১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ক্ষমতা গ্রহণের ১০০ দিন পূর্ণ করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সরকার। সোমবার সরকার দাবি করেছে যে, অর্থনীতি, কল্যাণ, কৃষি, শাসন ও অবকাঠামোতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। একই সঙ্গে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছে সরকার। মুদ্রাস্ফীতি, কর্মসংস্থান ও আইন-শৃঙ্খলা নিয়ে ক্রমবর্ধমান জনচাপের মধ্যেই সরকার তাদের প্রাথমিক কর্মকাণ্ডের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সংবাদ ব্রিফিং
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও পিএমওর মুখপাত্র মাহদি আমিন বলেন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রশাসন দ্রুত, দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকার জানায়, প্রথম ১০০ দিনে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ ও দীর্ঘমেয়াদী সংস্কার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
মন্ত্রিসভার সভা ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন
ব্রিফিং অনুযায়ী, ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৪ মে পর্যন্ত মন্ত্রিসভার ১০টি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে ৬০টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়েছে। এর মধ্যে ৩৭টি সিদ্ধান্ত (প্রায় ৬২ শতাংশ) ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে, বাকিগুলো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
কল্যাণমূলক উদ্যোগ
সরকার বেশ কয়েকটি কল্যাণমূলক উদ্যোগ তুলে ধরে, যার মধ্যে রয়েছে ফ্যামিলি কার্ড চালু, ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খতিবদের সম্মানী ভাতা প্রদান এবং প্রিপেইড বিদ্যুৎ মিটারের অতিরিক্ত মাসিক চার্জ প্রত্যাহার।
কৃষি খাতে অগ্রগতি
কৃষি খাতে সরকার ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফ, দেশব্যাপী কৃষক কার্ড চালু এবং সেচ ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড উন্নত করতে খাল খনন কর্মসূচি পুনরুজ্জীবিত করার কথা জানায়।
অর্থনৈতিক সূচক
অর্থনীতি প্রসঙ্গে মাহদি আমিন বলেন, মুদ্রাস্ফীতি ৮.৭১ শতাংশে নেমে এসেছে, অন্যদিকে মাসিক রেমিট্যান্স প্রবাহ প্রায় ৩.৭৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা রেকর্ড। সরকার আরও জানায়, এস আলম গ্রুপের ৪ হাজার ২৬৪ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে এবং একাধিক দেশের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে বিদেশে পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। কর্মকর্তারা বলেন, এই সময়ে সরকার ৯০.৬৬ মিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করেছে।
বৃহৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা
তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের পাশাপাশি সরকার বেশ কয়েকটি বৃহৎ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করে, যার মধ্যে রয়েছে ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গঠন, টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত অর্থনৈতিক করিডোর স্থাপন, পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালু করা। এছাড়া স্টার্টআপ তহবিল, জেলা পর্যায়ে কর্মসংস্থান বিনিময় কেন্দ্র এবং ফ্রিল্যান্সার ও প্রবাসী কর্মীদের জন্য বিশেষ পরিচয়পত্র ও প্রবাসী কার্ড চালুর পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়।
আইন-শৃঙ্খলা ও বিচার
আইন-শৃঙ্খলা প্রসঙ্গে সরকার রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল এবং মেহেরপুরের শিশু ধর্ষণ মামলায় ২৯ কার্যদিবসের মধ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কথা উল্লেখ করে। কর্মকর্তারা তানু হত্যা মামলার তদন্তে অগ্রগতি এবং শরীফ ওসমান হাদী হত্যা মামলার একজন সন্দেহভাজনকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টার কথাও জানান।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সরকার নারী শিক্ষার্থীদের অনার্স স্তর পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা, মেধাভিত্তিক বৃত্তি, বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই ও স্মার্ট ক্লাসরুম সম্প্রসারণ, দেশব্যাপী হাম টিকাদান অভিযান এবং মাতৃত্বকালীন ছুটির সুবিধা বৃদ্ধির কথা জানায়।
অন্যান্য উদ্যোগ
অন্যান্য ঘোষিত উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশি পাসপোর্টে 'ইসরায়েল ব্যতীত' উল্লেখ পুনরুদ্ধার, পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানো, ঢাকায় ২৫০টি বৈদ্যুতিক বাস চালু এবং ক্রীড়াবিদদের জন্য স্পোর্টস কার্ড চালু।
জনমত ও চ্যালেঞ্জ
মাহদি আমিন বলেন, সরকারের প্রথম ১০০ দিন 'জনগণের মধ্যে পুনরায় আশা সঞ্চার করেছে' এবং দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ভিত্তি স্থাপন করেছে। তবে আশাবাদী মূল্যায়ন সত্ত্বেও বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের জন্য প্রকৃত চ্যালেঞ্জ এখন ঘোষণা ও লক্ষ্যমাত্রার বাইরে গিয়ে দৈনন্দিন জীবনে দৃশ্যমান উন্নতি আনা, কারণ বাংলাদেশ এখনও মুদ্রাস্ফীতির চাপ, বেসরকারি বিনিয়োগে মন্দা, বেকারত্ব ও শাসন সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে।



