রাজধানীতে ময়লা-বাণিজ্যে এখন নতুন নিয়ন্ত্রক। ক্ষমতার পালাবদলের পর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বাসাবাড়ির ময়লা সংগ্রহের কাজটি এখন বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের হাতে চলে গেছে। এতে করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন আগের ব্যবসায়ীরা।
সাহাবুদ্দিন আলীর গল্প
সাহাবুদ্দিন আলী একসময় পুরান ঢাকায় পুরোনো লোহালক্কড়ের ব্যবসা করতেন। দেড় বছর আগে তিনি সেই ব্যবসা ছেড়ে বাসাবাড়ির ময়লা সংগ্রহের কাজে যোগ দেন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডে (কাপ্তানবাজার ও নবাবপুরের একাংশসহ আশপাশের এলাকা) কাজ পাওয়ার জন্য ১২ লাখ টাকা জামানত দেন। কিন্তু মাত্র দুই মাস পরেই স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীরা তাকে মারধরের হুমকি দিয়ে কাজটি কেড়ে নেয়। এখন তিনি বেকার সময় কাটাচ্ছেন।
সাহাবুদ্দিন আলী বলেন, ‘আমাকে মারধর করার হুমকি দিছে। একরকম জোরজবরদস্তি করে বিএনপির লোকজন কাজটি নিয়ে গেছে। ছয় বছর লোহালক্কড়ের ব্যবসা করে ১২ লাখ টাকা জমিয়েছিলাম। এখন লাভ তো দূরের কথা, পুরো চালানটাই গেছে। লোকাল বিএনপির প্রভাবশালী নেতাদের কাছে গিয়ে বিচার দিয়েছি, কোনো লাভ হয়নি।’
একই অবস্থা আরেক ব্যবসায়ীর
একইভাবে ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৫৮ নম্বর ওয়ার্ডে (শ্যামপুর এলাকা) ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে বর্জ্য সংগ্রহের কাজ পেয়েছিলেন এক নারী ব্যবসায়ী। তবে যুব মহিলা লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীরা তাকেও কাজ করতে দেননি।
ময়লা-বাণিজ্যে নতুন নিয়ন্ত্রক
ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ৭৫টি ওয়ার্ডে বাসাবাড়ির ময়লা সংগ্রহের কাজটি বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করা হয়। আগে এই কাজের নিয়ন্ত্রণ ছিল স্থানীয় কাউন্সিলর এবং আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের হাতে। এখন নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। যেমন ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে কাজ পেয়েছেন যুবদল কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মোহাম্মদ নাহিদুল ইসলাম, ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডে ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আবদুর রহমান, ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডে ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মাহফুজুর রহমান, ৪০ নম্বর ওয়ার্ডে ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মাহবুবুর রহমান, ৪৩ নম্বর ওয়ার্ডে ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি কাজী আবদুল কাইয়ুম, ৬১ নম্বর ওয়ার্ডে ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুস সালাম (হিরা), এবং ৬৫ নম্বর ওয়ার্ডে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ফয়সাল হেদায়েত।
ঢাকা দক্ষিণ সিটির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বেশির ভাগ ওয়ার্ডে বর্জ্য সংগ্রহের দায়িত্ব বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা পেয়েছেন। কোথাও ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতির নামে, কোথাও অন্য কোনো সহযোগী সংগঠনের নেতার নামে নেওয়া হয়েছে। কিছু ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের প্রতিষ্ঠানও কাজ পেয়েছে, তবে সেসব প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ এখন বিএনপির নেতা-কর্মীদের হাতে।
ইচ্ছেমতো টাকা আদায়
সিটি করপোরেশনের শর্ত অনুযায়ী, একটি বাসা (ফ্ল্যাট) থেকে সর্বোচ্চ ১০০ টাকা নেওয়া যাবে। কিন্তু বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান এই শর্ত মানে না। ধানমন্ডির ৮/এ এলাকায় প্রতিটি ফ্ল্যাট থেকে মাসে ২০০ টাকা নেওয়া হয়। আজিমপুর এলাকায় একটি শরবতের দোকান থেকে মাসে এক হাজার টাকা নেওয়া হয়। পূর্ব জুরাইনের কমিশনার রোড এলাকায় প্রতিটি ফ্ল্যাট থেকে ২০০ টাকা, কাঁঠালবাগান ঢালের বিভিন্ন গলিতে ২৫০ টাকা, হাতিরপুল বাজারের পাশের ভবনগুলিতে ২০০ টাকা, মুগদা-মান্ডা এলাকায় ১২০ টাকা, রাজারবাগের শহীদবাগ এলাকায় ২০০ টাকা, খিলগাঁওয়ের তালতলা এলাকায় ২০০ টাকা এবং পুরান ঢাকার কায়েতটুলী এলাকায় ২০০ টাকা নেওয়া হয়।
প্রভাব খাটিয়ে দখল
ঢাকা দক্ষিণ সিটির বাসাবো ও মাদারটেক এলাকায় (৪ নম্বর ওয়ার্ড) শহিদুল্লাহ কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং নামে একটি প্রতিষ্ঠান কাজ পেয়েছিল। তাদের দুই কর্মী জানান, প্রতি মাসে আড়াই লাখ টাকা চাঁদা দিয়ে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাস কাজ করতে পেরেছিলেন। গত ৫ এপ্রিল ওয়ার্ড বিএনপির কয়েকজন নেতা জোর করে কাজের নিয়ন্ত্রণ নেন। এ বিষয়ে ৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক (মাদারটেক শাখা) ইকবাল হোসেন বলেন, ‘যারা এই ওয়ার্ডে ময়লা সংগ্রহের কাজ পেয়েছে তাদের কাছ থেকে টাকা দিয়ে আমরা কিনে নিয়েছি। অতীতেও এ রকম কাজ রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা মিলেমিশে করতেন। এখন আমরাও সেভাবে করছি।’
ময়লা-বাণিজ্যে লাভের পরিমাণ
আওয়ামী লীগের শাসনামলে ১০ বছর দক্ষিণ সিটির একটি ওয়ার্ডে কাজ করেছেন, এমন একজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রতিটি বাসা থেকে ১০০ টাকা নিলেও ওয়ার্ড ভেদে সব খরচ বাদ দিয়ে মাসে গড়ে তিন লাখ টাকা লাভ থাকে; কিন্তু বেশির ভাগ জায়গায় নেওয়া হয় ১৫০-২০০ টাকা। সেই হিসাবে প্রতিটি ওয়ার্ডে মাসে গড়ে সাড়ে তিন লাখ টাকা লাভ হয়। দক্ষিণ সিটির ৭৫টি ওয়ার্ডে মাসে ময়লা-বাণিজ্য থেকে লাভ হয় তিন কোটি টাকা, বছরে ৩৬ কোটি টাকা।
সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা দক্ষিণে হোল্ডিং (ভবন/ফ্ল্যাট) আছে ২ লাখ ৯৩ হাজার ৮৮১টি। প্রতিটি হোল্ডিং থেকে গড়ে ১৫০ টাকা নেওয়া হলে মাসে আয় কমপক্ষে ৪ কোটি ৪০ লাখ ৮২ হাজার টাকা। ফ্ল্যাট সংখ্যা ১৭ লাখ ৬৩ হাজার ২৮৬টি বিবেচনায় নিলে মাসে আয় কমপক্ষে ২৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা, বছরে যা কমপক্ষে ৩১৭ কোটি টাকা।
প্রতিকারের আশ্বাস
ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, কঠোরভাবে এ বিষয়টির তদারকি করা হবে। প্রতিটি ওয়ার্ডে যারা ময়লা সংগ্রহের কাজ পেয়েছে, তাদের ডেকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে—কোনোভাবেই ১০০ টাকার বেশি নেওয়া যাবে না। এর পরও যদি কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া যায়, তাহলে তাদের লাইসেন্স বাতিল করা হবে।
নগর-পরিকল্পনাবিদদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, সিটি করপোরেশনকে নগরবাসী প্রতিবছর যে গৃহকর দেয়, তার বিপরীতে পরিচ্ছন্নতাসহ মৌলিক নাগরিক সেবা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। করপোরেশন ১০০ টাকা ফি নির্ধারণ করলেও বাস্তবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক এলাকায় ইচ্ছেমতো টাকা আদায় করছে। এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণযোগ্য নয়। এই বিশৃঙ্খলা দূর করার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের।



