বাংলাদেশে ব্যাংকগুলোর সামাজিক দায়বদ্ধতা ব্যয় অর্ধেকে নেমেছে, মুনাফা সংকটের প্রভাব
ব্যাংকগুলোর সিএসআর ব্যয় অর্ধেকে নেমেছে, মুনাফা সংকটে প্রভাব

বাংলাদেশে ব্যাংকগুলোর সামাজিক দায়বদ্ধতা ব্যয় অর্ধেকে নেমেছে

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ব্যাংকগুলোর করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) খাতে ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। গত কয়েক বছরে এই ব্যয় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে, যা মূলত ব্যাংকগুলোর মুনাফা সংকট ও লোকসানের কারণে ঘটেছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রভাব ব্যাংক খাতের আর্থিক অবস্থার ওপর পড়ায়, সিএসআর ব্যয় কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।

সিএসআর ব্যয় হ্রাসের কারণ ও প্রবণতা

ব্যাংকগুলো সাধারণত তাদের মুনাফার হিসাব থেকে সিএসআর ব্যয় করে থাকে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য মতে, যেসব ব্যাংক আগে সিএসআর খাতে এগিয়ে ছিল, তার অনেকগুলোই এখন লোকসানে পড়েছে। আবার কিছু ব্যাংক মুনাফা কমে যাওয়ায় এই ব্যয় হ্রাস করেছে। বিদ্যমান নিয়ম অনুসারে, কোনো ব্যাংক নিট লোকসানে থাকলে সিএসআর খাতে ব্যয় করতে পারে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মে, একটি ব্যাংক ১০০ টাকা সিএসআর ব্যয় করলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ৩০ শতাংশ করে মোট ৬০ শতাংশ, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন খাতে ২০ শতাংশ এবং অন্যান্য খাতে বাকি ২০ শতাংশ খরচ করার সুযোগ রয়েছে।

সিএসআর ব্যয়ের সময়ক্রমিক তথ্য

২০১৫ সালে দেশের ব্যাংকগুলোর সিএসআর খাতে ব্যয় ছিল ৫২৭ কোটি টাকা, যা ২০১৬ সালে কমে ৪৯৭ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। তবে ২০১৭ সালে এটি ৭৪৪ কোটিতে উন্নীত হয় এবং ২০১৮ সালে ৯০৫ কোটি টাকায় পৌঁছায়। ২০১৯ সালে ব্যয় কমে ৬৪৮ কোটি টাকা হয়, ২০২০ সালে ৯৬৮ কোটি টাকা এবং ২০২১ সালে ৭৫৯ কোটি টাকা রেকর্ড করা হয়। ২০২২ সালে ব্যাংকগুলো সিএসআর ব্যয় করে ১ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা, কিন্তু ২০২৩ সালে তা ৯২৪ কোটিতে নেমে আসে। ২০২৪ সালে এই ব্যয় আরও কমে ৬১৫ কোটি ৯৬ লাখ টাকা হয় এবং ২০২৫ সালে তা ৩৪৫ কোটি টাকায় দাঁড়ায়, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় প্রায় অর্ধেক।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শীর্ষ ব্যাংকগুলোর সিএসআর ব্যয়

২০২৪ সালে সর্বোচ্চ সিএসআর ব্যয় করেছিল এক্সিম ব্যাংক, যার পরিমাণ ৪৯ কোটি টাকা। এরপর প্রিমিয়ার ব্যাংক প্রায় ৪৭ কোটি টাকা, মার্কেন্টাইল ও ইসলামী ব্যাংক ৪২ কোটি টাকা করে এবং যমুনা ব্যাংক ৩৬ কোটি টাকা খরচ করে। তবে ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এক্সিম, প্রিমিয়ার ও ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন আসে, যা তাদের শীর্ষ সিএসআর ব্যয়ের তালিকা থেকে ছিটকে পড়ার কারণ হয়।

২০২৫ সালে সিএসআর ব্যয়ে প্রথমবারের মতো একটি বিদেশি ব্যাংক শীর্ষে উঠে আসে। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক গত বছরে ৩৩ কোটি টাকা খরচ করে। এরপর এক্সিম ব্যাংক ২৭ কোটি টাকা ব্যয় করে, যদিও ব্যাংকটি লোকসানে পড়ায় সুদ বা মুনাফার অযোগ্য অংশ থেকে এই খরচ করা হয়েছে। যমুনা ব্যাংক ও ব্র্যাক ব্যাংক ২৫ কোটি টাকা করে খরচ করে এই খাতে।

বিভিন্ন খাতে সিএসআর ব্যয়ের বণ্টন

২০২৪ সালে ব্যাংকগুলো সিএসআর খাতে ৬১৫ কোটি টাকা খরচের মধ্যে শিক্ষা খাতে ১০৮ কোটি টাকা, স্বাস্থ্য খাতে ১৫৫ কোটি টাকা এবং পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিযোজন খাতে ২২ কোটি টাকা ব্যয় করে। অন্যান্য খাতে খরচ করা হয় ৩৩০ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে শিক্ষা খাতে ব্যয় কমে ৯৮ কোটি টাকা, স্বাস্থ্য খাতে ৮৬ কোটি টাকা এবং পরিবেশ খাতে ৩৪ কোটি টাকা হয়, যেখানে অন্যান্য খাতে খরচ করা হয় ১২৬ কোটি টাকা।

বিশ্লেষণ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) ও ঢাকা ব্যাংকের চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার মন্তব্য করেন, ‘২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর ব্যাংক খাতে স্বচ্ছতা ফিরে আসে, যা মুনাফা কমিয়ে দেয় এবং সিএসআর ব্যয় হ্রাসের কারণ হয়। নতুন রাজনৈতিক সরকার গঠিত হয়েছে এবং আমরা এমন খাতে সিএসআর করে যাচ্ছি যাতে বেশি মানুষ উপকৃত হয়। আশা করা যায়, সামনে এই ব্যয় আবার বাড়বে এবং ব্যাংকগুলো স্বচ্ছতার সঙ্গে এই টাকা খরচ করবে।’