চট্টগ্রামে বাস ও ট্রাক ভাড়া নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি। সরকারিভাবে ভাড়া বৃদ্ধির কোনো ঘোষণা না থাকলেও পরিবহণ মালিকরা ইতোমধ্যেই যাত্রীভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন। একইসঙ্গে বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী পণ্যবাহী ট্রাকের ভাড়াও অতিরিক্ত আদায় করা হচ্ছে, যা স্থানীয় বাজারে চালসহ অন্যান্য পণ্যের মূল্যে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
ট্রাক ভাড়ায় আকস্মিক উল্লম্ফন
চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লার আশুগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় চাল পরিবহণে ট্রাক ভাড়া আগে ছিল ১২ হাজার টাকা থেকে ১৪ হাজার টাকা। এই ভাড়া এখন দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার টাকা থেকে ২২ হাজার টাকায়। অর্থাৎ প্রতি ট্রিপে আট হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া বেড়েছে, যা একটি উল্লেখযোগ্য উল্লম্ফন। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার বা টেকনাফ রুটেও পণ্য পরিবহণে এখন দ্বিগুণ ভাড়া দাবি করা হচ্ছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর থেকে পরিবহণ শ্রমিকরা দাম বৃদ্ধির ব্যাপারে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন, যার প্রভাব সরাসরি পণ্যের বাজারে পড়ছে।
যাত্রীভাড়ায় অযৌক্তিক বৃদ্ধি
এ পরিস্থিতিতে যাত্রী ও পরিবহণ শ্রমিকদের মধ্যে প্রায়ই তর্ক-বিতর্ক ও উত্তেজনার ঘটনা ঘটছে। শুধু ডিজেল বা অকটেনচালিত যানবাহনই নয়, সিএনজিচালিত যানবাহনের ভাড়াও অযৌক্তিকভাবে বাড়ানো হচ্ছে। অথচ গ্যাসের দামের ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি, যা যাত্রীদের জন্য অসম্ভব চাপ সৃষ্টি করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার পর সরকার এখন পর্যন্ত ভাড়া সমন্বয়ের বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি। তবে পূর্বনির্ধারিত সরকারি বাসভাড়ার নির্দেশনা পরিবহণ মালিক ও শ্রমিকরা মানছেন না, ফলে সাধারণ যাত্রীরা প্রায়ই হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব
শনিবার রাতে চার ধরনের তেলের দাম প্রতি লিটারে ১৫ থেকে ২০ টাকা বাড়ানোর ঘোষণা দেয় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ, যা রোববার থেকে কার্যকর হয়েছে। নতুন দাম অনুযায়ী লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ডিজেলের দাম ধরা হয়েছে ১১৫ টাকা। অকটেনে লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৪০, পেট্রলে লিটারে ১৯ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই দাম বৃদ্ধি সরাসরি পরিবহণ খাতে ভাড়া বাড়ানোর অজুহাত হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বাস ভাড়ার চার্ট ও বাস্তবতা
বিআরটিএ সূত্র জানায়, ২০২২ সালে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে চট্টগ্রাম জেলা আঞ্চলিক পরিবহণ কমিটি বর্ধিত ভাড়া নির্ধারণ করে, যা ওই বছরের ৬ আগস্ট থেকে কার্যকর হয়। এরপর জ্বালানি তেলের দাম একাধিকবার কমানো হলেও বাস ভাড়া কমানো হয়নি। চট্টগ্রাম জেলা আঞ্চলিক পরিবহণ কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভাড়ার চার্টে দেখা যায়, বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল থেকে শিকলবাহা ক্রসিং পর্যন্ত ১০ কিলোমিটারের ভাড়া ২২ টাকা। একইভাবে টার্মিনাল থেকে পটিয়া বাস স্টেশন পর্যন্ত ২৭ কিলোমিটারের ভাড়া ৫৯ টাকা, সাতকানিয়ার কেরানীহাট পর্যন্ত ৫১ কিলোমিটারের বাস ভাড়া ১১২ টাকা।
স্থানীয় পর্যায়ে অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, শিকলবাহা ক্রসিং পর্যন্ত নির্ধারিত ২২ টাকার ভাড়ার বিপরীতে যাত্রীদের কাছ থেকে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা আদায় করা হচ্ছে। পটিয়া স্টেশন রুটে ৫৯ টাকার পরিবর্তে ৭০ থেকে ৭৫ টাকা নেওয়া হচ্ছে। একইভাবে কেরানীহাট পর্যন্ত ১১২ টাকার ভাড়া এখন ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায় আদায় করা হচ্ছে, যা সরকারি নির্দেশনার চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
পণ্য পরিবহণ খাতে চাপ বৃদ্ধি
অন্যদিকে, ডিজেলের দাম বৃদ্ধির পর থেকেই পণ্য পরিবহন খাতে ভাড়ার চাপ আরও বেড়েছে। ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের ভাড়া অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে ঘিরে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার পর থেকেই এই খাতে ব্যয় অনেকটা বেড়ে যায়, ফলে পণ্য পরিবহনের খরচ প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি পৌঁছে। জ্বালানি তেলের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির পর এই খাতে ভাড়া আরও বাড়ানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চট্টগ্রামের চাক্তাইয়ের ব্যবসায়ী কামরুল হাসান জানান, চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লার আশুগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় চাল পরিবহণে ট্রাক ভাড়া ছিল ১২ হাজার টাকা থেকে ১৪ হাজার টাকা। এই ভাড়া এখন দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার টাকা থেকে ২২ হাজার টাকায়। অর্থাৎ প্রতি ট্রিপে আট হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া বেড়েছে। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার বা টেকনাফ রুটেও পণ্য পরিবহণে এখন দ্বিগুণ ভাড়া দাবি করা হচ্ছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর থেকে পরিবহণ শ্রমিকরা দাম বৃদ্ধির ব্যাপারে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন, যার প্রভাব পড়েছে চালসহ অন্যান্য পণ্যের বাজারে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।



