২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৬ মাসে জাহাজভাঙা শিল্পে মোট ২৮টি দুর্ঘটনায় তিন জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন। ওই সময়ে ২৫ জন আহত হন, যার মধ্যে ১০ জন গুরুতর এবং ১৫ জন মাঝারি আহত হন। দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ২১টি দিনে এবং ৭টি রাতে সংঘটিত হয়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দুর্ঘটনার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস)।
প্রতিবেদন উপস্থাপন ও আলোচনা
সোমবার (২৯ জুন) সকাল ১০টায় চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডস্থ ইপসা এইচআরডি সেন্টারে বিলস আয়োজিত এক সভায় এ প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সংস্থাটির চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সমন্বয়ক ফজলুল কবির মিন্টু। তিনি বলেন, চলতি বছর সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে এপ্রিল মাসে, যার সংখ্যা ৮টি। দুর্ঘটনার প্রায় ৮০ শতাংশ ঘটেছে গার্ডার বা ভারী বস্তু পড়ে যাওয়া, ক্রেন-হুক-ওয়্যারজনিত দুর্ঘটনা এবং গ্যাস ও অগ্নিকাণ্ড-সংক্রান্ত কারণে।
সভায় সভাপতিত্ব করেন জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের আহ্বায়ক তপন দত্ত। সঞ্চালনায় ছিলেন ফজলুল কবির মিন্টু। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সীতাকুণ্ড উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দুল্লাহ আল মামুন। বিশেষ অতিথি ও আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিলস এলআরএসসি সেন্টার কো-অর্ডিনেশন কমিটির চেয়ারম্যান এ. এম. নাজিম উদ্দিন, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আলতাপ হোসেন, উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা তজাম্মল হোসেন, সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা লুতফুন্নেসা বেগম, সাংবাদিক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের সদস্য দিদারুল আলম চৌধুরী, ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের সদস্য মো. আলী, মো. ইদ্রিস, মানিক মণ্ডল, জামাল উদ্দিনসহ শ্রমিক প্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
প্রধান অতিথির বক্তব্য
প্রধান অতিথি আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, জাহাজভাঙা শিল্প বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শিল্পায়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। তবে এই শিল্পের টেকসই বিকাশ নিশ্চিত করতে শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। তিনি বলেন, বিলস-এর এই অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদন মালিক, শ্রমিক ও সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করবে এবং শিল্পে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সহায়ক হবে।
ঝুঁকিপূর্ণ কাজ ও কারণ চিহ্নিত
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কাটারম্যান, কাটার হেলপার, ক্রেন হেলপার, ওয়্যার গ্রুপ, ফিটারম্যান ও লোডিং গ্রুপের শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে কাজ করেন। দুর্ঘটনার পেছনে অনিরাপদ আচরণ, অনিরাপদ কর্মপরিবেশ, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামের অভাব, তদারকির ঘাটতি এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাবকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এছাড়া শ্রমিকদের জন্য নিয়মিত নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ, ঝুঁকি রিপোর্টিং ব্যবস্থা চালু, নিরাপদ কর্মপদ্ধতি অনুসরণ এবং মালিক ও সরকারের প্রতি নিরাপত্তা খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কার্যকর তদারকি, আইন প্রয়োগ ও প্রতিটি দুর্ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।
দুর্ঘটনা প্রতিরোধযোগ্য
সভার বক্তারা বলেন, প্রতিটি কর্মক্ষেত্রের দুর্ঘটনাই প্রতিরোধযোগ্য। নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা শুধু শ্রমিকের অধিকার নয়, বরং শিল্পের টেকসই উন্নয়ন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির অন্যতম পূর্বশর্ত।



