বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত নতুন ডুয়েলগেজ নির্মাণ প্রকল্প সংশোধন করে বগুড়া শহর এলাকা থেকে রেলপথ নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম রেল মন্ত্রণালয়ে একটি আধা সরকারি পত্র দিয়েছেন, যাতে রানীরহাট জংশন থেকে গাবতলী স্টেশন পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটার নতুন রেলপথ নির্মাণের কথা বলা হয়েছে।
প্রস্তাবের মূল বিষয়বস্তু
১ জুন রেলসচিবকে দেওয়া এই পত্রে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ইচ্ছা অনুযায়ী বগুড়া মহানগর এলাকা থেকে রেলপথ সরিয়ে নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ১৫ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ, ভূমি অধিগ্রহণ, আন্ডারপাস ও ওভারপাস নির্মাণ, রানীরহাট জংশনে বাইপাস নির্মাণ এবং গাবতলী রেলস্টেশন অত্যাধুনিক করতে প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের কাজ ২০৩১ সালের ৩০ জুনের মধ্যে শেষ হবে। এ প্রকল্পের ব্যয় বর্তমানে ১২ হাজার ৪৪২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা।
যানজট সমস্যার সমাধান
প্রতিমন্ত্রীর পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমানে কাহালু স্টেশন থেকে বগুড়া মহানগর ও গাবতলী রেলস্টেশন হয়ে উত্তরাঞ্চলের ট্রেন চলাচল করছে। বগুড়া মহানগর এলাকায় ঘনবসতিপূর্ণ ও অত্যন্ত ব্যস্ত এলাকার মধ্য দিয়ে ট্রেন চলাচল করছে। এ রেলপথে সাতটি গুরুত্বপূর্ণ রেলক্রসিং হয়ে প্রতিদিন ট্রেন চলাচল করার কারণে প্রতিদিন প্রায় চার ঘণ্টা যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে। এ কারণে শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে ব্যাপক যানজট তৈরি হয়। এতে সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগী, ব্যবসায়ীসহ সর্বস্তরের মানুষ চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে এবং নগর ব্যবস্থাপনা, জরুরি সেবা প্রদান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে।
পত্রে আরও উল্লেখ করা হয়, সিরাজগঞ্জ-বগুড়া রেলপথে রানীরহাট জংশন থেকে গাবতলী স্টেশন পর্যন্ত সংযোগ রেলপথ নির্মাণ করা হলে উত্তরাঞ্চলে যোগাযোগব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যুক্ত হবে। সেই সঙ্গে কাহালু-রানীরহাট হয়ে গাবতলী রেলপথ নির্মাণ করা হলে বগুড়া শহরের বিদ্যমান যানজট সমস্যার স্থায়ী ও কার্যকর সমাধান সম্ভব। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে রেল যোগাযোগ আরও নিরাপদ, গতিশীল, জনবান্ধব ও ভবিষ্যৎ নগর–পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়ক হবে।
ট্রাফিক পুলিশের মতামত
বগুড়া ট্রাফিক বিভাগের পরিদর্শক (প্রশাসন) সালেকুজ্জামান খান বলেন, বগুড়া শহরে তিনটি রেলগেট আছে। দিন–রাতে প্রায় ১৪ বার ট্রেন পারাপারের জন্য রেলগেট বন্ধ রাখতে হয়। প্রতিবার ২০ মিনিট রেললাইন বন্ধ থাকলে দিন–রাতে প্রায় ৪ ঘণ্টার বেশি সময় যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে। এতে শহরে যানজট তৈরি হয়। যানজট নিরসনে ট্রাফিক পুলিশকে হিমশিম খেতে হয়।
প্রকল্পের বিবরণ
২০১৮ সালে বগুড়া-সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত প্রায় ৮৭ কিলোমিটার ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে লুপ লাইন হবে ৩৩ কিলোমিটার। প্রকল্পে করতোয়া নদীর ওপর ২৮৬ মিটার দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট একটি সেতু, ইছামতী নদীর ওপর ২০৫ মিটার একটি সেতু, ২২১টি ছোট–বড় সেতু, ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের ওপর একটি রেল ওভারপাস নির্মাণ, বগুড়া-নাটোর মহাসড়কে একটি রোড ওভারপাস নির্মাণ; সিরাজগঞ্জ ও রানীরহাটে দুটি জংশন নির্মাণ; কৃষ্ণদিয়া, রায়গঞ্জ, চান্দাইকোনা, ছনকা, শেরপুর, আরিয়াবাজার রেলস্টেশন নির্মাণ এবং বগুড়া, কাহালু ও সদানন্দপুর তিনটি রেলস্টেশন নতুন করে পুনর্নির্মাণ করা হবে।
নতুন ডুয়েলগেজ নির্মাণ করা হবে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের অর্থায়নে। প্রকল্পে ৯০২ একর ভূমি অধিগ্রহণ করা হবে। গত অর্থবছর ভূমি অধিগ্রহণের জন্য ইতিমধ্যে ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
বর্তমান সমস্যা ও সম্ভাবনা
বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত সরাসরি রেলপথ না থাকায় এ অঞ্চলের ট্রেনগুলো বর্তমানে সান্তাহার, নাটোর ও পাবনার ঈশ্বরদী হয়ে প্রায় ১২০ কিলোমিটার পথ ঘুরে চলাচল করতে হচ্ছে। বাড়তি পথ ঘুরতে একদিকে যেমন সময়ের অপচয় হচ্ছে, তেমনি বেশি ভাড়াও গুনতে হচ্ছে। বগুড়া থেকে যেখানে সড়কপথে ঢাকা পৌঁছাতে লাগে ৬ ঘণ্টা, সেখানে ট্রেনে যেতে লাগে ১০–১১ ঘণ্টা। রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, দুই জেলার মধ্যে দূরত্ব ৭২ কিলোমিটার। নতুন রেলপথ চালু হলে বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ হয়ে মাত্র ৫ ঘণ্টায় ঢাকায় পৌঁছানো সম্ভব।
প্রকল্পের সময়সীমা ও ব্যয়
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রথমে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয় ৫ হাজার ৫৭৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। শুরুতে প্রকল্পটি ২০২৬ সালের ৩০ জুনের মধ্যে শেষ করার কথা ছিল। বর্তমানে প্রকল্পের মেয়াদ ২০৩১ সালের ৩০ জুন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রকল্পের আওতায় ডুয়েলগেজের দুটি রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। একটি হলো বগুড়ার ছোট বেলাইল এলাকা থেকে সিরাজগঞ্জ স্টেশন পর্যন্ত ৭৩ কিলোমিটার এবং অপরটি বগুড়ার কাহালু স্টেশন থেকে রানীরহাট পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার। মূলত সান্তাহারের দিক থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী এবং ঢাকা থেকে ছেড়ে সান্তাহার হয়ে দিনাজপুরের পার্বতীপুরগামী ট্রেনগুলো যাতে বগুড়া স্টেশনকে এড়িয়ে সরাসরি চলাচল করতে পারে, সে জন্য কাহালু-রানীরহাট রেলপথটি নির্মাণ করা হচ্ছে। দুটি রেলপথ মিলিত হওয়ার কারণে বগুড়া শহর থেকে আট কিলোমিটার দূরে রানীরহাটে একটি জংশনও নির্মাণ করা হবে। আরেকটি জংশন হবে সিরাজগঞ্জে। এ ছাড়া নতুন রেলপথের জন্য দুই জেলায় আরও ছয়টি স্টেশন স্থাপন করা হবে।



