আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে আইএলএফএসএলের এমডি মোহাম্মদ এমদাদুল ইসলামকে অপসারণ
বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক অনিয়ম, নিয়ন্ত্রক নির্দেশনা লঙ্ঘন এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করার অভিযোগে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডের (আইএলএফএসএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ এমদাদুল ইসলামকে অপসারণ করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগ (ডিএফআইএম) মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) জারি করা এক নির্দেশনায় এই সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে।
অভিযোগের বিস্তারিত বিবরণ
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে, এমদাদুল ইসলামের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি গুরুতর অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে:
- বোর্ড সভার কার্যবিবরণীতে জালিয়াতি করা।
- মানবসম্পদ নীতিমালা এবং ডিএফআইএম সার্কুলার লঙ্ঘন করে একাধিক কর্মকর্তাকে বেআইনিভাবে বরখাস্ত করা।
- পূর্বে জিএসপি ফাইন্যান্স কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেডের এমডি ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন অনিয়মে জড়িত থাকার তথ্য ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন করা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে আরও দেখা গেছে, আইএলএফএসএলের আওতায় কেয়া কসমেটিকস লিমিটেডকে প্রায় ৪৯ দশমিক ৯০ কোটি টাকার একটি ঋণ যথাযথ অনুমোদন ছাড়াই প্রদান করা হয়েছে। এই ঋণটিকে অশ্রেণিকৃত হিসেবে দেখিয়ে প্রতিষ্ঠানটি খেলাপি ঋণের হার কৃত্রিমভাবে কমিয়ে উপস্থাপন করেছে, যা আর্থিক প্রতিবেদনে ভুল তথ্য প্রদানের শামিল।
অতিরিক্ত অনিয়মের প্রমাণ
পর্যবেক্ষণে আরও দুটি উল্লেখযোগ্য অনিয়ম চিহ্নিত হয়েছে। প্রথমত, আইএলএফএসএলের একটি সহায়ক প্রতিষ্ঠানের ঋণ পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় অনিয়ম করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, ডরিন হোটেলস অ্যান্ড রিসোর্টস লিমিটেডকে প্রদত্ত ঋণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত দণ্ডসুদ আরোপের ঘটনা ঘটেছে। এসব কর্মকাণ্ড আর্থিক প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে বাংলাদেশ ব্যাংক উল্লেখ করে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এই সমস্ত অনিয়মের বিষয়ে এমদাদুল ইসলামের কাছ থেকে ব্যাখ্যা চাওয়া হলে তার প্রদত্ত জবাব সন্তোষজনক হয়নি। ফলস্বরূপ, ফাইন্যান্স কোম্পানি আইন, ২০২৩-এর ১৯ ধারার ক্ষমতাবলে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছে।
পরবর্তী নির্দেশনা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
এমদাদুল ইসলামের অপসারণের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক আইএলএফএসএলকে কয়েকটি নির্দেশনা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিকে ডিএফআইএম সার্কুলার অনুযায়ী একজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে ভারপ্রাপ্ত এমডি হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে। একই সঙ্গে দ্রুততার সঙ্গে একজন যোগ্য ও উপযুক্ত ব্যক্তিকে স্থায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।
উল্লেখ্য, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড একসময় আলোচিত ব্যবসায়ী প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদারের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তার সময়ে প্রতিষ্ঠানটি থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ অনিয়মের মাধ্যমে বের করে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। সেই সময়ের আর্থিক কেলেঙ্কারির প্রভাব এখনও বহন করছেন প্রতিষ্ঠানটির আমানতকারী ও সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডাররা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্ত আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি জোরদার করার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করতে পারে, যাতে তারা নিয়ন্ত্রক নির্দেশনা মেনে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে।



