আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াড (আইএমও) বিশ্বের সবচেয়ে বড় মেধাভিত্তিক প্রতিযোগিতাগুলোর একটি। ১৯৫৯ সালে রোমানিয়ায় যাত্রা শুরু করা এই আয়োজনের ৬৭তম আসর এবার বসছে চীনে। এ বছর বাংলাদেশসহ ১০০টির বেশি দেশের প্রায় ৬০০ প্রতিযোগী অংশ নিচ্ছে।
বাংলাদেশ দলের প্রস্তুতি ও লক্ষ্য
বাংলাদেশের ছয় শিক্ষার্থীর দল ইতিমধ্যেই চীনে পৌঁছে গেছে। এবারের আসরের বিশেষত্ব হলো, মূল প্রতিযোগিতার আগে তারা বেইজিংয়ের চতুর্থ আন্তর্জাতিক গণিত সামার ক্যাম্পে অংশ নিচ্ছে। দলের একাডেমিক সমন্বয়ক অপূর্ব কুমার উপ দলনেতা হিসেবে রয়েছেন। ২৭ জুন দলটি চীনের প্রাচীর দেখতে গিয়েছিল।
দলের অন্যতম অভিজ্ঞ সদস্য মনামী জামান বলেন, ‘অন্যবার সরাসরি পরীক্ষা দিতে হতো, এবার সামার ক্যাম্পের সুবাদে নিজেদের প্রস্তুতিটা আরেকটু ঝালিয়ে করে নেওয়ার দারুণ একটা সুযোগ পাচ্ছি।’ বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনা চললেও গণিত দলের সদস্যদের আগ্রহ বেশি গণিতেই। ফুটবলে কে কোন দলের সমর্থক—এমন প্রশ্নে খুব একটা সাড়া মেলেনি। খুদে গণিতবিদদের ভাবনাজুড়ে এখন গণিতের বিশ্বকাপ।
পূর্ববর্তী সাফল্য ও এবারের চ্যালেঞ্জ
এর আগে বাংলাদেশ এই বিশ্বমঞ্চ থেকে ১টি সোনা, ৭টি রুপা, ৪০টি ব্রোঞ্জ ও ৪৭টি সম্মানজনক স্বীকৃতি ঘরে তুলেছে। এবার সেই ঝুলিকে আরও সমৃদ্ধ করতে চায় প্রতিযোগীরা। গতবার অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত আইএমওতে ব্রোঞ্জপদকজয়ী জাওয়াদ হামীম চৌধুরী বলেন, ‘গতবারের ব্রোঞ্জ আমাকে আত্মবিশ্বাস দিয়েছে সত্যি, তবে এবার লক্ষ্য আরও বড়। ছয়টি মৌলিক ও নতুন সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে টানা দুই দিনে। এবার চেষ্টা থাকবে সব কটি সমস্যা নিখুঁতভাবে সমাধান করে নিজের স্কোরকে আরও বাড়ানো।’
চট্টগ্রাম কলেজের রায়হান সিদ্দিকী গতবার সম্মানসূচক পদক পেয়েছিলেন। অবসরে সাইকেল চালানো আর কম্পিটেটিভ প্রোগ্রামিংয়ে মগ্ন থাকা রায়হানের সোজাসাপটা কথা, ‘গতবার ১৩ পয়েন্ট পেয়েছিলাম। এবার স্কোরটা আরও বাড়াতে হবে। তাই ভালো করে গাণিতিক সমস্যার সমাধান করে যাচ্ছি। বড় হয়ে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার ইচ্ছা, তবে তার আগে আইএমওর মঞ্চে নিজের সেরাটা দিয়ে আসতে চাই।’
দলের একমাত্র নারী সদস্য মনামী জামান
আড্ডার একমাত্র নারী মুখ ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের মনামী জামান। ইউরোপিয়ান গার্লস ম্যাথমেটিক্যাল অলিম্পিয়াডে রৌপ্যপদক এবং ২০২৪ সালের আইএমওতে ব্রোঞ্জজয়ী মনামী এবার তৃতীয়বারের মতো আন্তর্জাতিক আসরে লড়ছে। গত বছরের ১৫ নম্বরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ তার সামনে। মনামী বলেন, ‘দলের একমাত্র মেয়ে হিসেবে দায়িত্বটা একটু বেশি মনে হয়। আমি চাই, আমার ভালো ফল দেখে দেশের আরও বেশি মেয়ে গণিতচর্চায় এগিয়ে আসুক। এবারের অলিম্পিয়াডে আমার পুরোনো অনেক বন্ধু আসবে, তাদের সঙ্গে দেখা হওয়ার অপেক্ষায় আছি।’
প্রথমবারের মতো আসা সদস্যরা
চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট ইংলিশ স্কুল অ্যান্ড কলেজের মোহাম্মদ মারজুক রহমান এবারই প্রথম আন্তর্জাতিক মঞ্চে পা রাখছে। প্রথমবার হলেও তার প্রস্তুতিতে কোনো খামতি নেই। মারজুক বলেন, ‘জিওমেট্রি আর কম্বিনেটরিকস নিয়ে এবার বেশ ভালো খাটুনি গেছে। ভবিষ্যৎ কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের স্বপ্নটা এখান থেকেই শুরু করতে চাই।’
ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজের তাহসিন খান এবং রাজউক উত্তরা মডেল স্কুলের এম জামিউল হোসেনের গল্পটাও বেশ অনুপ্রেরণার। ২০২৬ সালের জাতীয় উৎসবে ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্য অলিম্পিয়াড’ হওয়া তাহসিন এবার তৃতীয়বারের মতো আইএমওতে যাচ্ছে। গতবারের ব্রোঞ্জজয়ী তাহসিন দাবা খেলার চালের মতোই গণিতের প্রতিটি ধাপে মেপে মেপে পা ফেলতে ভালোবাসে। কম্পিউটার সায়েন্সে পড়ার স্বপ্ন দেখা তাহসিন মনে করে, এবারের সামার ক্যাম্প তাদের মানসিক চাপ অনেকটাই কমিয়ে দেবে।
সদ্য এসএসসি পরীক্ষা দেওয়া দলের কনিষ্ঠ সদস্য জামিউল হোসেন গতবারের ১৮ নম্বরকে এবার ছাড়িয়ে যেতে পুরোপুরি প্রস্তুত। জামিউল বলেন, ‘গতবার সম্মানসূচক স্বীকৃতি পেয়েছিলাম, এবার লক্ষ্যটা আরও একটু ওপরে। বাবার অনুপ্রেরণা আর নিজের চেষ্টা—দুইয়ে মিলে চীনের মাটিতে লাল-সবুজের পতাকাটা ভালোভাবে ওড়াতে চাই।’
সামার ক্যাম্পের গুরুত্ব
গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির সাধারণ সম্পাদক মুনির হাসান বলেন, ‘প্রথমবারের মতো আমরা গণিতের সামার ক্যাম্পে অংশ নিচ্ছি। এই ক্যাম্প থেকে শিক্ষার্থীরা গণিতের নানা কৌশল শেখা ও বিদেশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নেটওয়ার্কিংয়ের সুযোগ পাবে। আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের দুই দিনের মেধার লড়াইয়ে কেবল মেডেল জয়ই বড় কথা নয়, বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের মেধার প্রতিনিধি হওয়াটাই এক বিশাল প্রাপ্তি।’
জানিয়ে রাখি, ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনায় প্রতিবছর গণিত উৎসব পরিচালনা করে বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি। জাতীয় উৎসব থেকেই আন্তর্জাতিক আসরে বাংলাদেশের প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়।
আইএমওর সময়সূচি
চীনের সাংহাইয়ে আগামী ১৪ জুলাই ৬৭তম আইএমওর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হবে। ২০ জুলাই সমাপনী পর্বের মাধ্যমে শেষ হবে গণিতের বিশ্ব আসর। বাংলাদেশ দলের সাফল্যের খবর পেতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকতেই পারেন।



