যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের বৈঠক শেষে বাণিজ্যিক চুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের একটি বড় দল নিয়ে চীন সফরে গিয়েছিলেন ট্রাম্প। তাঁর ইচ্ছা ছিল, এই ব্যবসায়ীরা বড় বড় বাণিজ্যচুক্তি করবেন চীনের সঙ্গে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, তাঁর সে আশায় গুড়ে বালি।
বাণিজ্য চুক্তির বাস্তবতা
বাস্তবতা হচ্ছে, অন্যান্য ক্ষেত্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে যেমন অনেকটা খালি হাতে ফিরতে হয়েছে, ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। এ ক্ষেত্রেও উভয় পক্ষের ভাষ্যের মধ্যে মিল খুবই কম। খবর আল-জাজিরার। ট্রাম্প বলেছেন, দুই দিনের বেইজিং সফরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে কয়েকটি ব্যবসায়িক চুক্তি হয়েছে। শীর্ষ বৈঠক শেষে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘দুই দেশের জন্যই দারুণ হবে—এমন কিছু বাণিজ্যচুক্তি করেছি আমরা।’ ট্রাম্পের সফরসঙ্গী মার্কিন ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন সি চি পিং।
বোয়িং চুক্তি প্রত্যাশার চেয়ে কম
শুক্রবার ফক্স নিউজকে ট্রাম্প জানান, মার্কিন উড়োজাহাজ কোম্পানি বোয়িংয়ের কাছ থেকে ২০০টি বিমান কিনতে রাজি হয়েছে চীন। যদিও বাজার বিশ্লেষকেরা ৫০০টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন। ফলে প্রত্যাশার তুলনায় কমসংখ্যক বিমানের খবর প্রকাশের পর শুক্রবার বোয়িংয়ের শেয়ারের দাম ৪ শতাংশের বেশি কমে যায়।
এ চুক্তি বাস্তবায়িত হলে প্রায় এক দশকের মধ্যে এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি যাত্রীবাহী বিমান কিনবে চীন। তবে শীর্ষ বৈঠক-পরবর্তী চীনের বিবৃতিতে এ চুক্তি বা অন্য কোনো বাণিজ্যচুক্তির কথা উল্লেখ করা হয়নি। বোয়িংও এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু নিশ্চিত করেনি।
অন্যান্য চুক্তির অবস্থা
এ ছাড়া অন্য কোনো বাণিজ্যচুক্তিও এখন পর্যন্ত দুই পক্ষের কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা বা নিশ্চিত করেনি। এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং শেষ মুহূর্তে সফরে যোগ দিলেও চীনের কাছে উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চিপ বিক্রির বিষয়ে বড় ধরনের কোনো অগ্রগতির ইঙ্গিতও পাওয়া যায়নি।
বৃহস্পতিবার সি চিন পিং বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য চীন আরও উন্মুক্ত হবে। তবে বাণিজ্যচুক্তির দিক থেকে এর অর্থ কী দাঁড়াবে, সেটা তিনি স্পষ্ট করেননি। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে বৃহস্পতিবার প্রকাশিত বিবৃতিতে শুধু বলা হয়, চীন-যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সম্পর্ক পারস্পরিক লাভজনক এবং উভয়ের জন্যই কল্যাণকর।
হোয়াইট হাউসের বিবৃতি
অন্যদিকে বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউস এক্সে প্রকাশিত বিবৃতিতে জানায়, দুই পক্ষ চীনে মার্কিন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বাজার প্রবেশাধিকার বাড়ানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প খাতে চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা করেছে। পাশাপাশি চীন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য আরও বেশি করে কিনবে, এ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে কোনো নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক বা বাণিজ্যচুক্তির কথা চীনের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়নি।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
বিষয়টি হলো, মার্কিন প্রেসিডেন্টদের কূটনৈতিক সফরে ব্যবসায়িক নেতাদের সঙ্গে নেওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। চীন-যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষ বৈঠকগুলোতে প্রায়ই বড় ধরনের ব্যবসায়িক চুক্তি বা ক্রয়চুক্তির ঘোষণা আসে। ২০১৭ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে বেইজিং সফরের সময়ও করপোরেট নেতাদের একটি প্রতিনিধিদল সফরসঙ্গী ছিল। সে সময় দুই দেশের কোম্পানিগুলোর মধ্যে ২৫০ বিলিয়ন বা ২৫ হাজার কোটি ডলারের বেশি বাণিজ্য ও বিনিয়োগচুক্তি সই হয়েছিল।
এবারের সফর ব্যর্থ?
কিন্তু এবার সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানি এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং, অ্যাপলের টিম কুক, টেসলা ও স্পেসএক্সের ইলন মাস্ক, ব্ল্যাকরকের ল্যারি ফিঙ্কসহ মেটা, ভিসা, জেপি মরগান, বোয়িং, কারগিলসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীরা চীন সফরে থাকলেও তেমন কোনো চুক্তি হলো না। ফলে ট্রাম্প যে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যঘাটতি কমাতে চান এবং সে লক্ষ্যে চীনের কাছে আরও পণ্য বিক্রি করতে চান, তাঁর সেই পরিকল্পনা এবার ফলপ্রসূ হয়নি বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।



