জাহিদ হোসেন ইসলামী ব্যাংক এক দিনে সংকটে পড়েনি। সাম্প্রতিক ঘটনাবলি হয়তো সংকটকে দৃশ্যমান করেছে; কিন্তু এর শিকড় বহু বছরের। তাই বর্তমান পরিস্থিতি বোঝার জন্য আমাদের তাৎক্ষণিক ঘটনাপ্রবাহের বাইরে গিয়ে দেখতে হবে ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থান, শাসনব্যবস্থা এবং আমানতকারীদের আস্থার বিবর্তনকে।
আর্থিক দুর্বলতার শিকড়
গত কয়েক বছরে ইসলামী ব্যাংক ঘিরে যে অভিযোগগুলো সামনে এসেছে—অস্বাভাবিক মাত্রায় ঋণ কেন্দ্রীভূত হওয়া, সম্পদের প্রকৃত মান নিয়ে প্রশ্ন, ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ এবং বিপুল প্রভিশন ঘাটতি; সেগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা ছিল না। এগুলো ইঙ্গিত করছিল যে ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। পরবর্তীকালে বিভিন্ন নিরীক্ষা ও তদারক কার্যক্রমে সেই দুর্বলতার আরও স্পষ্ট চিত্র সামনে আসে।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ব্যাংকটির মালিকানা ও পরিচালনার কাঠামোতে পরিবর্তন আসে। বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন বোর্ড নিয়োগ করে এবং ব্যাংকটির ওপর নিবিড় তদারকি শুরু হয়। একই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য–সহায়তা এবং নতুন ব্যবস্থাপনার অধীনে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরে আসে। আমানতকারীদের মধ্যে আস্থাও আংশিকভাবে পুনরুদ্ধার হয়। শাখাগুলোতে স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম আবার চালু হতে শুরু করে এবং দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছিল।
তবে এই স্থিতিশীলতাকে পূর্ণাঙ্গ পুনরুদ্ধার বলে ধরে নেওয়া ভুল হতো। কারণ, তারল্যসংকট সাময়িকভাবে মোকাবিলা করা গেলেও মূল সমস্যাগুলো তখনো রয়ে গিয়েছিল। একটি দুর্বল ব্যালান্স শিট, বিপুল অপ্রদর্শিত ক্ষতি এবং আস্থার ভঙ্গুর ভিত্তি ব্যাংকটিকে ঝুঁকির মধ্যে রেখেছিল।
নতুন করে আলোচনার জন্ম
এরই পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে কয়েকটি ঘটনা নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। আর্থিক খাতের নীতিগত দিকনির্দেশনা, নিয়ন্ত্রক কাঠামোর পরিবর্তন, শীর্ষ পর্যায়ে পদত্যাগ এবং নতুন নিয়োগ—এসব নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ও বিতর্ক দেখা দেয়। এসব সিদ্ধান্তের পক্ষে এবং বিপক্ষে যুক্তি থাকতেই পারে; কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এগুলো ব্যাংকের ভেতরে ও বাইরে কী ধরনের বার্তা পাঠিয়েছে।
ব্যাংকিং খাতে বাস্তবতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সম্পর্কে মানুষের ধারণা। কোনো ব্যাংকের আমানতকারীরা সাধারণত নিরীক্ষা প্রতিবেদন পড়ে সিদ্ধান্ত নেন না। তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন আস্থা, প্রত্যাশা ও নিরাপত্তাবোধের ভিত্তিতে। ফলে কোনো ব্যাংক সম্পর্কে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তার প্রভাব দ্রুত তারল্যের ওপর পড়তে পারে।
ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রেও সম্ভবত সেটিই ঘটেছে। নির্বাচন-পরবর্তী কিছু পদক্ষেপ ব্যাংকের ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা ও স্বাধীনতা নিয়ে আমানতকারীদের একাংশের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। সেই উদ্বেগের সঙ্গে যুক্ত হয় গুজব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা তথ্য এবং ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার খবর। ফলাফল ছিল—বিশাল অঙ্কের আমানত উত্তোলন এবং তারল্যের ওপর নতুন চাপ।
একক কারণ নয়
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। বর্তমান সংকটের জন্য কোনো একক ঘটনা বা কোনো একক সিদ্ধান্তকে দায়ী করা কঠিন। একটি শক্তিশালী ও সুস্থ ব্যাংক সাধারণত বিতর্কিত নিয়োগ বা রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা সামাল দিতে পারে। ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে সমস্যা হলো ব্যাংকটি এমন ধাক্কা সামলানোর মতো অবস্থায় ছিল না। দীর্ঘদিনের আর্থিক দুর্বলতা তাকে একটি আস্থার সংকটের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল করে তুলেছিল।
এ কারণেই বর্তমান পরিস্থিতিকে কেবল রাজনৈতিক বা আর্থিক সংকট হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি মূলত একটি আর্থিকভাবে দুর্বল প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থার সংকটের অভিঘাত; আর এই দুই উপাদান—আর্থিক দুর্বলতা ও আস্থার অবক্ষয় পরস্পরকে শক্তিশালী করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপ
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক হস্তক্ষেপ সেই বাস্তবতারই স্বীকৃতি। বোর্ড বিলুপ্ত করে প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত মূলত একটি বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে যে নিয়ন্ত্রক সংস্থা পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে এবং আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় সক্রিয় রয়েছে। স্বল্প মেয়াদে এটি পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে সাহায্য করতে পারে; কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে এটি কোনো সমাধান নয়।
কারণ, এখানেই সামনে আসে আরও কঠিন প্রশ্ন—এই পুনর্গঠনের কাজটি করবে কে?
প্রশাসক তারল্যসংকট মোকাবিলা করতে পারেন, দৈনন্দিন কার্যক্রম সচল রাখতে পারেন এবং পরিস্থিতির আরও অবনতি থেকে রক্ষা করতে পারেন; কিন্তু কোনো প্রশাসক দীর্ঘমেয়াদি অর্থে একটি ব্যাংক পুনর্গঠন করতে পারেন না। একটি ব্যাংকের পুনরুদ্ধারের জন্য দরকার মূলধন পুনর্গঠনের পরিকল্পনা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সংস্কার, ঋণশৃঙ্খলার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং বিশ্বাসযোগ্য শাসনব্যবস্থা। এগুলো এমন কাজ, যার জন্য একটি সক্ষম ও স্বাধীন পরিচালনা পর্ষদের প্রয়োজন। প্রশাসক আগুন নেভাতে পারেন; কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠান পুনর্নির্মাণের জন্য প্রয়োজন স্থপতি।
বিশ্বাসযোগ্য বোর্ড গঠনের চ্যালেঞ্জ
সমস্যা হলো—যে পরিবেশে এমন একটি বোর্ড সবচেয়ে বেশি দরকার, সেই পরিবেশই যোগ্য ও সুনামসম্পন্ন ব্যক্তিদের অংশগ্রহণকে সবচেয়ে বেশি নিরুৎসাহিত করে। বহু বছর ধরে বিতর্ক, রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও নানা ধরনের স্বার্থ সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা একটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নিতে স্বাভাবিকভাবেই অনেকে অনাগ্রহী থাকবেন। কারণ, সেখানে শুধু একটি দুর্বল ব্যালান্স শিটের দায় নয়, একটি জটিল উত্তরাধিকারও বহন করতে হয়। বোর্ডে যোগ দেওয়া মানে শুধু আর্থিক পুনর্গঠনের দায়িত্ব নেওয়া নয়; অনেক ক্ষেত্রে তা হয়ে ওঠে একটি গভীরভাবে বিভক্ত ও অবিশ্বাসপূর্ণ পরিবেশে কাজ করার চ্যালেঞ্জ।
ফলে একটি দুষ্টচক্র তৈরি হয়। ব্যাংকটিকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও পেশাদার ভিত্তিতে পরিচালনা করার জন্য দরকার বিশ্বাসযোগ্য শাসনব্যবস্থা; কিন্তু সেই বিশ্বাসযোগ্য শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে আবার এমন একটি পরিবেশ প্রয়োজন, যেখানে পেশাদার সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা হবে না। পুনর্গঠনের প্রযুক্তিগত পথ মোটামুটি পরিষ্কার; কঠিন হলো সেই রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে সেই পথ অনুসরণ করা সম্ভব।
প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার পরীক্ষা
এ কারণেই ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান সংকট শেষ পর্যন্ত শুধু একটি ব্যাংকের সংকট নয়, এটি রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতারও পরীক্ষা। নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ কি যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্যতা সৃষ্টি করতে পারবে? রাজনৈতিক নেতৃত্ব কি পুনর্গঠনের প্রক্রিয়াকে প্রয়োজনীয় সময় ও স্বাধীনতা দেবে; এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—আমানতকারীরা কি বিশ্বাস করতে পারবেন যে ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ পেশাদার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে, প্রতিদ্বন্দ্বী স্বার্থগোষ্ঠীর প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নয়?
ইসলামী ব্যাংক শুধু একটি ব্যাংক নয়; এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ আমানত গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে লাখ লাখ গ্রাহক, অসংখ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং পুরো ইসলামী ব্যাংকিং খাতের প্রতি জনসাধারণের আস্থা। ফলে এর সংকট দীর্ঘায়িত হলে প্রভাব একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না–ও থাকতে পারে। আস্থার সংকটের প্রকৃতি হলো এটি এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়তে পারে; বিশেষত যখন জনগণের মনে প্রশ্ন জাগে যে সমস্যাটি কি একটি ব্যাংকের, নাকি শাসনব্যবস্থার।
শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ
এখানেই বর্তমান সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিহিত। একটি ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠান বহু বছর আর্থিক দুর্বলতা নিয়ে টিকে থাকতে পারে, যদি মানুষ বিশ্বাস করে যে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা হচ্ছে; কিন্তু যখন সেই বিশ্বাস নড়বড়ে হয়ে যায়, তখন সংকট শুধু ব্যালান্স শিটে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা আস্থার সংকটে রূপ নেয়।
সুতরাং আজকের প্রশ্ন কেবল ইসলামী ব্যাংককে কীভাবে বাঁচানো যায়, তা নয়। প্রশ্ন হলো বাংলাদেশ কি এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ তৈরি করতে পারবে, যেখানে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বিষয় না হয়ে পেশাদার সক্ষমতা ও জবাবদিহির বিষয় হবে?
কারণ, ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত শুধু তার ব্যালান্স শিট দ্বারা নির্ধারিত হবে না, তা নির্ধারিত হবে এই প্রশ্নের উত্তরে—রাষ্ট্র কি নিজেকে যথেষ্ট সংযত রাখতে পারবে, যাতে প্রতিষ্ঠানগুলো সুস্থ হওয়ার সুযোগ পায়? যদি না পারে, তাহলে পরবর্তী সংকটও হয়তো কোনো হিসাবপত্র থেকে আসবে না। সেটিও আসবে আস্থার অবক্ষয় থেকে, একটি সংকেতের মাধ্যমে।



