ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশের তৈরি পোশাক খাতের অধিকাংশ কারখানায় শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও ঈদ বোনাস পরিশোধ কার্যক্রম প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে এখনও কিছু কারখানায় এপ্রিল মাসের বেতন ও ঈদ বোনাস বকেয়া রয়েছে, যা নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগ রয়ে গেছে।
বেতন-বোনাস পরিস্থিতি
শ্রম ও শিল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২৩ মে পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে ২৪ মে প্রকাশিত সারসংক্ষেপ প্রতিবেদনে ঢাকা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের মোট ২ হাজার ১৩৪টি চালু কারখানার বেতন-বোনাস পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা যায়, অধিকাংশ কারখানাই মার্চ ও এপ্রিল মাসের বেতন পরিশোধ করেছে এবং ঈদ বোনাসও দিয়েছে।
মার্চের বেতন প্রায় শতভাগ পরিশোধ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মিলিয়ে মোট ২ হাজার ১৩৩টি কারখানা মার্চ মাসের বেতন পরিশোধ করেছে, যা মোট চালু কারখানার ৯৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ। মাত্র একটি কারখানায় মার্চের বেতন বকেয়া রয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ঈদের আগে শ্রমিক অসন্তোষ এড়াতে মালিকরা এবার তুলনামূলক দ্রুত বেতন পরিশোধে গুরুত্ব দিয়েছেন। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে অর্ডার পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ায় নগদ প্রবাহ আগের তুলনায় ভালো রয়েছে।
এপ্রিলের বেতনেও অগ্রগতি
এপ্রিল মাসের বেতন পরিশোধ করেছে ২ হাজার ১১১টি কারখানা, যা মোট কারখানার প্রায় ৯৮ দশমিক ৯২ শতাংশ। এখনও ২৩টি কারখানায় এপ্রিলের বেতন বকেয়া রয়েছে।
এর মধ্যে ঢাকায় ১৫টি এবং চট্টগ্রামে ৮টি কারখানা এপ্রিলের বেতন পরিশোধ করতে পারেনি। যদিও সংখ্যাটি খুব বেশি নয়, শ্রমিক সংগঠনগুলো বলছে—ঈদের আগে বকেয়া পরিশোধ নিশ্চিত করা জরুরি।
ঈদ বোনাসে ঢাকার চিত্র ভালো, পিছিয়ে চট্টগ্রাম
ঈদ বোনাস পরিশোধের ক্ষেত্রে ঢাকার কারখানাগুলোর অবস্থান তুলনামূলক ভালো। ঢাকা অঞ্চলে মোট ১ হাজার ৭৯৪টি চালু কারখানার মধ্যে ১ হাজার ৬৯৮টি কারখানা ইতোমধ্যে ঈদ বোনাস দিয়েছে, যা মোটের ৯৫ দশমিক ১৩ শতাংশ। এখনও ৯৬টি কারখানা বোনাস দেয়নি।
অপরদিকে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ৩৪০টি কারখানার মধ্যে মাত্র ২৬৭টি কারখানা ঈদ বোনাস পরিশোধ করেছে। অর্থাৎ সেখানে বোনাস পরিশোধের হার ৭৮ দশমিক ৫৩ শতাংশ। এখনও ৭৩টি কারখানায় বোনাস বকেয়া রয়েছে, যা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
শ্রমিক নেতাদের মতে, চট্টগ্রামের কিছু কারখানা রফতানি আদেশ ও আর্থিক সংকটে থাকায় বোনাস প্রদানে দেরি হচ্ছে। তবে ঈদের আগে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে দ্রুত বোনাস পরিশোধ জরুরি।
অগ্রিম বেতন দিচ্ছে সীমিত সংখ্যক কারখানা
মে মাসের অগ্রিম বেতন প্রদানের প্রবণতা তুলনামূলক কম দেখা গেছে। সারাদেশে মাত্র ৫৩২টি কারখানা মে মাসের অগ্রিম বেতন দিয়েছে বা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা মোট কারখানার প্রায় ২৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ।
ঢাকায় ৪৮৭টি এবং চট্টগ্রামে ৪৫টি কারখানা অগ্রিম বেতন প্রদান করেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক প্রতিষ্ঠান ঈদের আগেই মে মাসের পূর্ণ বেতন পরিশোধের পরিকল্পনা করায় অগ্রিম প্রদানের সংখ্যা কম।
২৬ মে সবচেয়ে বেশি শ্রমিক ঢাকা ছাড়বেন
ঈদ উপলক্ষে শ্রমিকদের নিজ নিজ এলাকায় যাত্রার সময়সূচিও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, ২৪ মে ঢাকা ছাড়বে ১০৮টি কারখানার শ্রমিক, ২৫ মে ছুটি দেবে ৬৬৪টি কারখানা, ২৬ মে সবচেয়ে বেশি, অর্থাৎ ৭৭১টি কারখানা ছুটি দেবে। আর ২৭ মে ছুটি দেবে ২৫১টি কারখানা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ২৬ মে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক শ্রমিক ঢাকা ত্যাগ করায় সড়ক, রেল ও নৌপথে বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। এজন্য পরিবহন ব্যবস্থাপনায় আগাম প্রস্তুতি জরুরি।
শ্রমিক অসন্তোষ এড়াতে নজরদারির তাগিদ
শ্রম মন্ত্রণালয়, শিল্প পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে যেসব কারখানায় এখনও বেতন বা বোনাস বকেয়া রয়েছে, সেগুলোর ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ঈদের আগে বকেয়া পরিশোধ নিশ্চিত করা গেলে শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষের ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসবে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক ঈদযাত্রা নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।



