কোরবানির চামড়ায় কাঙ্ক্ষিত দাম না পেয়ে হতাশ ব্যবসায়ীরা
কোরবানির চামড়ায় কাঙ্ক্ষিত দাম না পেয়ে হতাশ ব্যবসায়ীরা

রাজধানীর চামড়ার আড়তগুলোতে এখন কোরবানির পশুর চামড়া কেনাবেচা ও সংরক্ষণের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন ব্যবসায়ী ও শ্রমিকেরা। গত শুক্রবার পুরান ঢাকার পোস্তার একটি কারখানায় চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ চলছিল।

দাম নির্ধারণ ও বাস্তবতা

কোরবানির ঈদের সময় পশুর চামড়া বিক্রি করে এ বছরও কাঙ্ক্ষিত দাম পাননি কোরবানিদাতা ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা; বরং সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রায় অর্ধেক দামে গরুর কাঁচা চামড়া বিক্রি হয়েছে। আর ছাগলের চামড়ার প্রতি কোনো আগ্রহই দেখা যায়নি ক্রেতাদের। অন্যদিকে দাম না পেয়ে রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় কাঁচা চামড়া ফেলে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। গত বৃহস্পতিবার দেশে কোরবানির ঈদ অনুষ্ঠিত হয়। সাধারণত ঈদের তৃতীয় দিন পর্যন্ত কাঁচা চামড়া বেচাকেনা হয়।

গরুর লবণযুক্ত চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুটে গত বছরের চেয়ে এবার ২ টাকা বাড়িয়েছিল সরকার। তবে সেই দরে চামড়া বিক্রি হয়নি। উল্টো গত বছরের চেয়েও প্রতিটি চামড়া ১৫০ থেকে ২০০ টাকা কম দামে বিক্রি হয়েছে। চামড়ার মৌসুমি ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের দাবি, সরকার দাম বাড়ালেও ট্যানারির মালিকেরা বাড়তি দামে চামড়া কিনতে চান না। তবে ট্যানারির মালিকদের দাবি, গত বছরের তুলনায় এবার কাঁচা চামড়ার দাম কমেনি, বরং প্রতিটিতে ৫০-৬০ টাকা বেড়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ঢাকায় ৬ লাখ কাঁচা চামড়া সংগ্রহ

সরকারি নির্দেশনা অনুসারে, ঈদের দিন থেকে পরবর্তী ১০ দিন রাজধানী ঢাকায় পশুর কাঁচা চামড়া ঢুকতে পারে না। এ সময় ঢাকার মধ্যে সাভারের চামড়াশিল্প নগরীতে ট্যানারির মালিকেরা এবং পুরান ঢাকার পোস্তা এলাকায় আড়তদারেরা কাঁচা চামড়া লবণযুক্ত করেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে, এ বছর গরু-ছাগলসহ কোরবানির জন্য প্রায় ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৪ হাজার পশু প্রস্তুত ছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত কত পশু কোরবানি হয়েছে, সে হিসাব পাওয়া যায়নি। চলতি বছর ঈদে সব মিলিয়ে ৭৫ থেকে ৮০ লাখ চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ট্যানারি প্রতিষ্ঠানগুলো। এর মধ্যে গতকাল রোববার সকাল পর্যন্ত চামড়াশিল্প নগরীতে ৫ লাখ ২৯ হাজার কাঁচা চামড়া ঢুকেছে। আর পোস্তার আড়তদারেরা ৭৫-৮০ হাজার কাঁচা চামড়া লবণজাত করতে পেরেছেন। ঢাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে কাঁচা চামড়ায় লবণ দেওয়া হয়েছে। সেগুলো পরে ট্যানারিতে পাঠানো হবে।

পোস্তার আড়তদারদের সংগঠন বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (বিএইচএসএমএ) সভাপতি মঞ্জুর হাসান জানান, এ বছর পোস্তায় এক লাখের বেশি চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্য ছিল। কিন্তু ট্যানারির মালিকদের থেকে বকেয়া টাকা না পাওয়া, জায়গার স্বল্পতা ও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কাঁচা চামড়া নষ্ট হওয়ায় সেটি সম্ভব হয়নি।

নির্ধারিত দাম মানে না কেউ

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রতিবছর লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয়। এবার ঢাকায় গরুর প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয় ৬২ থেকে ৬৭ টাকা, যা গত বছর ছিল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা। সাধারণত বড় আকারের গরুর চামড়া ৩১-৪০ বর্গফুট, মাঝারি চামড়া ২১-৩০ এবং ছোট চামড়া ১৬-২০ বর্গফুটের হয়ে থাকে। গরুর মাঝারি আকারের চামড়া সবচেয়ে বেশি বেচাকেনা হয়। লবণযুক্ত মাঝারি আকারের একটি চামড়ার গড় দাম হয় প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকা।

এ বছর পোস্তায় এক লাখের বেশি চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্য ছিল। কিন্তু ট্যানারির মালিকদের থেকে বকেয়া টাকা না পাওয়া, জায়গার স্বল্পতা ও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কাঁচা চামড়া নষ্ট হওয়ায় সেটি সম্ভব হয়নি।

মঞ্জুর হাসান, সভাপতি, বিএইচএসএমএ

কোরবানির ঈদের দু-তিন দিন ব্যবসায়ীরা সাধারণত কাঁচা চামড়া কিনে থাকেন। একেকটি কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাত করতে লবণ, পরিবহন খরচ ও শ্রমিকের মজুরি বাবদ সর্বোচ্চ ৪০০ টাকা ব্যয় হয়। সে হিসাবে ঢাকায় মাঝারি আকারের কাঁচা চামড়ার গড় দাম দাঁড়ায় ১ হাজার ২০০ টাকা। কিন্তু ঈদের তিন দিন রাজধানীতে মাঝারি আকারের চামড়া ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। অর্থাৎ সরকার নির্ধারিত দামের প্রায় অর্ধেক দামে কাঁচা চামড়া বেচাকেনা হয়েছে। এবার রাজধানীতে ছোট আকারের চামড়া ২৫০-৪০০ টাকা ও বড় চামড়ার ৭০০-৯০০ টাকা দাম উঠেছে। তবে তা সরকার নির্ধারিত দামের প্রায় অর্ধেক।

ঢাকার বাইরের বিভিন্ন এলাকাতেও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক কমে কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রির খবর পাওয়া গেছে। যেমন চট্টগ্রামে প্রতিটি চামড়া ২০০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়েছে। তবে বেশির ভাগ মৌসুমি বিক্রেতা ৩৫০ টাকার বেশি দাম পাননি বলে জানান। এ ছাড়া রাজশাহীতে গরুর মাঝারি চামড়া ৪০০-৬৫০ টাকায়, যশোরে ৪০০-৬০০ ও বরিশালে তা ৩০০-৪০০ টাকায় বেচাকেনা হয়েছে। গরুর ছোট চামড়ার বেশির ভাগই আড়তদারেরা কিনতে চাননি।

আড়তদার ও ট্যানারি যা বলছেন

কাঁচা চামড়ার দাম কম কেন এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএইচএসএমএর সভাপতি মঞ্জুর হাসান বলেন, ‘অনেক কাঁচা চামড়া রোগাক্রান্ত, কাটাছেঁড়া ও ছোট আকারের থাকে। এগুলো পরে ফেলে দিতে হয়। কিন্তু মৌসুমি ব্যবসায়ীরা সব চামড়ার গড় দাম চান। ফলে আমাদের এই হিসাব করেই দাম নির্ধারণ করতে হয়।’

সাভারের হেমায়েতপুরে অবস্থিত চামড়াশিল্প নগরের কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় পাশের ধলেশ্বরী নদী ও পরিবেশদূষণ হচ্ছে। এ কারণে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বেশি দামে চামড়া রপ্তানি করতে পারছে না ট্যানারিগুলো। ফলে দেশেও চামড়ার দাম বাড়ছে না। এমন তথ্য জানিয়ে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) চেয়ারম্যান মো. শাহীন আহমেদ বলেন, রপ্তানিতে দাম বাড়লে এমনিতেই স্থানীয় বাজারে কাঁচা চামড়ার দাম বাড়বে। যদিও বর্তমানে কিছু মৌসুমি ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগীর কারণে অনেক স্থানে কাঁচা চামড়ার দাম কমে যায়। তবে লবণযুক্ত চামড়ার দাম সরকার নির্ধারিত দামেই বিক্রি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।