ব্যাংকে টাকা জমা রাখা কি নিরাপদ? ইসলামী ব্যাংক ঘিরে আস্থার সংকট
ব্যাংকে টাকা জমা রাখা কি নিরাপদ? ইসলামী ব্যাংক ঘিরে আস্থার সংকট

ব্যাংকে জমা রাখা টাকা কি নিরাপদ? কোনো ব্যাংক নিয়ে বিতর্ক বা গুজব ছড়ালে আমানতকারীদের কী করা উচিত? সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাংকগুলোর একটি, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশকে ঘিরে নানা আলোচনা, বিতর্ক ও অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় এসব প্রশ্ন আবারও সামনে এসেছে। বিশেষ করে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ এবং চেয়ারম্যানকে ঘিরে বিতর্ক, বিভিন্ন মহলের আন্দোলন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা তথ্য এবং আমানতকারীদের একাংশের মধ্যে উদ্বেগের কারণে ব্যাংকিং খাতে নতুন করে আস্থার সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অনেক আমানতকারী তাদের সঞ্চয় তুলে নেওয়ার চেষ্টা করছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে। যদিও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে বলে দাবি করছে, তবুও সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ কাটছে না।

আস্থার সংকট কেন সবচেয়ে বড় ঝুঁকি

ব্যাংক ব্যবসার মূল ভিত্তি হলো আস্থা। একটি ব্যাংকের ভবন, প্রযুক্তি বা সম্পদের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো গ্রাহকের বিশ্বাস। মানুষ বিশ্বাস করে বলেই তাদের কষ্টার্জিত অর্থ ব্যাংকে জমা রাখে। কিন্তু যখন কোনো ব্যাংকের পরিচালনা, মালিকানা, চেয়ারম্যান বা ঋণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন প্রথম আঘাত আসে সেই আস্থার ওপর। মানুষ ভাবতে শুরু করে—‘আমার টাকা কি নিরাপদ?’ এই প্রশ্নই একটি ব্যাংকের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।

বিশ্বব্যাপী ব্যাংকিং ইতিহাস বলছে, অনেক ব্যাংক আর্থিক কারণে নয়, বরং আমানতকারীদের আতঙ্কজনিত অর্থ উত্তোলনের চাপেই সংকটে পড়েছে। অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হয় 'ব্যাংক রান'। যখন বিপুলসংখ্যক গ্রাহক একই সময়ে টাকা তুলতে শুরু করেন, তখন আর্থিকভাবে শক্তিশালী ব্যাংকও তারল্য সংকটে পড়তে পারে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইসলামী ব্যাংক কেন গুরুত্বপূর্ণ

বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী ব্যাংক শুধু একটি ব্যাংক নয়; এটি দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। ব্যাংকটির গ্রাহকসংখ্যা সবচেয়ে বেশি। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত এর শাখা ও এজেন্ট ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক বিস্তৃত। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, প্রবাসী আয় গ্রহণকারী পরিবার, কৃষক, উদ্যোক্তা এবং মধ্যবিত্ত সঞ্চয়কারীদের বড় একটি অংশ এই ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল।

অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের বৃহত্তম আমানতভিত্তিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে কোনও একটি ব্যাংকে বড় ধরনের আস্থার সংকট দেখা দিলে তার প্রভাব অন্যান্য ব্যাংকেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। কারণ সাধারণ আমানতকারী ব্যাংকভেদে ঝুঁকি বিশ্লেষণ করেন না; তারা পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপরই আস্থা হারাতে শুরু করেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তার ভাষায়, 'ইসলামী ব্যাংকের মতো একটি বড় প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা দেশের আর্থিক খাতের জন্য সুখকর নয়। এর প্রভাব অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে পৌঁছাতে পারে।'

বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে চেয়ারম্যান

সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকটির বর্তমান চেয়ারম্যানকে ঘিরে বিভিন্ন মহলে আপত্তি ও সমালোচনা দেখা দিয়েছে। তার বিরুদ্ধে অতীতে বিতর্কিত ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ঋণ খেলাপি সম্পর্কিত অভিযোগও আলোচনায় এসেছে।

এ নিয়ে বিভিন্ন সংগঠন ও গ্রাহকদের একটি অংশ চেয়ারম্যানের অপসারণ দাবি করে আন্দোলন করছে। তাদের যুক্তি, বিতর্কিত ব্যক্তিকে নেতৃত্বে রাখলে ব্যাংকের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং গ্রাহকদের আস্থা আরও কমছে।

অন্যদিকে, সমালোচকরা বলছেন, যদি কোনও ব্যক্তিকে ঘিরে এত বড় আস্থার সংকট তৈরি হয়, তাহলে বিষয়টি দ্রুত পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। কারণ ব্যাংকিং খাতে নেতৃত্বের প্রশ্ন শুধু করপোরেট প্রশাসনের বিষয় নয়; এটি জনস্বার্থের সঙ্গেও জড়িত।

কী করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক

ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনও ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সংকট যখন জনআস্থার সংকটে পরিণত হয়, তখন নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া। প্রয়োজনে তদন্ত, তদারকি বৃদ্ধি, পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন কিংবা প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে বাজারে ইতিবাচক বার্তা দেওয়া দরকার।

কিন্তু সমালোচকদের অভিযোগ, বর্তমান পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবস্থান যথেষ্ট দৃশ্যমান নয়। ফলে গুজব ও অনিশ্চয়তা আরও বাড়ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, সংকটের সময় নীরবতা কখনও কখনও সংকটকেই গভীর করে তোলে। বাজারকে আশ্বস্ত করার জন্য সুস্পষ্ট বার্তা এবং কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

আপনার সঞ্চয় কি ঝুঁকিতে

এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। একদিকে, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আমানতকারীদের অর্থ সুরক্ষার জন্য বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা রয়েছে। অন্যদিকে, কোনো ব্যাংক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নেতিবাচক আলোচনা চলতে থাকলে মানুষের উদ্বেগ বেড়ে যাওয়াও স্বাভাবিক।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু গুজবের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং ব্যাংক কর্তৃপক্ষেরও দায়িত্ব রয়েছে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ করে গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা। তারা বলছেন, একটি ব্যাংকের প্রকৃত ঝুঁকি নির্ধারণ করতে হলে তার মূলধন সক্ষমতা, তারল্য পরিস্থিতি, খেলাপি ঋণের মাত্রা, পরিচালনা কাঠামো এবং নিয়ন্ত্রক মূল্যায়ন বিবেচনায় নিতে হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনার ভিত্তিতে নয়। তবে এটাও সত্য যে ব্যাংকিং খাতে আস্থা একবার ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা পুনরুদ্ধার করা কঠিন।

অর্থনীতির জন্য সতর্কবার্তা

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত ইতোমধ্যে উচ্চ খেলাপি ঋণ, সুশাসনের ঘাটতি এবং দুর্বল করপোরেট গভর্ন্যান্সের মতো নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এর মধ্যে দেশের সবচেয়ে বড় ব্যাংকগুলোর একটি নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দ্রুত আস্থা পুনরুদ্ধার। যদি কোনো ব্যক্তি বা সিদ্ধান্ত ব্যাংকের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে থাকে, তাহলে তা নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। কারণ একটি ব্যাংকের সংকট শেষ পর্যন্ত শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়; এটি লাখো আমানতকারী, হাজারো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং পুরো অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত।

প্রশ্ন পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ঘিরে

ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় সম্পদ টাকা নয়, আস্থা। সেই আস্থা যখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তখন ক্ষতির পরিমাণ আর্থিক হিসাবের বাইরে চলে যায়। আজকের প্রশ্ন তাই শুধু ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে নয়; প্রশ্ন পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ঘিরে—মানুষ কি এখনও তাদের সঞ্চয় ব্যাংকে নিরাপদ মনে করছে?

এই প্রশ্নের জবাব যত দ্রুত এবং বিশ্বাসযোগ্যভাবে দেওয়া যাবে, বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ততই মঙ্গল। অন্যথায় একটি ব্যাংককে ঘিরে শুরু হওয়া আস্থার সংকট ধীরে ধীরে পুরো আর্থিক ব্যবস্থার জন্য বড় ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।