জাপানের গাড়িনির্মাতা প্রতিষ্ঠান হোন্ডা প্রতিষ্ঠার ৭০ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বার্ষিক লোকসানের মুখ দেখেছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) খাতে বড় বিনিয়োগ করেও প্রত্যাশিত বিক্রি না পাওয়ায় ২০২৬ সালের মার্চে শেষ হওয়া অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালন লোকসান দাঁড়িয়েছে ৪২৩ বিলিয়ন ইয়েন বা প্রায় ২ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার।
ইভি চাহিদা হ্রাস ও উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা বাতিল
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ইভির চাহিদা তাদের পূর্বাভাসের তুলনায় অনেক কম ছিল। ফলে তারা কিছু ইভি উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা বাতিল করছে এবং উৎপাদন ব্যয় কমাতে চীন থেকে কম দামের যন্ত্রাংশ সংগ্রহের পরিকল্পনা নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত পরিবর্তনের প্রভাব
হোন্ডার ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত পরিবর্তনও তাদের ক্ষতির অন্যতম কারণ। এর মধ্যে রয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে ইভি কেনায় ভোক্তাদের কর-প্রণোদনা প্রত্যাহার এবং আমদানি করা গাড়ি ও যন্ত্রাংশের ওপর শুল্ক আরোপ।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন ইভি কিনলে ক্রেতারা সর্বোচ্চ ৭ হাজার ৫০০ ডলার পর্যন্ত কর-সুবিধা পেতেন। তবে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন সেই সুবিধা বাতিল করে। একই বছরে আমদানি করা গাড়ি ও যন্ত্রাংশের ওপর শুল্কও বাড়ানো হয়। যদিও পরে তা ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। তবে এতেও বড় গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফায় চাপ পড়েছে।
হোন্ডার বর্তমান অবস্থান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
১৯৫৭ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া হোন্ডা এখন জাপানের দ্বিতীয় বৃহত্তম গাড়ি নির্মাতা। বিশ্লেষকেরা বলছেন, দীর্ঘদিনের পুরোনো ও বিশাল কাঠামোর প্রতিষ্ঠান হওয়ায় বাজারে ইভির চাহিদার দ্রুত ওঠানামার সঙ্গে খাপ খাওয়ানো তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
এখন প্রতিষ্ঠানটি মোটরসাইকেল ব্যবসা, আর্থিক সেবা ও হাইব্রিড গাড়ি উৎপাদনে বেশি গুরুত্ব দিতে চায়। উত্তর আমেরিকা, জাপান ও ভারতকে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্য অগ্রাধিকার বাজার হিসেবে দেখছে প্রতিষ্ঠানটি। একইসঙ্গে কানাডায় ইভি ও ব্যাটারি কারখানা নির্মাণের পরিকল্পনাও স্থগিত করেছে।
লক্ষ্যমাত্রা বাতিল ও নতুন দিকনির্দেশনা
হোন্ডার প্রধান নির্বাহী তোশিহিরো মিবে বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে নতুন গাড়ি বিক্রির পাঁচ ভাগের এক ভাগ ইভি হবে, এমন লক্ষ্যমাত্রা তারা বাতিল করেছে। পাশাপাশি ২০৪০ সালের মধ্যে সব গাড়িকে ইভিতে রূপান্তরের লক্ষ্য থেকেও সরে এসেছে প্রতিষ্ঠানটি।
আগামী অর্থবছরেও ইভি খাতে ৫১২ বিলিয়ন ইয়েন লোকসানের আশঙ্কা করছে হোন্ডা। বিনিয়োগ বিশ্লেষণা প্রতিষ্ঠান এজে বেলের আর্থিক বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান ড্যানি হিউসন বলেন, ‘হোন্ডার জন্য এটি একটি হতাশাজনক মাইলফলক, তবে খুব একটা অপ্রত্যাশিত নয়। অনেক পুরোনো গাড়ি নির্মাতার মতো তারাও দ্রুত ইভিতে রূপান্তরের ওপর বড় বাজি ধরেছিল, কিন্তু বিশ্ববাজারের বাস্তবতা ভিন্ন দিকে গেছে।’
তিনি বলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তন, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং চীনা কোম্পানিগুলোর প্রতিযোগিতা; সব মিলিয়ে হোন্ডাকে ইভি পরিকল্পনায় পিছিয়ে আসতে হয়েছে এবং বড় ব্যয় মেনে নিতে হয়েছে।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বাড়ায় সাম্প্রতিক সময়ে ইভির চাহিদা কিছুটা বেড়েছে। তবে হোন্ডার মতো বড় প্রতিষ্ঠানের জন্য দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো এখনও কঠিন।



