বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবসায় কীভাবে এলেন? কাজী জসিমুল ইসলাম জানান, তিনি ২০১০ সাল থেকে ব্যাটারির ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। শুরু থেকেই পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে আগ্রহ ছিল। প্রচলিত লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির বাজার বড় হলেও এটি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। মানুষের খাবারে সিসা পাওয়া যাচ্ছে। সেই চিন্তা থেকেই তিনি লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির দিকে ঝুঁকেন। লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারির স্থায়িত্ব অনেক বেশি এবং এটি পরিবেশবান্ধব। পরে মনে হয়—শুধু ব্যাটারি পরিবর্তন করলেই হবে না, পরিবেশবান্ধব যানবাহনও তৈরি করতে হবে।
বৈদ্যুতিক যান তৈরির উদ্যোগ
কাজী জসিমুল বলেন, ২০১৯ সালে আমরা নিজস্ব প্রযুক্তিতে একটি সৌরবিদ্যুৎ–নির্ভর লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা তৈরি করি। এতে আধুনিক নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত সুবিধা যুক্ত করা হয়েছিল। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল অনুমোদন পাওয়া। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং দীর্ঘসূত্রতার পর ২০২২ সালে আমরা বিআরটিএর অনুমোদন পাই; কিন্তু এর পরও সমাধান হয়নি। এই অটোরিকশা রাস্তায় নামাতে নানা প্রশাসনিক জটিলতায় পড়তে হয়।
প্রশাসনিক জটিলতা
অটোরিকশা সড়কে চলাচলের জন্য বিআরটিএর অনুমোদনের পরও আরটিসি সভায় অনুমোদন লাগে। সেখানে প্রশাসন, পুলিশ ও স্থানীয় পরিবহনসংশ্লিষ্টদের সম্মতি ছাড়া অটোরিকশা নামানো যায় না; কিন্তু বাস্তবে এসব সভায় আমাদের প্রস্তাব অনেক জায়গায় তোলা হয় না। ফলে চার বছরেও আমরা ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ময়মনসিংহের ভালুকা ছাড়া কোথাও অটোরিকশা নামাতে পারিনি। এ কারণে আমাদের নরসিংদীর কারখানা কার্যত বন্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। অন্যদিকে বিআরটিএর অনুমোদন ছাড়াই লাখ লাখ অটোরিকশা, ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশা চলছে।
সরকারের ভূমিকা
বিএনপি সরকার এসে বৈদ্যুতিক যানবাহনকে উৎসাহ দিচ্ছে। এ সরকার আসার পর দ্রুত কাজ হচ্ছে। সর্বশেষ ২১ দিনে মনে হয়েছে, সবকিছু বদলে যাচ্ছে। এই সরকারের নীতিনির্ধারকদের সামনে আমি একটি উপস্থাপনা তুলে ধরেছি। তাঁরাই আমাকে ডেকে নিয়েছিলেন। সরকার বৈদ্যুতিক যানবাহনের বিষয়ে অনেক ইতিবাচক। ইতিমধ্যে বৈদ্যুতিক বাসের শুল্ক কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। স্কুলবাসের শুল্ককর পুরোপুরি তুলে নেওয়া হয়েছে।
উৎপাদন পরিকল্পনা
আমরা বৈদ্যুতিক যানবাহন উৎপাদনে চট্টগ্রামে একটি কারখানা করেছি ২০২২ সালে। বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির সঙ্গে যানবাহন সংযোজনের চুক্তি করেছি ২০২৪ সালে। তবে এত দিন যানবাহন সংযোজন করতে পারিনি উচ্চ শুল্ককরের কারণে। সরকার তা কমিয়ে দিয়েছে। আমরা শুধু ছোট গাড়ি নয়, বাস, ট্রাক, এসইউভি, এমনকি কৃষিকাজের জন্য ইলেকট্রিক ট্রাক্টর নিয়েও কাজ করছি। আমাদের ডিজাইনে ইলেকট্রিক ট্রাক্টর তৈরি করা হচ্ছে, যা বাংলাদেশের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। আমরা চীনের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছি। এর মধ্যে স্কাই ওয়েল অন্যতম। এটি আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত বড় একটি বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্র্যান্ড। তাদের কাছ থেকে আমরা এসইউভি, বাস ও অন্যান্য যানবাহনের প্রযুক্তি আনছি। আমরা সৌউদিয়া বাসের সঙ্গেও কাজ করছি। তাদের বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করা হবে।
বিএমটিএফের কারখানা
বিএমটিএফের কারখানা ব্যবহার করে আমাদের প্রকৌশলীরা কাজ করবেন। অন্যরা যেখানে ২০০-৫০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ফ্যাক্টরি করছে, সেখানে আমাদের সেই ওভারহেড নেই। তাই আমরা তুলনামূলক কম দামে যানবাহন দিতে পারব। আমরা শুরুতে এসকেডি অবস্থায় যানবাহন এনে বাংলাদেশে সংযোজন করব। আশা করছি, আগামী জুলাই থেকে উৎপাদনে যেতে পারব। প্রাথমিকভাবে প্রতি মাসে প্রায় ৪০টি বাস, ৫০টি ছোট গাড়ি এবং ৪০টি ট্রাক সংযোজন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বৈদ্যুতিক গাড়ির ভবিষ্যৎ
বিশ্ব এখন দ্রুত বৈদ্যুতিক যানবাহনের দিকে যাচ্ছে। বাংলাদেশেও সেই পরিবর্তন আসবে। যারা এখনো শুধু প্রচলিত জ্বালানিচালিত গাড়ির ব্যবসায় আটকে আছেন, তাঁরা সময়মতো প্রযুক্তি পরিবর্তন না করলে বাজারে টিকে থাকা কঠিন হবে। কারণ, ইভি শুধু পরিবেশবান্ধব নয়, দীর্ঘ মেয়াদে এটি অর্থনৈতিকভাবেও লাভজনক। জ্বালানি খরচ কম, রক্ষণাবেক্ষণ কম এবং প্রযুক্তিগতভাবে এটি ভবিষ্যতের পরিবহনব্যবস্থা। বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা যদি এখন থেকেই প্রস্তুতি না নেন, তাহলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বেন।
বৈদ্যুতিক বাসের সুবিধা
ঢাকা-চট্টগ্রাম পথে একটি ডিজেলচালিত বাসে ৪২ জন যাত্রী পরিবহনে জ্বালানি খরচ হয় ১৭ থেকে ১৮ হাজার টাকার। বৈদ্যুতিক বাসে বিদ্যুৎ খরচ হবে প্রায় ৩ হাজার ৬০০ টাকার। ডিজেল বাসে ইঞ্জিন অয়েল, ব্রেক অয়েলসহ রক্ষণাবেক্ষণে মাসে ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা লাগে; কিন্তু বৈদ্যুতিক বাসে তা লাগবে না। যাত্রীরা এখনকার মতো ভাড়ায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসে যাতায়াত করতে পারবেন।
দাম ও অর্থায়ন
একটি বৈদ্যুতিক বাসের দাম প্রায় আড়াই কোটি টাকা। ডিজেল বাসের তুলনায় দাম প্রায় দ্বিগুণ। তবে ব্যাংকের অর্থায়নে বড় পার্থক্য আছে। ডিজেলচালিত বাস কিনতে সুদহার প্রায় ১৬ শতাংশ। বৈদ্যুতিক বাস কিনতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিবেশবান্ধব খাতের জন্য পুনঃঅর্থায়ন তহবিল থেকে ৫ শতাংশ সুদে ঋণ পাওয়া যাবে।
চার্জিং স্টেশন
চার্জিং স্টেশন হচ্ছে; আরও হবে। সরকার ইতিমধ্যে চার্জিং স্টেশনের যন্ত্রপাতির শুল্ক শূন্য করেছে, যা এ খাতে বড় সহায়ক হবে। আমরাও ফ্রাঞ্চাইজভিত্তিতে ৮০০ বড় চার্জিং স্টেশন করার পরিকল্পনা করছি। দেশের মহাসড়কের পাশে এগুলো হবে। সেখানে রেস্তোরাঁ, প্রার্থনার জায়গা, শৌচাগার ইত্যাদি সুবিধা থাকবে। মানুষ চা পান করতে করতে ৩০ মিনিটে বাস চার্জ হয়ে যাবে। চার্জিং স্টেশনগুলোর ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা থাকবে। ফলে সরকারের কাছ থেকে বিদ্যুৎও কম নিতে হবে।
ব্যাটারির স্থায়িত্ব
একটি বাস একবার চার্জ দিলে প্রায় ৩৬০ কিলোমিটার চলবে। সুপারফার্স্ট চার্জে ব্যাটারি টিকবে আট বছর। সাধারণভাবে চার্জে টিকবে ১২ বছর।
ভবিষ্যৎ বাজার
বাংলাদেশকে ২০৩০ সালের মধ্যে জীবাশ্ম জ্বালানি–নির্ভরতা ৬০ শতাংশ কমাতে হবে। বিশ্বও সেই পথে যাচ্ছে। যাঁরা এখনো ডিজেল বা পুরোনো প্রযুক্তিতে আছেন, তাঁরা ২০৩০ সালের মধ্যে পরিবর্তন না আনলে টিকে থাকতে পারবেন না। স্মার্টফোন ও ডিজিটাল ক্যামেরা যেমন কোডাককে বিলুপ্ত করেছে, তেমনি বৈদ্যুতিক যানবাহন জ্বালানি তেলচালিত যানবাহনকে বিলুপ্তির দিকে নিয়ে যাবে।



