বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর: রাজনৈতিক চাপে পাচারকৃত অর্থ উদ্ধার প্রক্রিয়া বন্ধ হবে না
রাজনৈতিক চাপে পাচারকৃত অর্থ উদ্ধার বন্ধ হবে না: ব্যাংক গভর্নর

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর: রাজনৈতিক চাপে পাচারকৃত অর্থ উদ্ধার প্রক্রিয়া বন্ধ হবে না

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, রাজনৈতিক চাপের মুখে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের প্রক্রিয়া কখনোই বন্ধ হবে না। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক সেটা মোকাবিলা করবে। পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার। জনগণের টাকা চুরি হয়েছে। এর দায় সবার আছে। পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে এমডিদের সক্রিয়ভাবে কাজ করতে হবে।’ গভর্নর মোস্তাকুর রহমান মঙ্গলবার ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে এক বৈঠকে এই বক্তব্য দেন।

ব্যাংক ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা

পাচার হওয়া অর্থ ফেরতের অগ্রগতি ও করণীয় বিষয়ে আয়োজিত এই বৈঠকে ৩৭টি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) অংশ নেন। বৈঠকে গভর্নরের উপদেষ্টা ফরহান চৌধুরী ও বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) শীর্ষ কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। সভায় জানানো হয়, বর্তমানে ৩৭টি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১৪ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় সাড়ে ৪ লাখ কোটি টাকা। এসব খেলাপি ঋণের একটি বড় অংশ পাচার হয়ে গেছে।

সভায় আরও উল্লেখ করা হয় যে, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে ব্যাংকগুলোকে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অপ্রকাশযোগ্য চুক্তি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ইতিমধ্যে ৬০ শতাংশ ব্যাংক নির্ধারিত সময়ে এই চুক্তি সম্পন্ন করেছে। বাকি ব্যাংকগুলোকে দ্রুত চুক্তি সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এরপর টাকা ফেরত আনতে বাণিজ্যিক চুক্তি করতে হবে। টাকা ফেরত আনতে পারলে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো তার ভিত্তিতে মাশুল পাবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নির্বাচনের কারণে উদ্যোগের গতি কমার অভিযোগ

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, অনেক ব্যাংক নির্বাচনের কারণে এই উদ্যোগের গতি কমিয়ে এনেছিল। নতুন সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হলো পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনা। তাই এই উদ্যোগে কোনোরকম শৈথিল্য দেখা গেলে এমডিদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। অর্থ পাচারের পেছনে সবার দায় আছে বলে সভায় জোর দেওয়া হয়।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে। পাচারের অর্থ ফেরত আনার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নানা উদ্যোগ নেয়। সেই উদ্যোগ চলমান থাকবে বলে সভায় জানানো হয়।

ব্যাংকারদের মতামত ও সংশয়

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন বলেন, ‘বিদেশে পাচার হওয়া টাকা দেশে ফেরত আনার প্রচেষ্টা অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। আজকে বুঝলাম, কাজ এগিয়েছে কিছুটা। বিশেষ করে ইউসিবিএল ব্যাংক এগিয়েছে। কিন্তু দেশে একই প্রতিষ্ঠানকে নীতিসহায়তা দিয়ে আনুষ্ঠানিক ভালো ঋণগ্রহীতা হিসেবে টিকিয়ে রাখলে ও বিদেশের আদালতে তারই সম্পদ জব্দ করার জন্য মামলা লড়লে এই বিষয়টাকে উন্নত দেশের বিচারিক কর্তৃপক্ষ কীভাবে দেখবে, তা নিয়ে আমার সংশয় আছে।’

মাসরুর আরেফিন আরও বলেন, ‘একটা ব্যাংক কতটুকু তথ্য বিদেশি আইনজীবীকে দিচ্ছে, কী দেওয়া উচিত আর কী উচিত নয়, কতটুকু দিলে সেই ব্যাংকের কর্তৃপক্ষই আইনি প্যাঁচে জড়িয়ে যেতে পারে, এসব বুঝে স্বচ্ছ নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। আমি সভায় বিষয়টা জানিয়েছি।’

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তদন্ত ও প্রমাণ

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবার ও ১০ শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি, প্রতারণা, জালিয়াতি, মুদ্রা পাচার, কর ও শুল্ক ফাঁকি এবং অর্থ পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধানে ১১টি তদন্ত দল গঠন করে। পরে আরও অনেক প্রতিষ্ঠানের অর্থ পাচারের প্রমাণ মিলেছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের বক্তব্য পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারের প্রক্রিয়ায় একটি দৃঢ় অবস্থান নির্দেশ করে।