কিমিয়া সাদাত: কমিউনিটি ব্যাংকের নতুন এমডি, যিনি দেশের কনিষ্ঠতম ব্যাংক প্রধান হতে চলেছেন
কিমিয়া সাদাত: কমিউনিটি ব্যাংকের কনিষ্ঠতম এমডি

কিমিয়া সাদাত: কমিউনিটি ব্যাংকের নতুন এমডি, যিনি দেশের কনিষ্ঠতম ব্যাংক প্রধান হতে চলেছেন

ব্যাংকিং খাতে আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা, সুশাসন নিশ্চিতকরণ এবং আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে উদ্ভাবনী সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত এই শীর্ষ পদে নিয়োগের জন্য দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং বয়সের পরিপক্বতাকে প্রধান মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যদিও বিশ্বজুড়ে ৩০ বছরের কম বয়সী তরুণরাও এই পদে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, গত বছর ২৯ বছর বয়সে গোল্ডম্যান স্যাকসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হয়েছেন পাওলো কস্তা। বাংলাদেশেও এখন এমন এক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যেখানে কিমিয়া সাদাত কমিউনিটি ব্যাংকের এমডি হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম ও কিমিয়া সাদাতের যোগ্যতা

বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হতে কমপক্ষে ৪৫ বছর বয়স এবং ২০ বছরের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। এর মধ্যে তিন বছর ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) ও অতিরিক্ত এমডি হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা থাকতে হয়। কিমিয়া সাদাত এই শর্ত পূরণ করে কমিউনিটি ব্যাংকের এমডি হিসেবে দায়িত্ব নিতে চলেছেন। আগামী ১৪ মে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে এই পদে যোগদান করবেন, তখন তাঁর বয়স হবে ৪৫ বছরের কিছু বেশি। এর আগের দিন তিনি ডিএমডি ও অতিরিক্ত এমডি পদে তিন বছর দায়িত্ব পালন সম্পন্ন করবেন। এই নিয়োগের মাধ্যমে তিনি দেশের ব্যাংকিং খাতে কনিষ্ঠতম এমডি পদে দায়িত্ব পালন শুরু করবেন। ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে তিনি অতিরিক্ত এমডির পাশাপাশি এমডি পদের চলতি দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অভিজ্ঞতা ও ক্যারিয়ার: ব্যাংকিং জগতে এক উজ্জ্বল নাম

কমিউনিটি ব্যাংকে যোগদানের আগে কিমিয়া সাদাত মেঘনা ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দেশীয় ও বহুজাতিক ব্যাংকিং খাতে তাঁর মোট ২৩ বছরের সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা রয়েছে। এই বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে তিনি এইচএসবিসি বাংলাদেশ, দ্য সিটি ব্যাংক এবং ইস্টার্ন ব্যাংকের মতো প্রথম সারির প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিন্যান্স বিষয়ে বিবিএ ও এমবিএ সম্পন্ন করে তিনি ব্যাংকিং পেশায় প্রবেশ করেন এবং সার্টিফায়েড ফিন্যান্সিয়াল কনসালট্যান্ট (সিএফসি) সনদ অর্জন করেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নেতৃত্বে আর্থিক সাফল্য ও ডিজিটাল রূপান্তর

২০২৫ সালের এপ্রিলে কমিউনিটি ব্যাংকের নেতৃত্বে আসার পর থেকেই কিমিয়া সাদাতের দক্ষ পরিচালনায় ব্যাংকটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তাঁর মেয়াদে (এপ্রিল ২০২৫–ডিসেম্বর ২০২৫) ব্যাংকটির নিট মুনাফা ৪৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা ২০২৪ সালের ৭০ কোটি টাকা থেকে উল্লেখযোগ্য উন্নতি। একই সময়ে আমানত ৩২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৮ হাজার ৩৮ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, এবং ঋণ ৫ হাজার ৬১১ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। খেলাপি ঋণের হার ২০২৪ সালের ৩.০৮ শতাংশ থেকে কমে ১.৬০ শতাংশে নেমে এসেছে, যা তাঁর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দক্ষতা প্রতিফলিত করে। সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ডে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হয়েছে।

ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রেও ব্যাংকটি সাফল্য দেখিয়েছে। কিমিয়া সাদাতের অধীনেই বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো বাংলাকিউআরের মাধ্যমে ট্রাফিক জরিমানা আদায়ের ক্যাশলেস পদ্ধতি চালু হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকটির লেনদেনের প্রায় ৬৪ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে, এবং নতুন হিসাবের ৩০ শতাংশ ডিজিটাল মাধ্যমে খোলা হচ্ছে। এছাড়া, এসএমই ৩০, স্টার্টআপ নেস্ট, প্রবাস সঞ্চয় প্ল্যাটফর্ম, অফশোর ব্যাংকিং, ইসলামী ব্যাংকিং উইং এবং ডিজিটাল ন্যানো-লোন বা ক্ষুদ্রঋণের ব্যবস্থা চালু করে ব্যাংকটি ব্যাপক সেবা সম্প্রসারণ করেছে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: স্থিতিশীল ও প্রযুক্তিচালিত ব্যাংক গড়ার স্বপ্ন

কিমিয়া সাদাত কমিউনিটি ব্যাংককে বাংলাদেশের অন্যতম স্থিতিশীল, প্রযুক্তিচালিত ও সুশাসিত ব্যাংক হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে চলেছেন। তাঁর কর্মপরিকল্পনা চারটি প্রধান স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে তৈরি: সুশাসন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ, টেকসই ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি, পরিচালনা দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আর্থিক স্থিতিপত্র ও তারল্য ব্যবস্থাপনা। বর্তমানে ব্যাংকটির ১৯টি শাখা, ৫টি উপশাখা এবং ১৮৭টি এটিএম বুথ রয়েছে, যার মধ্যে ১১১টি বুথে গ্রাহকসহায়তা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে।

আগামী তিন বছরে ব্যাংকটি ১০টি নতুন শাখা, ১৫টি উপশাখা এবং ৫০টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট খোলার পরিকল্পনা করছে। ২০২৭ সালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ সিকিউরিটি অপারেশন সেন্টার স্থাপন এবং ২০২৬ সালের মধ্যে একটি ডিজাস্টার রিকভারি (ডিআর) সাইট তৈরির লক্ষ্য রয়েছে। এছাড়া, ২০২৮ সালের মধ্যে আমানত ১১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং ঋণ ৮ হাজার ৮০০ কোটি টাকায় উন্নীত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ইসলামী ব্যাংকিং সেবা, অফশোর ব্যাংকিং এবং ব্যাংকাসুরেন্স সেবা পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।

কিমিয়া সাদাতের মূল লক্ষ্য হলো, আগামী তিন বছরের মধ্যে কমিউনিটি ব্যাংককে নতুন প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর মধ্যে অন্যতম লাভজনক অবস্থানে নিয়ে যাওয়া এবং খেলাপি ঋণের হার সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখা। তিনি বলেন, ‘আমরা কমিউনিটি ব্যাংকের মাধ্যমে ভোক্তা ঋণকে গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দিতে চাই। সারা দেশে আমাদের এটিএম বুথ ও সেবাকেন্দ্র আছে। এর মাধ্যমে আমরা ভোক্তা ঋণ বৃদ্ধি করব। পুলিশের দুই লাখ সদস্য আছেন। তাঁরা আমাদের প্রধান গ্রাহক। পাশাপাশি সাধারণ জনগণও আমাদের অগ্রাধিকারে থাকবে। এসব ঋণ আদায় হবে বেতন থেকে। তাই এসব ঋণ নিরাপদ।’

ইতিহাসে কনিষ্ঠতম ব্যাংক এমডিদের সাফল্য

বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে কম বয়সে এমডি পদে দায়িত্ব পালনকারী বেশ কয়েকজন সফল ব্যক্তিত্ব রয়েছেন। ২০২৩ সালের আগে ব্যাংক এমডি হতে ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা এবং কমপক্ষে ৪০ বছর বয়সের শর্ত ছিল, তবুও অনেকে এই বাধা অতিক্রম করে সফল হয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ, ২০০১ সালে কে মাহমুদ সাত্তার ইস্টার্ন ব্যাংকের এমডি হন ৪১ বছর ৮ মাস বয়সে, এবং পরে সিটি ব্যাংক থেকে অবসর নেন। ২০০৬ সালে প্রয়াত ইমরান রহমান ব্র্যাক ব্যাংকের এমডি হন ৪৪ বছর বয়সে। ২০০৭ সালে আলী রেজা ইফতেখার ইস্টার্ন ব্যাংকের এমডির দায়িত্ব নেন ৪৬ বছর বয়সে, এবং সম্প্রতি তিনি অবসরে গেছেন। ২০১৩ সালে সোহেল আর কে হোসেইন সিটি ব্যাংকের এমডি হন ৪৫ বছর বয়সে, এবং বর্তমানে তিনি ব্যাংক এশিয়ার এমডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০১৬ সালে আরফান আলী ব্যাংক এশিয়ার এমডি হন ৪৭ বছর বয়সে, এবং ২০১৭ সালে রাহেল আহমেদ প্রাইম ব্যাংকের এমডি হন ৪৫ বছর বয়সে। ২০১৯ সালে মাসরুর আরেফিন সিটি ব্যাংকের এমডির দায়িত্ব নেন ৪৮ বছর বয়সে। এই সকল উদাহরণ প্রমাণ করে যে বয়সের চেয়ে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাই ব্যাংকিং খাতে সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।