বিশ্বকাপে গোলাপি বুটের ছড়াছড়ি কেন? ফ্যাশন নাকি কৌশল?
বিশ্বকাপে গোলাপি বুটের ছড়াছড়ি কেন? ফ্যাশন নাকি কৌশল?

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের শুরুতেই দর্শকদের নজর কেড়েছে একটি অদ্ভুত মিল। মাঠে বিভিন্ন দলের খেলোয়াড়রা ভিন্ন জার্সি পরলেও তাদের পায়ের বুট যেন একই রঙের—উজ্জ্বল গোলাপি। অনেকের কাছেই প্রশ্ন জেগেছে, বিশ্বকাপজুড়ে হঠাৎ করে এত গোলাপি বুট দেখা যাচ্ছে কেন?

গোলাপি বুটের পেছনে বড় ব্র্যান্ডগুলো

বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষ সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান নাইকি, অ্যাডিডাস, পুমা, নিউ ব্যালান্স এবং স্কেচার্স—সবাই এ বিশ্বকাপ উপলক্ষে বিশেষ সংস্করণের উজ্জ্বল গোলাপি বুট বাজারে এনেছে। ফলে টুর্নামেন্টের প্রথম কয়েকটি ম্যাচ থেকেই মাঠে এক ধরনের ‘গোলাপি আধিপত্য’ চোখে পড়ছে।

দুর্লভ ও ক্লাসিক ফুটবল বুট সংগ্রহ এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বিডব্লিউ বুটস ইউকের প্রতিষ্ঠাতা বেন ওয়ারেন বিষয়টিকে নিছক কাকতালীয় বলে মনে করেন না। তার ভাষায়, অনেকে এটাকে কাকতালীয় বলে, কিন্তু এমন ঘটনা অনেকবার ঘটেছে। বিভিন্ন ব্র্যান্ড প্রায় একই ধরনের রঙের বুট বাজারে আনছে। গত কয়েক বছর ধরেই বুটের রঙে মিল দেখা গেছে, তবে এই বিশ্বকাপে প্রায় একই রঙের আধিপত্য দেখা যাচ্ছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তাহলে কেন গোলাপি?

নাইকের গ্লোবাল ফুটবল ফুটওয়্যার টিমের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ওডিঙ্গা নিমাকোর মতে, খেলোয়াড় এবং ভোক্তাদের কাছ থেকে উজ্জ্বল রঙের প্রতি বাড়তি আগ্রহের কারণেই তারা গোলাপি রঙ বেছে নিয়েছে। নিমাকো বলেন, আমরা খেলোয়াড় ও গ্রাহকদের কাছ থেকে ধারাবাহিকভাবে শুনেছি যে বড় মঞ্চে উজ্জ্বল রঙ তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। সেখান থেকেই আমাদের পরিকল্পনার শুরু। আমরা এমন কিছু রঙ খুঁজছিলাম যা আত্মবিশ্বাসকে আরও জোরালোভাবে প্রকাশ করতে পারে, আর গোলাপি সেই রঙগুলোর একটি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তার মতে, গোলাপি এমন একটি রঙ যা একই সঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং একটি বার্তা দেয়। আমাদের খেলোয়াড় ও গ্রাহকেরা প্রায়ই বলেন, গোলাপির মতো এত উজ্জ্বল রঙ পরতে হলে আপনার পারফরম্যান্সও ভালো হতে হবে। একই সঙ্গে গোলাপি এখন এমন একটি রঙ, যা আর সীমিত কোনো গোষ্ঠীর মধ্যে আটকে নেই; এটি বিস্তৃত দর্শকগোষ্ঠীর কাছেও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে।

গোলাপি বেছে নেওয়ার পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো দৃশ্যমানতা। উন্নয়ন পর্যায়ের বিভিন্ন পরীক্ষায় নাইকি লক্ষ্য করেছে, মাঠের সবুজ ঘাসের বিপরীতে গোলাপি বুট সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। নিমাকো বলেন, গ্যালারিতে বসে দেখুন কিংবা টেলিভিশনে, সবুজ ঘাসের ওপর গোলাপি বুট সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়। আমরা এ বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিয়েছি। বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে আমরা ভিজ্যুয়াল প্রভাবকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে চেয়েছি।

জার্সির সঙ্গে পার্থক্য ও ব্যতিক্রম

এবারের বিশ্বকাপে কোনো দলই মূলত গোলাপি জার্সি ব্যবহার করছে না। ফলে গোলাপি বুট আরও বেশি আলাদা করে চোখে পড়ছে। অ্যাডিডাসের তৈরি বেলজিয়ামের অ্যাওয়ে জার্সিকে হয়তো সবচেয়ে কাছাকাছি উদাহরণ বলা যায়। নিমাকোর ভাষায়, আমাদের লক্ষ্য ছিল বুটকে জার্সি থেকে আলাদা করে তুলে ধরা। অতীতে আমরা এমনও করেছি যেখানে বুটকে জার্সির সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা হয়েছে। কিন্তু এ বিশ্বকাপের গুরুত্ব বিবেচনায় আমরা চেয়েছি বুটগুলো যেন সত্যিই নজর কাড়ে।

তবে গোলাপি বুটের এ স্রোতের মধ্যেও কিছু ব্যতিক্রম দেখা যাবে। ফিফা নিশ্চিত করেছে যে ম্যাচ রেফারিদের ঐতিহ্যবাহী কালো বুট পরতেই হবে। এসব বুট সরবরাহ করছে ফিফার স্পন্সর অ্যাডিডাস।

অন্যদিকে কিছু তারকা খেলোয়াড়ও গোলাপি রঙের বাইরে থাকছেন। আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি অ্যাডিডাসের তৈরি ‘এল উলতিমো ট্যাঙ্গো’ বুট ব্যবহার করছেন, যার রঙ সাদা ও হালকা নীল—আর্জেন্টিনার জার্সির সঙ্গে মিল রেখে। এতে সোনালি আভাও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিচ পুমার ‘কিডসুপার আল্ট্রা ৬’ বুট ব্যবহার করছেন, যেখানে সাদা পটভূমিতে নীল তারকার নকশা রয়েছে, যা মার্কিন পতাকার স্মৃতি জাগায়। আর নাইকি পর্তুগালের অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো’র জন্য বিশেষ সোনালি বুট তৈরি করেছে, যা পর্তুগালের প্রথম গ্রুপ পর্বের ম্যাচের আগে উন্মোচন করা হবে।

নিমাকো বলেন, রোনালদো তার ষষ্ঠ বিশ্বকাপে খেলছেন। আমরা তার গড়ে তোলা উত্তরাধিকার এবং এখনও সেই উত্তরাধিকারকে সমৃদ্ধ করার যাত্রাকে উদযাপন করতে চেয়েছি। আর সেটির জন্য সোনালি রঙের চেয়ে ভালো কিছু হতে পারে না।

গোলাপি কি স্থায়ী হবে?

তবে গোলাপি বুটের এ যুগ দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে। কারণ অধিকাংশ খেলোয়াড়ই স্পন্সরশিপ চুক্তির কারণে নির্দিষ্ট বুট পরতে বাধ্য। আর নতুন ক্লাব মৌসুম শুরু হলে বুটের রঙের প্রবণতাও বদলে যাবে। বেন ওয়ারেনের মতে, জুলাইয়ের শেষ দিকে নতুন মৌসুম শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নতুন রঙ চলে আসবে।

অর্থাৎ, ২০২৬ বিশ্বকাপে গোলাপি বুট এখন যতই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকুক না কেন, ফুটবলের ফ্যাশন দুনিয়ায় এই রঙের আধিপত্য সম্ভবত সাময়িকই। তবে এ মুহূর্তে বলা যায়, বিশ্বকাপের সবুজ মাঠে গোলাপিই নতুন কালো।