এক কাপ চা আর দুটি বিস্কুট—এভাবেই সাভারের হেমায়েতপুরের বাসিন্দা রাসেলের দিন শুরু হয়। জন্মগতভাবে দুই পায়ে শারীরিক প্রতিবন্ধী তিনি; এই সামান্য নাস্তাও এখন তার জন্য বিলাসিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি মাসিক ভাতা ৯০০ টাকা থেকে তার হাতে প্রতিদিন টিকে থাকার জন্য থাকে মাত্র ৩০ টাকা।
"৩০ টাকায় এখন একটি ডিম আর একটি কলাও কেনা যায় না," বলে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি রাসেল। "ওষুধ কেনা তো দূরের কথা, তিন বেলা ভাত খেয়ে বেঁচে থাকাই দায় হয়ে গেছে। আমরা কি এই দেশের নাগরিক নই? সরকার কি আমাদের বেঁচে থাকার খরচ বোঝে না?"
একই সংগ্রাম, ভিন্ন প্রতিবন্ধকতা
প্রতিবন্ধীর ধরন অনুযায়ী জীবনযাত্রার খরচ ভিন্ন হলেও ভাতার অপ্রতুলতা সবার জন্যই একই বাস্তবতা।
শারীরিক প্রতিবন্ধী আবদুল জলিল বলেন, "আমার চলাচলের জন্য হুইলচেয়ার দরকার, আর তার নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ লাগে। অ্যাক্সেসযোগ্য পরিবহনের অভাবে অনেক সময় ভাড়া বাড়িয়ে দিতে হয়। মাসে ৯০০ টাকায় ক'দিন চলে? ভাতা অন্তত ২,০০০ টাকা না হলে আমাদের অনেককেই ঘরবন্দি হয়ে থাকতে হবে।"
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সুমি আক্তার দৈনন্দিন জীবনের অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জের কথা জানান। "আমাদের শিক্ষা ও চলাচলের জন্য সহায়ক প্রযুক্তি বা সহায়তার প্রয়োজন হয়। বাজারে অর্ধেক ভাতা শুধু ডাল আর সয়াবিন তেল কিনতেই চলে যায়। মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের মৌলিক অধিকার কি আমাদের নেই?"
সেরিব্রাল পলসিতে (সিপি) আক্রান্ত ১০ বছর বয়সী সন্তানের মা মরিয়ম বেগম বলেন, বর্তমান বরাদ্দ থেরাপি ও যত্নের খরচের তুলনায় নগণ্য। "সিপি আক্রান্ত শিশুদের বিশেষ খাবার ও নিয়মিত ফিজিওথেরাপি প্রয়োজন। আমরা প্রতি মাসে অন্তত ৭,০০০ থেকে ৮,০০০ টাকা খরচ করি। সরকারের ৯০০ টাকা ভাতা তিন দিনের থেরাপির খরচও জোগায় না। এটি সমর্থনের চেয়ে উপহাসের মতো মনে হয়।"
মুদ্রাস্ফীতি বাড়ে, ভাতা অপরিবর্তিত
প্রতিবন্ধী অধিকারকর্মীরা বলছেন, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে, কিন্তু আর্থিক সহায়তা প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে।
স্বিড বাংলাদেশের মহাসচিব ও কেয়ারার্স অ্যালায়েন্স বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুল মুনির বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা "প্রতিবন্ধিতার খরচ" নামে অতিরিক্ত অর্থনৈতিক বোঝা বহন করেন। "মুদ্রাস্ফীতি সবাইকে প্রভাবিত করে, কিন্তু প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অতিরিক্ত খরচ হয় যা অন্যদের হয় না। সহায়ক ডিভাইস, চিকিৎসা, ফিজিওথেরাপি, পরিচর্যাকারী, অ্যাক্সেসযোগ্য পরিবহন ও বিশেষ শিক্ষা উপকরণ—এসব দৈনন্দিন খরচ বাড়িয়ে দেয়। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ৯০০ টাকা ভাতা নগণ্য হয়ে পড়েছে।"
উইমেন উইথ ডিজঅ্যাবিলিটিজ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের (ডব্লিউডিডিএফ) নির্বাহী পরিচালক আশরাফুন নাহার মিস্তি বলেন, প্রতিবন্ধী নারীরা স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও সামাজিক বর্জনের ক্ষেত্রে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। "বাজেটে প্রতিবন্ধী ভাতা না বাড়ালে বা বিশেষ বরাদ্দ না থাকলে প্রতিবন্ধী নারীরা আরও পিছিয়ে পড়বেন। এই ভাতা দয়া বা সমবেদনা নয়; এটি নাগরিকের অধিকার ও রাষ্ট্রের দায়িত্বের অংশ।"
প্রতিবন্ধী-অন্তর্ভুক্তিমূলক বাজেটের দাবি
বেশ কয়েকটি অধিকারভিত্তিক সংগঠন আসন্ন জাতীয় বাজেটে আরও প্রতিবন্ধী-অন্তর্ভুক্তিমূলক পদ্ধতি গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে। তাদের মূল দাবিগুলো হলো: মাসিক প্রতিবন্ধী ভাতা ২,০০০ টাকা করা, সুবিধাভোগীর সংখ্যা বাড়ানো, আবেদন ও প্রদান প্রক্রিয়া সহজ করা এবং স্বাস্থ্যসেবা, থেরাপি, শিক্ষা ও অ্যাক্সেসিবিলিটিতে বিনিয়োগ বাড়ানো।
ব্লাইন্ড এডুকেশন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (বারডো) নির্বাহী পরিচালক সাইদুল হক বলেন, সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিতে বাংলাদেশের সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। "বাংলাদেশ জাতিসংঘের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সনদে (ইউএনসিআরপিডি) স্বাক্ষরকারী। সহায়তার পরিমাণ বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা প্রতিফলিত করতে হবে।"
সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৩৪ লাখ ৫০ হাজার প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ভাতা পাচ্ছেন। সরকার আগামী অর্থবছরে সুবিধাভোগীর সংখ্যা ৩৬ লাখে উন্নীত করার পরিকল্পনা করছে। তবে কর্মকর্তারা বলছেন, পরিমাণ বাড়ানো মূলত অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট বরাদ্দ ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের ওপর নির্ভর করবে।
আপাতত রাসেলের মতো মানুষের চোখ জুন মাসের আসন্ন বাজেট ঘোষণার দিকে। বর্তমান প্রতীকী সহায়তা কি শেষ পর্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ভাতায় রূপান্তরিত হবে, তা দেখার অপেক্ষা।



