্রমিকনেতারাও। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইন বিষয়ক সম্পাদক খায়রুল মামুন মিন্টু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'এই লিস্টের মূল উদ্দেশ্য ছিল শ্রমিকদের একটি ডাটাবেজ তৈরি করা, যা নিঃসন্দেহে ভালো একটি উদ্যোগ। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, মালিকপক্ষ এই ডাটাবেজকে অপব্যবহার করছে। লাখ লাখ শ্রমিকের ব্যক্তিগত তথ্য অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করা হচ্ছে, যা গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। মালিকপক্ষ সরাসরি ব্ল্যাকলিস্টিং শব্দটি স্বীকার না করলেও তারা শ্রমিকের চাকরি ছাড়ার কারণ হিসেবে এমন শব্দ ব্যবহার করছে, যেমন টার্মিনেশন বা আইন অনুযায়ী অবসান, যা অন্য মালিকদের কাছে নেতিবাচক বার্তা দেয়। এতে ধারণা তৈরি হয় যে, ওই শ্রমিক হয়তো ট্রেড ইউনিয়ন গঠন, নেতৃত্ব বা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ফলে তাকে আর চাকরি দেওয়া হয় না। বিভিন্ন আন্দোলন ও দাবি আদায়ের প্রেক্ষিতে এটি সরকার বাতিল করে। বলা হয়েছিল, কোনও শ্রমিককে ব্ল্যাকলিস্ট করা হবে না। কিন্তু বাস্তবে এই প্রথা বন্ধ হয়নি। বর্তমান সরকারও এ ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার কথা বললেও এখনও এর প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে। এই ডাটাবেজ গার্মেন্টস মালিকদের সংগঠনের (বিজিএমইএ) কাছে থাকার কোনও যৌক্তিকতা নেই। এটি সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকলে শ্রমিকদের ব্যক্তিগত তথ্য নিরাপদ থাকবে। ব্যক্তিগত তথ্য যেমন জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, পারিবারিক তথ্য, কাজের ইতিহাস, এসব শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট নিয়োগকর্তার কাছেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। অন্য মালিকদের জন্য এসব তথ্য উন্মুক্ত থাকার কোনও যুক্তি নেই। তাই পুরো ব্যবস্থাপনাটিই সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা উচিত বলে মনে করছি।'

আরেক সংগঠন বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি রফিকুল ইসলাম সুজন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'ব্ল্যাকলিস্টিংয়ের শিকার হওয়ার অভিযোগ নিয়মিতই আসছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, শ্রমিকদের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু তাদের সঠিকভাবে অব্যাহতির (রিলিজ) কাগজ দেওয়া হয়নি। অথচ এই কাগজ না থাকলে তাদের ওপর থেকে তথাকথিত ব্ল্যাকলিস্ট ওঠে না। অন্যদিকে, যদি টার্মিনেশন দেখানো হয়, তাহলে সেটিই পরবর্তীতে ব্ল্যাকলিস্ট হিসেবে কাজ করে। বর্তমানে সরকার আইন করেছে যে ব্ল্যাকলিস্টিং করা যাবে না। একইসঙ্গে বিজিএমইএ-ও দাবি করছে যে তারা ব্ল্যাকলিস্টিং করে না। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, এখানে একটি ফাঁকফোকর রয়ে গেছে। সরাসরি ব্ল্যাকলিস্ট শব্দটি ব্যবহার না করলেও, টার্মিনেট বা অনুরূপ শব্দ ব্যবহার করে শ্রমিকদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করা হচ্ছে, যা কার্যত ব্ল্যাকলিস্টিংয়েরই সমতুল্য। এই অবস্থার পরিবর্তনের জন্য আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছি। মিটিং, লিফলেট, পোস্টারের মাধ্যমে আমরা ব্ল্যাকলিস্টিংয়ের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলছি। আমাদের দাবি স্পষ্ট, ব্ল্যাকলিস্টিং, মিথ্যা মামলা ও হয়রানি বন্ধ করতে হবে।'

ব্ল্যাকলিস্টের সিস্টেম নেই বলছেন অনন্ত গার্মেন্টসের এমডি

দেশের পোশাক খাতে দীর্ঘ দিন ধরে অবদান রেখে চলেছেন ইনামুল হক খান। তিনি বিজিএমইএ-এর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ও অনন্ত গার্মেন্টসের এমডি। এসব বিষয় নিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে।

ইনামুল হক খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'আমাদের এখানে ব্ল্যাকলিস্টের সিস্টেম নাই। এটি স্পষ্ট কথা। অনেক আগে এটা ছিল, এটা সত্য। তবে এই পদ্ধতি উঠে গেছে। এই ধরনের ঘটনার লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে আমরা তদন্ত করবো। তবে শুধু মৌখিক অভিযোগ নয়, প্রমাণসহ অভিযোগ করতে হবে।'

তিনি আরও বলেন, 'অনেক সময় দেখা যায় একজন শ্রমিক প্রয়োজন অনুযায়ী যোগ্য নন, ফলে তাকে নেওয়া হচ্ছে না। এখন তিনি যদি অভিযোগ করেন, ব্ল্যাকলিস্টের জন্য। তাহলে চলবে না। দেখা যাবে, যোগ্য না হওয়ায় তার চাকরি নেই, এখন স্বাভাবিকভাবেই আরেকটি কারখানা অযোগ্যকে নেবে না। একটা লোক কাজ জানলে তার চাকরির অভাব নেই। এই যুগে যোগ্য শ্রমিকের অভাব আছে। আমরা শ্রমিক পাচ্ছি না। এক সময় কারখানার সামনে ৬০-৭০ জন করে চাকরিপ্রত্যাশী থাকতো। কিন্তু এখন যোগ্য লোক নেই।'

কী বলছেন আইনজীবী ও দায়িত্বশীলরা

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও আইন সহায়তা সংস্থা ব্লাস্টের পরিচালক (আইন) মো. বরকত আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'শ্রমিকরা এখনও এই তালিকার কারণে চাকরি পাচ্ছেন না বলে শুনতে পাচ্ছি। নতুন আইনে এই বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। এই আইনটার বাস্তবায়ন দেখতে চাচ্ছি। এখন আমরা বিষয়টির দিকে নজর রাখছি। সরকার নিশ্চয়ই আইনটি নিয়ে কাজ করবে।'

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'ব্ল্যাকলিস্টিংয়ের বিষয়টি প্রতিনিয়ত শুনছি। প্রথম কথা হলো, একজন মানুষ একটা কারখানায় চাকরি করবে সেটা তার বিষয়। একটা শিল্প তো এভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, কোনও একটা কারখানায় চাকরি হারিয়েছে বলে অন্য কারখানায় চাকরি করতে পারবে না, যদি সে নৈতিক কোনও অপরাধে জন্য চাকরি হারায়, এটি হতে পারে না। দেখা যায়, অধিকাংশ চাকরিচ্যুতিই ছোটখাটো বিষয়কে কেন্দ্র করে। সুপারভাইজার পছন্দ করে না, ট্রেড ইউনিয়ন করতে চায়, এসব কারণেও চাকরি যায়। ফলে এটা অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়। শিল্পের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। কারণ, একজন শিল্পে ১০ বছর চাকরি করলো, তারপর যদি সে শিল্পে চাকরি না পায়, তার মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। ফলে বিজিএমইএ-এর উচিত, তদন্ত করে একটা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে আসা।'

এ বিষয়ে বক্তব্যের জন্য সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীকে হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে ফোন করে ও প্রশ্ন লিখে পাঠিয়েও কোনও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন করতেও বাধা

শ্রমিক ও শ্রমিক সংগঠন সংশ্লিষ্টরা নতুন আইন অনুযায়ী, কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রত্যয়ন নেওয়ার নিয়ম হওয়ায় ট্রেড ইউনিয়ন করতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন বলে অভিযোগ করছেন। আর বাধার শিকার হলে নিয়ম অনুযায়ী অভিযোগ করার পরামর্শ মালিকপক্ষের।

বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ এর ১৭৮ নং ধারা (৫) অনুযায়ী, যে প্রতিষ্ঠানের সহিত ট্রেড ইউনিয়নটি সংশ্লিষ্ট তার নাম, এবং এতে নিযুক্ত বা কর্মরত শ্রমিকের মোট সংখ্যা, এবং এই উপ-দফার উদ্দেশ্য পূরণকল্পে, প্রতিষ্ঠানে কতজন শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন, সেই বিষয়ে ওই প্রতিষ্ঠানের কোনও শ্রমিক ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের নিকট প্রত্যয়ন চাইলে তা ১০ কার্যদিবসের মধ্যে সরবরাহ করিতে হইবে।

শ্রমিকনেতারা বলছেন, ট্রেড ইউনিয়ন করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রত্যয়ন চাওয়া অনেকটা বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধার মতো পদ্ধতিতে রূপ নিয়েছে। ভয়েই অনেক শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন করতে সাহস পাচ্ছেন না। এতে ট্রেড ইউনিয়ন তৈরি ও পরিচালনা ব্যহত হচ্ছে বলে বলছেন অনেকেই।

সাভারের একটি পোশাক কারখানায় ট্রেড ইউনিয়নের জন্য চেষ্টা করেও ব্যর্থ এক শ্রমিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'আমি প্রত্যয়ন চেয়ে পাইনি। আবার অনেকেই এখন সাহস পাচ্ছেন না।'

সাভার ও গাজীপুর এলাকায় বিভিন্ন কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে কাজ করা গার্মেন্টস শ্রমিক জোট বাংলাদেশের আশুলিয়া কমিটির সভাপতি মো. রাজু আহমেদ বলেন, 'নতুন ট্রেড ইউনিয়ন করতে প্রত্যয়ন নেওয়ার একটি নিয়ম চালু হয়েছে। এজন্য ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করতে গেলে শ্রমিকদের নানা ধরনের বাধার মুখে পড়তে হয়। অনেক ক্ষেত্রে ইউনিয়নের জন্য আবেদন জমা দেওয়ার পরও সেটি অনুমোদন পায় না। ট্রেড ইউনিয়ন করতে গেলে মালিকপক্ষ প্রায়ই বাধা দেয়। শ্রমিকরা ইউনিয়নের জন্য উদ্যোগ নিলে তাদের বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হয়। অনেক সময় চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হয়।'

শ্রমিকনেতা খায়রুল মামুন মিন্টু বলেন, 'আগে একটি কারখানায় মোট শ্রমিকের ২০ শতাংশ সদস্য হলে সেখানে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করা যেতো। একই কারখানায় তিনটি পর্যন্ত ইউনিয়ন করার সুযোগ ছিল। নতুন আইনে কিছু ইতিবাচক দিক এসেছে, যেমন যেসব কারখানায় ৩০০ জন পর্যন্ত শ্রমিক রয়েছে, সেখানে মাত্র ২০ জন শ্রমিক একত্রিত হয়ে ইউনিয়ন গঠন করতে পারে। এটি নিঃসন্দেহে একটি ভালো উদ্যোগ, কারণ এতে কম সংখ্যক শ্রমিকও সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। তবে এই প্রক্রিয়ায় নতুন কিছু বাধাও তৈরি হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, আইনের ১৭ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে যে ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের জন্য শ্রমিকদের কারখানার ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে একটি প্রত্যয়নপত্র নিতে হবে। এই প্রত্যয়নপত্র নেওয়ার জন্য শ্রমিকদের মালিকের কাছে আবেদন করতে হয়। ফলে মালিক আগেই জানতে পারে যে কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের উদ্যোগ চলছে। এতে করে যারা এই উদ্যোগে জড়িত, তাদের চিহ্নিত করে ইউনিয়ন গঠনের আগেই চাকরি থেকে বাদ দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। ফলে আইনে যে সুরক্ষা থাকার কথা, তা কার্যকর হওয়ার আগেই তা ভেঙে পড়ে। এটি ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা।'

শ্রমিকদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করা যৌক্তিক নয়

বিলসের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ বলেন, 'শ্রমিকদের অন্যতম মৌলিক অধিকার হলো স্বাধীনভাবে সংগঠন গড়ে তোলা। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেনশন অনুযায়ীও এটি একটি স্বীকৃত অধিকার, যা কোনোভাবেই খর্ব করা উচিত নয়। ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের ক্ষেত্রে যদি কারখানার তথ্য বা শ্রমিক সংক্রান্ত কোনও তথ্যের প্রয়োজন হয়, তাহলে সেটি সরকারের পক্ষ থেকেই সংগ্রহ করা উচিত। একটি কারখানায় কতজন শ্রমিক কাজ করেন বা সংশ্লিষ্ট অন্যান্য তথ্য সরকারের কাছেই থাকার কথা, কারণ কারখানা নিবন্ধনের সময় এসব তথ্য সরকার সংগ্রহ করে থাকে। ফলে এই ধরনের তথ্যের জন্য শ্রমিকদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করা বা জটিল প্রক্রিয়া আরোপ করা যৌক্তিক নয়।'

ট্রেড ইউনিয়ন প্রসঙ্গে বিজিএমইএ-এর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান বলেন, 'দেশে আইন রয়েছে। যে কেউ যে কোনও অভিযোগ করতে পারেন। একজন অভিযোগ করলো, আমরা সেটি নিয়ে দৌড়ালাম, আমাদের সময়ের অপচয় হলো। যুক্তিসঙ্গত ও যথাযথ প্রমাণ দিয়ে কেউ যদি বলতে পারে আইনের ব্যত্যয় হচ্ছে, সেই বিষয়ে নিয়ম অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'