বিএনপি সরকারের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ: মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ খরা ও ব্যাংক সংকট
বিএনপি সরকারের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ: মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগ খরা

অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের শাসনের পর নির্বাচিত সরকার হিসেবে বিএনপি কী ধরনের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জসহ দায়িত্ব গ্রহণ করেছে? নিয়াজ আসাদুল্লাহর মতে, অন্তর্বর্তী সরকার ও ফেব্রুয়ারি মাসের নির্বাচন অর্থনীতিকে মসৃণভাবে নিম্ন মূল্যস্ফীতি, নিম্ন সুদ ও উচ্চ প্রবৃদ্ধির পথে নিয়ে যাওয়ার মতো কোনো উপযুক্ত পরিস্থিতি তৈরি করতে পারেনি। বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতি বড়জোর পুনরুদ্ধারের একটি নাজুক পর্যায়ে রয়েছে। স্বজনতোষী পুঁজিবাদী কাঠামো ও চরমভাবে দলীয়করণ হওয়া আমলাতন্ত্রের ভারে অর্থনীতি এখনো জর্জরিত। এগুলো মূলত ২০১০-পরবর্তী স্বৈরতান্ত্রিক আমলের উত্তরাধিকার। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন কিছু অনিশ্চয়তা, বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া অস্বচ্ছ শুল্ক চুক্তির কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে।

ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জ

এমন প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের নীতিনির্ধারকেরা এক বড় ধরনের ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে। তাঁদের ওপর একই সঙ্গে তিনটি বিষয়ে চাপ রয়েছে—মুদ্রানীতি শিথিল করা, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা এবং প্রায় দুই দশক ধরে যাঁরা অর্থনৈতিক সুবিধাবঞ্চিত ছিলেন, তাঁদের জন্য ঋণের সুবিধা বাড়ানো। বলা বাহুল্য, এই লক্ষ্যগুলো একটি অন্যটির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এসবের মধ্যে সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ও বড় চ্যালেঞ্জটি হলো মূল্যস্ফীতি। প্রায় তিন বছর ধরে মূল্যস্ফীতির হার দুই অঙ্কের ঘরের কাছাকাছি আটকে আছে, যার ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর ক্রয়ক্ষমতা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। তাই পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের অস্থিরতার এই সময়ে অভ্যন্তরীণ জ্বালানি চাহিদা সামাল দেওয়া এবং সরবরাহের সীমাবদ্ধতাগুলো সম্পর্কে জনগণকে পরিষ্কার ধারণা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিনিয়োগ খরা ও ব্যাংকিং সংকট

সরকারের সামনে দ্বিতীয় প্রধান চ্যালেঞ্জটিকে একধরনের দেশীয় ‘বিনিয়োগ খরা’ বলা যেতে পারে। বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি সর্বকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে, ব্যাংকিং খাতে তীব্র তারল্যসংকট চলছে এবং পুঁজিবাজারও দুর্বল হয়ে আছে। তাই বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা না গেলে এই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া খুবই ধীরগতির হবে। তৃতীয় চ্যালেঞ্জটি মূলত রাজনৈতিক অর্থনীতির। সেটি হলো, জনগণের অর্থনৈতিক স্বস্তির জোরালো দাবি মেটানোর পাশাপাশি কাঠামোগত সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সক্ষমতা সরকার কীভাবে তৈরি করবে। এ ক্ষেত্রে সরকারকে একদিকে আইএমএফের শর্তভিত্তিক সংস্কার প্রতিশ্রুতি এবং অন্যদিকে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান থেকে তৈরি হওয়া প্রত্যাশার মাঝে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সরকারের এই ত্রিমুখী টানাপোড়েন সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে ব্যাংকিং খাতে। বিশাল খেলাপি ঋণের বোঝায় জর্জরিত ও গভীর সংকটে থাকা একটি ব্যাংকিং ব্যবস্থা বর্তমান সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে ঋণসুবিধার জন্য প্রচণ্ড চাপ বাড়ছে। তাই সরকারের কাছে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো অতীতের মতো রাজনৈতিক প্রভাবে ঋণ বিতরণের সংস্কৃতি ফিরিয়ে না এনে, প্রকৃত উৎপাদনশীল খাতগুলোয় কীভাবে অর্থায়ন বাড়ানো যায়, তা নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক

প্রথম আলোর প্রশ্নের জবাবে নিয়াজ আসাদুল্লাহ বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক সততা কেবল ব্যক্তি পরিবর্তনের বিষয় নয়; এটি আগামী দিনে সুশাসনের রূপরেখা কেমন হবে, তার একটি বিশ্বাসযোগ্য বার্তা। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো তদারকিমূলক সংস্থাগুলো হলো রাষ্ট্রের ‘মেটা প্রতিষ্ঠান’। নতুন সরকার নিজেদের পছন্দমতো নেতৃত্ব বেছে নিতে চাইলেও এসব শীর্ষ পদে আকস্মিক রদবদল পুরোনো ‘দলীয় দখলদারত্বে’ ফেরার ইঙ্গিত দেয়, যা সংস্কার প্রতিশ্রুতির প্রতি জন–আস্থাকে দুর্বল করে। ‘চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের’ আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন করে সাজানোর দাবি প্রবল। এসব গুরুত্বপূর্ণ পদে ‘স্বাধীন সার্চ কমিটি’র মাধ্যমে স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হলে তা অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য হতো। যেহেতু দেশের মানুষ এবং আন্তর্জাতিক মিত্ররা ক্ষমতার এই পালাবদল নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, তাই শুরুতেই প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিয়ে কোনো সংশয় তৈরি হওয়া ঠিক নয়। এতে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের মতো অতি জরুরি কাজগুলো বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

ইরান যুদ্ধ ও জ্বালানি সংকট

ইরান যুদ্ধ নতুন সরকারকে এক অভাবনীয় পরিস্থিতির মুখোমুখি করেছে। জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে। সরকার এরই মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। নিয়াজ আসাদুল্লাহর মতে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত এরই মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সরবরাহের দিক থেকে একটি বড় ধাক্কা তৈরি করেছে। বাংলাদেশ তার জ্বালানির প্রায় ৮০ শতাংশ এবং এলএনজির বড় অংশের জন্যই মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এই সরবরাহব্যবস্থায় যেকোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তা বাংলাদেশের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে গিয়ে নতুন করে ‘কস্ট-পুশ ইনফ্লেশন’ বা ব্যয়জনিত মূল্যস্ফীতির তীব্র শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

আমরা এরই মধ্যে এর প্রাথমিক লক্ষণগুলো দেখতে শুরু করেছি। পণ্যবাহী জাহাজের রুট পরিবর্তনের কারণে তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য রপ্তানি পণ্যের পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে পণ্য চলাচলে যদি বাধা অব্যাহত থাকে, তবে তার প্রভাব হবে আরও মারাত্মক। এর ফলে শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে কৃষি পর্যন্ত—জ্বালানিনির্ভর গোটা উৎপাদনব্যবস্থাই চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম যদি টানা বাড়তে থাকে, তবে দেশের আমদানি ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়ে যাবে, যার ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত ও তীব্র চাপ পড়বে। এমন এক প্রেক্ষাপটে, যখন দেশীয় বিনিয়োগ আগে থেকেই বেশ নাজুক অবস্থায় রয়েছে, বাইরের এই বড় ধাক্কা দীর্ঘায়িত হলে তা দেশের অর্থনীতিতে ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ বা অর্থনৈতিক অচলাবস্থার সৃষ্টি করতে পারে।

মধ্যমেয়াদি ঝুঁকি ও করণীয়

এর পাশাপাশি কিছু মধ্যমেয়াদি ঝুঁকিও রয়েছে। বৈশ্বিক এই অনিশ্চয়তা দীর্ঘস্থায়ী হলে তা বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে এবং এটি বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়াটিকেও জটিল করে তুলবে। সরকার এরই মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে, যা এই সংকটের গভীরতাকেই প্রতিফলিত করে। তবে বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে সামনে আরও মূল্য সমন্বয়ের চাপ তৈরি হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে মূল্যস্ফীতির অর্থনৈতিক চাপ যদি অতিরিক্তভাবে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ওপর এসে পড়ে, তাহলে তা শুধু অর্থনৈতিক সমস্যায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, একটি বড় ধরনের সামাজিক অসন্তোষের ঝুঁকিও তৈরি করবে।

সরকারকে এখন স্বল্পমেয়াদি স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সমন্বয়ের ভিত্তিতে একটি কার্যকর ‘কৌশলগত সুরক্ষা নীতি’ গ্রহণ করতে হবে। দীর্ঘ মেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমাতে সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার ব্যাপকভাবে বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে বহির্বিশ্ব থেকে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি প্রাপ্তি এবং প্রবাসী শ্রমবাজার টিকিয়ে রাখতে একটি বাস্তবসম্মত ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখতে হবে। স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে, বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সামাল দিতে আপৎকালীন মজুত ও একটি ‘স্থিতিশীলকরণ তহবিল’ গঠন করা অপরিহার্য। সংকট তীব্র হলে জ্বালানির সাশ্রয়ী ব্যবহার, পরিকল্পিত লোড ব্যবস্থাপনা এবং অর্থনীতির অতিগুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোয় বিদ্যুৎ সরবরাহে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

প্রবাসী শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্স

ইরান যুদ্ধের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে পড়েছে। প্রায় ৬০ লাখ প্রবাসী মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় কাজ করেন। বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আসে এখান থেকেই। নিয়াজ আসাদুল্লাহর মতে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা ও চলমান সংঘাত বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্স-প্রবাহের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। সেখানে বড় নির্মাণকাজগুলো থমকে গেলে শ্রমিক চাহিদা কমে যাবে। ফলে নতুন কর্মী যাওয়ার সুযোগ সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি কর্মরতদের আয় কমবে এবং অনেককেই দেশে ফিরে আসতে হতে পারে। এই সম্ভাব্য ধাক্কা সামলাতে সরকারকে এখনই কার্যকর ও দূরদর্শী পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, শুধু মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর না থেকে পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপের মতো নতুন বাজারগুলোয় শ্রমবাজার বহুমুখীকরণ দ্রুততর করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কাজ হারিয়ে দেশে ফেরা প্রবাসীদের অবকাঠামো, কৃষি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দ্রুত দেশের অর্থনৈতিক মূলধারায় ফেরানোর আগাম প্রস্তুতি রাখতে হবে।

ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা

ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধ শুধু বিশ্ববাণিজ্য নয়, বিশ্বব্যবস্থাকেই একটা সন্ধিক্ষণে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। নিয়াজ আসাদুল্লাহর মতে, রক্ষণশীল বাণিজ্যনীতির বর্তমান জোয়ার, বিশেষ করে ‘ট্রাম্প ২.০’ বা তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদ, বাংলাদেশের মতো রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এক গভীর অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কিছু সাময়িক চুক্তির মাধ্যমে হয়তো তাৎক্ষণিক ধাক্কা সামলানো যাবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা দূর করতে বাংলাদেশের এখন একটি সুপরিকল্পিত ও বহুমুখী কৌশল প্রয়োজন। প্রথমত, বাজারের বহুমুখীকরণ অপরিহার্য। একক বাজারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বর্তমানের বৃহত্তম গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করতে হবে। পাশাপাশি আঞ্চলিক জোটের মাধ্যমে এশীয় সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত হতে হবে। দ্বিতীয়ত, বর্তমান মেরুকৃত বিশ্বব্যবস্থায় কোনো নির্দিষ্ট ভূরাজনৈতিক ব্লকের দিকে অতিরিক্ত না ঝুঁকে, নিজস্ব জাতীয় স্বার্থরক্ষায় বাংলাদেশকে সমমনা দেশগুলোর সঙ্গে ‘কৌশলগত ভারসাম্য’ বজায় রাখতে হবে। তৃতীয়ত, সংরক্ষণবাদী এই পৃথিবীতে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে অভ্যন্তরীণ সরকারি নীতি ও আইনি সংস্কার ‘গেমচেঞ্জার’ হিসেবে কাজ করবে। ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমানো, লজিস্টিকস ও অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং আর্থিক ও কর খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি শুধু পোশাকশিল্পের ওপর নির্ভর না করে সেবা ও ডিজিটাল খাতকেন্দ্রিক রপ্তানি বহুমুখীকরণে জোর দিতে হবে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা

ইরান যুদ্ধ এবং জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নতুন করে মূল্যস্ফীতি উসকে দিয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো আমরা তিন বছরের বেশি সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে রয়েছি। প্রায় দেউলিয়া হতে বসা শ্রীলঙ্কার দিকে তাকালে দেখা যায়, দেশটিতে মূল্যস্ফীতি দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম। নিয়াজ আসাদুল্লাহর মতে, বাংলাদেশে দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির পেছনে কেবল সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্ন, বাজার তদারকিতে দুর্বলতা বা ডলারসংকটই দায়ী নয়। মূল সমস্যা আরও গভীরে, আর তা হলো নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্তহীনতা, সময়মতো পদক্ষেপ গ্রহণে বিলম্ব ও নীতির ধারাবাহিকতার অভাব। তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে পড়েও শ্রীলঙ্কা কঠোর সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ও আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার মতো কঠিন পদক্ষেপ নিয়ে দ্রুত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে। কিন্তু বাংলাদেশ হেঁটেছে উল্টো পথে। দীর্ঘদিন সুদের হার আটকে রেখে মুদ্রানীতিকে পঙ্গু করা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারের মাত্রাতিরিক্ত ব্যাংকঋণ নেওয়ার প্রবণতা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতাকে প্রায় অকার্যকর করে দিয়েছে। এ ছাড়া দুর্বল বাজার ব্যবস্থাপনা, সুস্থ প্রতিযোগিতার অভাব এবং সরবরাহব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীদের একচেটিয়া আধিপত্যের কারণে সরকারের নেওয়া কোনো নীতির সুফলই সাধারণ ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছায়নি। এর সঙ্গে আমদানি করা জ্বালানির ওপর অতিনির্ভরশীলতা এবং সময়মতো এর মূল্য সমন্বয়ে ধীরগতির কারণে অর্থনীতি আরও নাজুক অবস্থায় পড়েছে।

গণ-অভ্যুত্থান ও তরুণ প্রজন্মের বার্তা

শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপাল—দক্ষিণ এশিয়ার তিন দেশেই গণ-অভ্যুত্থানের ধরনে মিল দেখা গেল। এগুলো হলো কর্তৃত্ববাদী শাসন, কিছু গোষ্ঠীর ব্যাপক দুর্নীতির বিপরীতে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অর্থনৈতিক দুরবস্থা, বেকারত্ব ও কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে আসার কারণেই যুববিদ্রোহ দেখা গেল। তিন দেশেই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক উত্তরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। নিয়াজ আসাদুল্লাহর মতে, দক্ষিণ এশিয়ার শাসকদের জন্য মূল বার্তাটি স্পষ্ট, নাগরিকের মর্যাদা ও অধিকার ছাড়া কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান দেখিয়ে তরুণ প্রজন্মকে আর বোকা বানানো সম্ভব নয়। বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের গণজাগরণ প্রমাণ করে, বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক হতাশার সঙ্গে সুশাসনের অভাব বিপজ্জনক। রাজপথের এই দাবিগুলো শুধু চাকরির জন্য নয়; বরং সাম্য, স্বচ্ছতা ও রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে সাধারণের অধিকার আদায়ের জন্য ছিল। বাংলাদেশের নতুন সরকারের মনে রাখা প্রয়োজন যে তাদের প্রতি বর্তমান জনসমর্থন প্রশ্নাতীত নয়; বরং ‘শর্তসাপেক্ষ’। আজকের ‘জেন-জি’ বা তরুণ প্রজন্ম গতানুগতিক রাজনীতির চেয়ে জবাবদিহিমূলক সুশাসন বেশি প্রত্যাশা করে। রাষ্ট্র সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করে ন্যায্যবিচার ও অধিকার নিশ্চিতে ব্যর্থ হলে এই জনসমর্থন দ্রুত ধসে পড়বে। এই গণ-অভ্যুত্থানগুলো বুঝিয়ে দেয়, সুশাসন ও সুষম বণ্টনহীন অর্থনৈতিক মডেল এখন অকার্যকর। তবে সরকারগুলো যদি নাগরিকদের এই ন্যায্য দাবিগুলোকে আমলে নিয়ে কাজ করে, তবে এই জাগরণই ভবিষ্যতে সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়নের শক্তিশালী ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

তরুণদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে উদ্যোগ

তরুণদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে সরকারের কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন? নিয়াজ আসাদুল্লাহর মতে, শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সমন্বয়ে বাংলাদেশের একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও রাজনীতিমুক্ত ‘মানবসম্পদ কৌশল’ গ্রহণ জরুরি। পুঁথিগত বিদ্যার পাশাপাশি কারিগরি ও আইসিটি দক্ষতা বৃদ্ধি, তরুণদের বাস্তবসম্মত প্রশিক্ষণ এবং নিরাপদ প্রবাসী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। কেবল তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভর না করে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ডিজিটাল খাতে কাজের সুযোগ বাড়ানো এবং সহজ অর্থায়নের মাধ্যমে তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি করা প্রয়োজন। অন্যদিকে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পুরোনো মডেল ছেড়ে উন্নয়নের নতুন ধাপে প্রবেশের এখনই মোক্ষম সময়। বৈশ্বিক সংকটের অজুহাতে সংস্কার বিলম্বিত না করে, ‘সুবিধানির্ভর’ অর্থনীতির বদলে কর্মসংস্থানমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক প্রবৃদ্ধির দিকে যেতে হবে। সুশাসনের অভাব এবং তোষণনীতির মতো বড় অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি মোকাবিলায় শক্তিশালী দেশীয় প্রতিষ্ঠান ও একটি স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক গঠন অপরিহার্য।