বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে একটি প্রজন্মের গল্প বদলে দেয়। এখানে ভুলের সময় খুব কম, আর স্মৃতির আয়ু অনেক দীর্ঘ। একটি গোল কাউকে নিয়ে যায় নতুন স্বপ্নের দিকে, আবার একটি মুহূর্ত বহু বছরের অপেক্ষাকে থামিয়ে দিতে পারে। সেই বাস্তবতার সামনে এবার দাঁড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা। স্বাগতিকদের আত্মবিশ্বাস, দর্শকের গর্জন আর প্রত্যাশার চাপের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে বসনিয়া।
স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের পথচলা
চলতি বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের পথচলা ছিল আত্মবিশ্বাসী, কিন্তু পুরোপুরি নির্ভার নয়। গ্রুপ পর্বের শুরুতেই প্যারাগুয়েকে ৪–১ গোলে হারিয়ে নিজেদের শক্তির বার্তা দেয়। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২–০ গোলে এবং শেষ ম্যাচে তুরস্কের কাছে ৩–২ গোলে হারলেও ততক্ষণে নকআউট নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের। ছয় পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপের শীর্ষে থেকে শেষ ৩২–এ জায়গা করে নেয় স্বাগতিকরা। তিন ম্যাচে আট গোল করেছে, চার গোল হজম করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বকাপ ইতিহাসে বড় মুহূর্ত আছে। ১৯৩০ সালে সেমিফাইনাল, ২০০২ সালে কোয়ার্টার ফাইনালে খেলেছে দলটি। দলের সবচেয়ে বড় শক্তি গতি বদলে দেওয়ার ক্ষমতা। ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিচ ফিরে এসেছেন চোট কাটিয়ে। পুরো দলের আবেগ আর সৃজনশীলতার কেন্দ্র তিনিই। ফোলারিন বালোগুন গোলের ধার দেখিয়েছেন। মাঝমাঠে ওয়েস্টন ম্যাককেনি ও টাইলার অ্যাডামস খেলার ছন্দে আছেন। কোচ মরিসিও পোচেত্তিনোর দল সাধারণত বল নিজেদের কাছে রাখতে চায়। দ্রুত আক্রমণ গড়ে তোলে। নকআউটে তাদের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে ধৈর্য।
বসনিয়ার সংগ্রামী পথ
বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার ফুটবল তৈরি হয়েছে সংগ্রামের ভেতর দিয়ে। যুদ্ধের স্মৃতি, পুনর্গঠনের পথ, নতুন পরিচয় তৈরির লড়াই থেকে উঠে এসেছে এই দল। বিশ্বকাপ তাদের কাছে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার আরেকটি ভাষা। এবারের বিশ্বকাপে তাদের শুরুটা ছিল না। প্রথম ম্যাচে কানাডার সঙ্গে ১–১ গোলের ড্র। দ্বিতীয় ম্যাচে সুইজারল্যান্ডের কাছে ৪–১ গোলে হার। শেষ ম্যাচে কাতারকে ৩–১ গোলে হারিয়ে বসনিয়া ইতিহাস গড়ে নকআউটে উঠে আসে। সেরা তৃতীয় হওয়া দলগুলোর একটি হিসেবে জায়গা করে নেয় শেষ ৩২–এ।
বিশ্বকাপে আসার পথেও তারা নিজেদের সামর্থ্য দেখিয়েছে। বাছাইপর্বে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালিকে বিদায় করার স্মৃতি এখনও তাদের আত্মবিশ্বাসের বড় ভিত্তি। এই দলের মুখ এখনও ৪০ বছর বয়সী এডিন জেকো। বয়স তাকে ধীর করেছে, কিন্তু বিপজ্জনক হওয়া শেখানো বন্ধ করেনি। বড় ম্যাচের চাপ কীভাবে নিতে হয়, সেটা তিনি জানেন। তার পাশে আছেন এরমেদিন ডেমিরোভিচ। নতুন প্রজন্মে কেরিম আলাইবেগোভিচ ও এসমির বাইরাকতারেভিচ গতি ও সৃজনশীলতা যোগ করেছেন। গোলকিপার নিকোলা ভাসিলও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দলের ভরসা হয়ে উঠেছেন। বসনিয়া বল কম রাখবে। জায়গা কম দেবে। খেলার ছন্দ ভাঙবে। সুযোগ এলে সরাসরি আঘাত করবে।
মুখোমুখি লড়াই ও কৌশল
দুই দলের মুখোমুখি ইতিহাস দীর্ঘ নয়। আগের কয়েকটি প্রীতি ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রের ফল কিছুটা ভালো। বিশ্বকাপে এবারই প্রথম দেখা। আর নকআউট ফুটবল সব পুরোনো হিসাবকে নতুন করে লিখে। কৌশলগতভাবে ম্যাচের সবচেয়ে বড় লড়াই হবে মাঝমাঠে। যুক্তরাষ্ট্র কি নিজেদের গতি ধরে রেখে দ্রুত গোল করতে পারবে? নাকি বসনিয়া ম্যাচটাকে ধীরে নিয়ে গিয়ে স্নায়ুর যুদ্ধ বানাবে? যদি ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময় কিংবা টাইব্রেকারে, তাহলে ইতিহাস বদলে যেতে পারে।
সান্তা ক্লারার আলোয় এক দল নামবে স্বপ্নকে স্বাগতিক উৎসবে পরিণত করতে। আরেক দল নামবে প্রমাণ করতে, অপেক্ষা দীর্ঘ হলে গল্পও একদিন বড় হয়ে যায়।
পরবর্তী খেলাসমূহ
- বুধবার ১ জুলাই ২০২৬ [শেষ ৩২] রাত ১০টা: ইংল্যান্ড – ডিআর কঙ্গো, মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়াম, আটলান্টা, যুক্তরাষ্ট্র
- বৃহস্পতিবার ২ জুলাই ২০২৬ [শেষ ৩২] রাত ২টা: বেলজিয়াম – সেনেগাল, লুমেন ফিল্ড, সিয়াটল, যুক্তরাষ্ট্র



