চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই–মে) মাত্র ৪৮ শতাংশ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছে। জুলাই–মে সময়ের এই বাস্তবায়ন হার গত ১৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন বলে জানিয়েছে বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, জুলাই–মে সময়ে উন্নয়ন প্রকল্পে খরচ হয়েছে ১ লাখ ৭৬৯ কোটি টাকা।
টাকার অঙ্ক ও বাস্তবায়ন হার—উভয় দিকেই নিম্নমুখী
চলতি অর্থবছরে এডিপির আকার ২ লাখ ৮ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা। আইএমইডির ওয়েবসাইটে ২০১০–১১ অর্থবছর পর্যন্ত প্রতি অর্থবছরের জুলাই–মে সময়ের হিসাব দেওয়া আছে। পুরোনো তথ্য ঘেঁটে দেখা গেছে, গত ১৬ বছরের মধ্যে এবারই সবচেয়ে কম বাস্তবায়ন হার। এই সময়ে প্রতিবছর গড়ে ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়ন হলেও এবার তা ৫০ শতাংশের কম।
কারা সবচেয়ে খারাপ করল
এডিপির মাধ্যমে প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ তাদের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে থাকে। গত ১১ মাসের প্রকল্প বাস্তবায়নের চিত্র বেশ হতাশাজনক। সংসদবিষয়ক সচিবালয়ের একটি প্রকল্পে ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও গত ১১ মাসে এক টাকাও খরচ করা সম্ভব হয়নি। তাদের প্রকল্প বাস্তবায়ন হার শূন্য।
চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে নিজেদের প্রকল্পের অনুকূলে বরাদ্দের ২৫ শতাংশও খরচ করতে পারেনি ৬টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। সংসদবিষয়ক সচিবালয় ছাড়া তালিকায় থাকা অন্য বিভাগ ও মন্ত্রণালয় হলো—স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ; জননিরাপত্তা বিভাগ; পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়; বাণিজ্য মন্ত্রণালয়; অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ।
কেন বাস্তবায়ন কম
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে সক্ষমতার অভাব রয়েছে। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যাচাইবাছাই করে প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং টাকা খরচে কিছুটা কৃচ্ছ্রসাধনের কারণে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে প্রভাব পড়েছে। বিভিন্ন কারণে এডিপি বাস্তবায়ন হচ্ছে না:
- প্রকল্প বাস্তবায়নকারীদের সক্ষমতার অভাব এবং কর্মপরিকল্পনা অনুসারে যথাসময়ে কাজ শেষ করতে না পারা।
- ঠিকাদারদের ঢিলেঢালাভাবে কাজ শেষ করার চিন্তাভাবনা; যেমন, এক মাসের কাজ খরচ বাঁচাতে কম লোকবল নিয়ে তিন মাসে শেষ করা।
- প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের দীর্ঘসূত্রতা; মামলা মোকদ্দমার কারণে দীর্ঘ সময় ধরে প্রকল্পের কাজ শুরু করা যায় না।
- চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে, ফলে সরকারের টাকার জোগানে টান পড়েছে। সরকার বেতনভাতা, দেশি–বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধসহ অবধারিত খরচ আগে মেটায়, পরে উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ দেয়।
- প্রকল্প নেওয়ার সময় সম্ভাব্যতা যাচাই ঠিকমতো না হওয়ায় পরে নকশা পরিবর্তন, ব্যয় বৃদ্ধি ও সময়ক্ষেপণ হয়।
- অনুমোদন, দরপত্র, ক্রয়—সব পর্যায়ে প্রশাসনিক জটিলতা ও ধীর সিদ্ধান্তের কারণে দীর্ঘসূত্রতা থাকে।
- ক্রয়প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও জটিলতা, পুনরায় দরপত্র বা আপত্তির কারণে কাজ শুরুতেই দেরি হয়।
- তদারকি ও জবাবদিহির দুর্বলতায় প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ না হলে সমস্যা জমতে থাকে।
- সরকার বা নীতির পরিবর্তনে প্রকল্পের অগ্রাধিকার বদলে যেতে পারে, যেমন এবার রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে নতুন সরকার এসে পুরোনো কিছু প্রকল্প যাচাইবাছাই করতে কমিটি গঠন করেছে।
- দুর্নীতি ও অপচয়ের কারণে কাজের মান খারাপ হওয়া, অপ্রয়োজনীয় ব্যয়—এসব কারণে প্রকল্প বারবার সংশোধন করতে হয়, সময় বাড়ে।



