পশ্চিমবঙ্গে কুরবানি ঘিরে গরু বিতর্কে হিন্দু খামারিরা চরম বিপাকে
পশ্চিমবঙ্গে কুরবানি ঘিরে গরু বিতর্কে হিন্দু খামারিরা বিপাকে

পবিত্র কুরবানি ঈদের আর মাত্র কয়েকদিন বাকি থাকলেও, পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ অর্থনীতিতে এবার আনন্দের বদলে বিরাজ করছে এক অস্বস্তিকর থমথমে ভাব। রাজ্যজুড়ে চলমান গরু বিতর্ক ও কড়াকড়ির জেরে এবার চরম বিপাকে পড়েছেন সনাতন ধর্মাবলম্বী (হিন্দু) খামারি এবং ব্যবসায়ীরা, যারা বছরের এই সময়টাতে বড় লাভের আশায় গবাদি পশু লালন-পালন ও কেনাবেচা করেন।

ভাঙড়ের সোনালি ঘোষের কাহিনী

দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড়ের এমনই একজন হিন্দু গরু ব্যবসায়ী সোনালি ঘোষ। তার কণ্ঠে এখন স্পষ্ট ভবিষ্যৎ হারানোর হতাশা ও ক্ষোভ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই আইনি ও রাজনৈতিক কড়াকড়ির প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে গ্রামীণ পশুর হাটে, যেখানে ধর্মীয় পরিচয় ছাপিয়ে এক বিশাল অর্থনৈতিক লোকসানের মুখে পড়েছেন হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের প্রান্তিক ব্যবসায়ীরাই।

সোনালি ঘোষ বলেন, সমস্ত জমি-জায়গা বন্ধক রেখে, সোনা বন্ধক দিয়ে ঋণ নিয়ে এই ব্যবসা চালাই। এবার গরু বিক্রি না হলে ঋণ শোধ করব কিভাবে? নিজেরাই বা খাব কী? তিনি জানান, যারা গরু কিনেছিলেন, তারা এখন আর নিতে চাইছেন না। উল্টো টাকা ফেরত চাইছেন। গরু বিক্রির টাকা আগেই খরচ হয়ে গেছে, এখন ফেরত দেবেন কী করে, এই চিন্তায় রাতের ঘুম নেই অনেক খামারির। আনন্দবাজারসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এমনই ক্ষোভের কথা উঠে এসেছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অন্যান্য ব্যবসায়ীদের অবস্থা

আরেক ব্যবসায়ী সরস্বতী ঘোষ বলছেন, অন্তত এবারটা ছাড় দিত। তারপর ব্যবসা ছেড়ে দিতাম। ব্যাংকের ঋণ আছে, সেটাও মওকুফ করে দিক। গোবিন্দ মল্লিকের মতো অনেকেই ধার-দেনায় ব্যবসা চালাতেন। এখন টাকা ডুবে যাওয়ার আশঙ্কায় দিশেহারা।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

হিন্দু খামারিরাই মূলত ক্ষতিগ্রস্ত

পশ্চিমবঙ্গে গরু পালন ও কুরবানির ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বেশিরভাগ পরিবারই হিন্দু- বিশেষ করে ঘোষ সম্প্রদায়ের। তারা কম দামে গরু কিনে লালন-পালন করেন এবং ঈদের সময় মুসলিম ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করেন। এই বিক্রির টাকা দিয়েই সারা বছরের সংসার চলে— ছেলেমেয়ের পড়াশোনা, বিয়ে, চিকিৎসা, ঘর সংস্কার সব। শুধু খামারি নয়, গরুর খড়-ভুসি সরবরাহকারী, চিকিৎসক, চামড়া ব্যবসায়ী, ছুরি-বটি তৈরির কারিগর— এই চেইনের সঙ্গে জড়িত লাখ লাখ দরিদ্র পরিবারের জীবিকা এখন সংকটে।

নতুন সরকারের নীতি ও তার প্রভাব

গত ৪ মে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবার সরকার গঠন করার পর থেকেই অবৈধ পশুর হাট বন্ধ, পুরনো আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ১৯৫০ সালের প্রাণিসম্পদ আইন অনুসারে ১৪ বছরের কম বয়সী গরু-মহিষ জবাইয়ে নিষেধাজ্ঞা, লিখিত অনুমতি, শুধু অনুমোদিত কসাইখানায় জবাই— এসব নিয়ম কড়াকড়িভাবে মানতে বলা হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে রাজ্যের অনেক মুসলিম ধর্মীয় নেতা গরু কুরবানি না করার পরামর্শ দিয়েছেন। নাখোদা মসজিদের ইমাম মোহাম্মদ শফিক কাসেমি বলেছেন, দয়া করে গরু কুরবানি করবেন না। গরুর মাংসও খাবেন না। ফুরফুরা শরিফের পীরজাদা ত্বহা সিদ্দিকীও একই ধরনের আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের যুক্তি— গরু বিক্রেতারা মূলত হিন্দু। মুসলমানরা গরু না কিনলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে হিন্দু খামারিদেরই। কেউ কেউ বলছেন, বিজেপি মুসলমানদের টাইট দিতে গিয়ে হিন্দু ভাইদেরকেই বিপদে ফেলেছে।

দুধ ব্যবসায়ীদেরও বিপদ

শুধু কুরবানির ব্যবসা নয়, দুধ উৎপাদনকারীরাও চিন্তিত। গরু বিক্রি করতে না পারলে তাদের পালন করা কঠিন হয়ে পড়বে। একটি গরু পালনে মাসে গড়ে ১০ হাজার টাকার মতো খরচ। দুধ না দিলে এই খরচ বহন করা দুষ্কর। রাজ্যের কিছু মুসলিম এলাকায় 'গরু কুরবানি বয়কট, আইন সবার উপরে' স্লোগানে মিছিলও হয়েছে। অন্যদিকে আম জনতা উন্নয়ন পার্টির হুমায়ুন কবীরসহ কয়েকজন নেতা বলছেন, গরু-ছাগল কুরবানি হবেই। আগুন নিয়ে খেলবেন না।

বড় অঙ্কের বাণিজ্য

বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে কুরবানির গরুর বাজার কয়েক হাজার কোটি টাকার। এই বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ। এখন এই ব্যবস্থায় হঠাৎ পরিবর্তন এলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বেন নিম্নবিত্ত খামারি ও ব্যবসায়ীরা। পরিস্থিতি নিয়ে রাজ্যজুড়ে চলছে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা। কেউ বলছেন গরুর জন্মসনদ চালু করা হোক, কেউ আবার বলছেন গরুকে জাতীয় পশু ঘোষণা করে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা উচিত। ঈদ যতই ঘনিয়ে আসছে, পশ্চিমবঙ্গের 'গরুর গেরো' ততই জটিল হয়ে উঠছে।