কুরবানির ঈদ উপলক্ষে আশানুর ইসলামের গরুর আবাসিক হোটেলে এখন গরু দিয়ে ভরপুর। রংপুরের বারো আউলিয়া এলাকায় অবস্থিত এই হোটেলটি গরু ব্যবসায়ীদের জন্য এক আস্থার জায়গা হয়ে উঠেছে।
গরুর হোটেলের সূচনা
আশানুর ইসলাম (৪৫) ছোটবেলা থেকে বাবা আনছার আলীর সঙ্গে হাটে গিয়ে গরু কিনতেন। তখন তিনি দেখতেন, গরু কেনার পর সেটিকে রাখার জায়গা থাকত না। ঝড়-বৃষ্টি বা রোদে গরু শারীরিকভাবে কষ্ট পেত। এমনকি হঠাৎ করে গরু মারা যেত, যা ব্যবসায়ীদের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হতো। এই অভিজ্ঞতা থেকে আশানুর ভাবেন, গরু রাখার জন্য একটি হোটেল করলে কেমন হয়, যেখানে ব্যবসায়ীরা গরু কিনে রাখতে পারবেন এবং সময়মতো গন্তব্যে পাঠাতে পারবেন। পরে বাবার পরামর্শে তিনি গরুর আবাসিক হোটেল খোলার সিদ্ধান্ত নেন।
দশ বছরে আশানুরের গরুর হোটেলের খবর দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে। এখন এটি ব্যবসায়ীদের কাছে আস্থার জায়গায় পরিণত হয়েছে।
হোটেলের অবস্থান ও সুবিধা
রংপুর নগরের মডার্ন মোড় পার হয়ে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে বারো আউলিয়া এলাকায় এই হোটেলটি অবস্থিত। আগে এটি মডার্ন মোড়ের বাঁপাশে ছিল, কিন্তু বছর দেড়েক আগে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের ডানপাশে জায়গা ভাড়া নিয়ে নতুন করে করা হয়েছে।
মঙ্গলবার সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, মহাসড়কের পাশে ৫০ শতক জমিতে টিনের শেড তৈরি করা হয়েছে। ভেতরে সারিবদ্ধভাবে গরু রাখা হয়েছে। শেডে বিশেষ ব্যবস্থায় সূর্যের আলো প্রবেশের সুযোগ আছে। গরুর মাথার ওপর কয়েকটি বৈদ্যুতিক পাখা ঘুরছে। শ্রমিকেরা গরুকে খাবার দিচ্ছেন এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করছেন।
ভাড়া ও ব্যবস্থাপনা
আশানুর জানান, প্রতিদিন ব্যবসায়ীরা রংপুরের বিভিন্ন হাট থেকে গরু কিনে রাতে এখানে রাখেন। প্রতি গরুর জন্য ৫০ টাকা ভাড়া নেওয়া হয়। তবে কুরবানির ঈদ ঘিরে গরুর চাপ বেড়েছে, তাই এখন ১০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে।
কোরবানির ঈদের কারণে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দক্ষিণাঞ্চলের ব্যবসায়ীরা রংপুর ও আশপাশের জেলার হাট থেকে প্রতিদিন শত শত গরু কিনছেন। কিছু গরু সঙ্গে সঙ্গে ট্রাকে করে পাঠানো হয়, আর বাকি গরু রাখা হয় এই হোটেলে। এখানে গরুকে খাওয়ানোর জন্য খড় ও ভুসির আলাদা ব্যবস্থা আছে।
পরিচর্যা ও নিরাপত্তা
আশানুর, তাঁর বাবা, ছোট ভাই শাহিন মিয়া ও ভগ্নিপতি আলাল মিয়া মিলে হোটেলটি দেখাশোনা করেন। শাহিন মিয়া বলেন, ব্যবসায়ীরা মূলত নিরাপত্তার বিষয়টি দেখেন। তাঁরা এ বিষয়ে সতর্ক থাকেন। এখন পর্যন্ত কোনো গরু হারিয়ে যাওয়া বা বড় সমস্যা হয়নি।
হোটেলে দেখা যায় কয়েকজন গরু ব্যবসায়ী। চট্টগ্রামের সুরুজ মিয়া জানান, তাঁরা রংপুরের শঠিবাড়ি, লালবাগ, বেদগাড়ি, বুড়িরহাট, পাওটানা ও লালমনিরহাটের বড়বাড়ি হাট থেকে গরু কিনেছেন। আগে গরু কেনার পর পরিবহন নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়তে হতো। অনেক সময় বেশি টানাটানির কারণে গরু ক্লান্ত হয়ে যেত। এখন গরুর আবাসিক হোটেলে রেখে সুবিধাজনক সময়ে পরিবহন করতে পারছেন।
এমদাদ হোসেন নামে চট্টগ্রামের আরেক ব্যবসায়ী বলেন, কোনো ব্যবসায়ীর তাৎক্ষণিক টাকার প্রয়োজন হলে আশানুর ধার দেন। তাঁর সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থানের ব্যবসায়ীদের সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছে।
প্রাণিসম্পদ বিভাগের মতামত
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা বলেন, এটি একটি ভালো উদ্যোগ। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট থেকে ব্যবসায়ীরা এসে বিভিন্ন হাটে গরু কিনে এখানে রাখেন। পরে পরিমাণমতো হলে গাড়িতে করে নিয়ে যান। গরুর আবাসিক হোটেল হওয়ায় ব্যবসায়ীরা খুব উৎফুল্ল। একই সঙ্গে গরুগুলো কম ক্লান্ত হয়।



