ঈদের রাতে বালিকান্দি চামড়াবাজার: ঐতিহ্য আর সংকটের মেলবন্ধন
ঈদের রাতে বালিকান্দি চামড়াবাজার: ঐতিহ্য-সংকট

গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে কোরবানির ঈদের সন্ধ্যায় মৌলভীবাজার সদর উপজেলার চাঁদনীঘাট ইউনিয়নের পুরোনো বালিকান্দি চামড়ার হাট সরব হয়ে ওঠে শতাধিক মানুষের কোলাহলে। মনু নদের তীরবর্তী এই বাজারটি এলাকার ঐতিহ্য বহন করে। ব্যবসা-বাণিজ্যের নানা সংকট, লোকসান বা পাওনা আটকে থাকার গল্প থাকলেও, চামড়া ঘিরে এ রাতের কর্মচাঞ্চল্য বজায় থাকে।

ছুটা মাংসের হাট

চাঁদনীঘাট মনু সেতুর কাছে দেখা যায়, আশপাশে মানুষের ভিড়। কারও সামনে ছোট ছোট ব্যাগ, কারও হাতে মাংসের পুঁটলি। কেউ ওজন দেখছেন, কেউ দরদাম করছেন। এটি মূলত ‘ছুটা মাংসের’ একবেলার হাট। বিভিন্ন এলাকায় কোরবানির গরু জবাইয়ের কাজ করা লোকজন কিংবা বাসাবাড়ি ঘুরে সংগ্রহ করা মাংস এখানে এনে বিক্রি করেন। সীমিত আয়ের মানুষেরা এ হাটের প্রধান ক্রেতা।

রাতের ব্যস্ততা

রাত প্রায় নয়টার দিকে বাজারে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে পা ফেলার জায়গা নেই। আধা কিলোমিটারজুড়ে শুধু মানুষে গিজ গিজ আর এখানে–সেখানে চামড়ার স্তূপ। বৃষ্টির মধ্যেও যাতে কাজে ছেদ না পড়ে, এ জন্য অনেকেই ত্রিপল টানিয়ে নিয়েছেন। কোথাও ট্রাক থেকে চামড়া নামানো হচ্ছে, কোথাও পিকআপ কিংবা সিএনজিচালিত অটোরিকশা এসে থামছে। কেউ আগেই আড়তদারের সঙ্গে যোগাযোগ করে চামড়া নিয়ে এসেছেন, কেউ আবার বাজারে এসেই দরদাম করছেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দাম ও প্রক্রিয়াজাতকরণ

খুচরা বিক্রেতাদের অনেকেই বলছিলেন, চামড়ার দাম তুলনামূলকভাবে কম। তারপরও যে টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে, গাড়িভাড়া দেওয়া হয়েছে—সেটুকু তুলতেই মরিয়া হয়ে বিক্রি করতে হচ্ছে। দরদাম চূড়ান্ত হলেই শুরু হয় চামড়া প্রক্রিয়াজাতের ব্যস্ততা। কেউ চামড়ায় লেগে থাকা মাংস আলাদা করছেন, কেউ সেই মাংস বিক্রিও করছেন। কোথাও কাঁচা চামড়া পরিষ্কার করা হচ্ছে, কোথাও লবণ মাখানো হচ্ছে। এসব কাজের জন্য আছে আলাদা শ্রমিক দল। বছরের এই একটি রাতেই তাঁরা এখানে কাজ করেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

স্থানীয়দের অভিমত

বালিকান্দি গ্রামের বাসিন্দা আবদুল মান্নান বলেন, একসময় তিনিও চামড়ার ব্যবসা করতেন। কিন্তু ট্যানারির মালিকদের কাছে টাকা আটকে গিয়ে লোকসান হওয়ায় ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। তবু তাঁর মতে, বালিকান্দির এই চামড়ার বাজার এখন শুধু ব্যবসা নয়, একটি ঐতিহ্য। তাঁর দাবি, ৪০-৫০ বছর আগে বাজার এত জমজমাট ছিল না, কিন্তু তখন চামড়ার দাম ছিল। এখন মানুষ বেশি, চামড়ার দাম নেই।

আয়ের সুযোগ ও উৎসব

স্থানীয় ব্যক্তিদের ভাষ্য, এই একটি রাতের জন্য অনেকে সারা বছর অপেক্ষা করেন। ঈদের দিন সন্ধ্যা নামলেই তাঁরা বাজারে চলে আসেন। কারও কাছে এটি আয়ের সুযোগ, কারও কাছে উৎসব।

শ্রমিকদের মজুরি

বালিকান্দি চামড়া ব্যবসায়ী সমিতি সূত্রে জানা গেছে, কাজের ধরন ও দক্ষতা অনুযায়ী শ্রমিকদের দেড় হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত মজুরি দেওয়া হয়।

ব্যবসায়ীদের সংকট

সমিতির সভাপতি মো. শওকতের সঙ্গে কথা বলার মতো ফুরসতও তখন নেই। কখনো চামড়া কেনা, কখনো লবণের ব্যবস্থা, কখনো শ্রমিকদের কাজ তদারকি—সব মিলিয়ে ব্যস্ততা। তিনি জানান, রাত সাড়ে নয়টা পর্যন্ত ১০০ থেকে ৭০০ টাকা দরে প্রায় দুই হাজার ছোট-বড় চামড়া কিনেছেন। অথচ ট্যানারি মালিক ও আড়তদারদের কাছে তাঁর প্রায় এক কোটি টাকা পাওনা পড়ে আছে। মো. শওকতের দাবি, বাজারটির বয়স প্রায় ২০০ বছর। একসময় এখানে শতাধিক স্থায়ী ব্যবসায়ী ছিলেন। এখন সারা বছর ব্যবসা করেন চার-পাঁচজন। লোকসান খেতে খেতে অনেকে ছেড়ে দিয়েছেন।