রাজশাহীর পবা উপজেলার পারিলা ইউনিয়নের কাঁঠালপাড়া গ্রামে নিজেদের উদ্যোগে একটি খেলার মাঠ গড়ে তুলেছেন স্থানীয় তরুণেরা। গ্রামে কোনো খেলার মাঠ না থাকায় প্রতিবছর ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ব্যয়ে তিন বিঘার বেশি জমি লিজ নিয়ে সেটিকে খেলার মাঠে পরিণত করেছেন তাঁরা। দুই বছর ধরে এই মাঠে নিয়মিত ফুটবল, ক্রিকেটসহ বিভিন্ন খেলাধুলার আয়োজন করছেন তাঁরা।
বিকেলের মাঠজুড়ে খেলোয়াড়দের সরব উপস্থিতি
গত বুধবার বিকেলে মাঠে গিয়ে দেখা যায়, বিকেল পাঁচটার পর থেকেই খেলোয়াড়দের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। ছোট-বড় সবাই ওয়ার্মআপ করে নেয়ার পর দুই দলে ভাগ হয়ে শুরু হয় ফুটবল ম্যাচ, যা চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত। মাঠের এক পাশে ছোট শিশুরা অনুশীলন করছে, অন্য পাশে বড়রা মগ্ন ওয়ার্মআপে।
গ্রামের পরিবেশ বদলে দিয়েছে এই মাঠ
খেলা দেখতে আসা গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা আলিফ উদ্দিন বলেন, 'এই মাঠ গ্রামের পরিবেশ বদলে দিয়েছে। অন্য গ্রামের তুলনায় এখানকার ছেলেদের আচরণও অনেক ভালো। খেলাধুলাই তাঁদের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছে।'
পেয়ারাবাগান লিজ নিয়ে মাঠ তৈরি
কাঁঠালপাড়া গ্রামটির চারপাশজুড়ে কৃষিজমি ও ফলের বাগান। খেলাধুলার কোনো মাঠ না থাকায় গ্রামের ছেলেদের অন্য এলাকায় গিয়ে খেলতে হতো। এ সমস্যার সমাধানে দুই বছর আগে স্থানীয় সংগঠন 'কাঁঠালপাড়া যুবসংঘ' একটি পেয়ারাবাগান লিজ নিয়ে জমি সমতল করে খেলার মাঠ তৈরি করে। বর্তমানে প্রতিদিন বিকেলে মাঠটিতে ছোট-বড় মিলিয়ে ৫০ থেকে ১০০ জনের সমাগম হয়।
নিজস্ব অর্থায়নে মাঠের লিজ
কাঁঠালপাড়া যুবসংঘের সভাপতি তারিক হোসেন বলেন, 'মাঠটি সম্পূর্ণ আমাদের নিজস্ব উদ্যোগে করা। ক্লাবের সদস্যরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ দিয়েছেন। কেউ ৫০০ টাকা, কেউ ১ হাজার, আবার কেউ ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত দিয়েছেন। সবার সহযোগিতায় লিজের টাকা জোগাড় হয়েছে। আমাদের একটাই লক্ষ্য, গ্রামের ছেলেরা যেন খেলাধুলার মধ্যে থাকে, নেশার সঙ্গে জড়িয়ে না পড়ে।'
মাদকমুক্ত রাখতে ভূমিকা
স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠ বাসিন্দা মুজিবুর রহমান বলেন, 'মাঠটি হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলেছে। এখন বিকেল হলেই ছেলেরা মাঠে আসে, খেলাধুলা করে এবং একে অপরের সঙ্গে মেশে। আমাদের এলাকায় মাদকের সমস্যা প্রায় নেই বললেই চলে।'
বিরল উদ্যোগ, সাফল্যের গল্প
কাঁঠালপাড়া যুবসংঘের সদস্য বিপ্লব হোসেনের মতে, গ্রামে ব্যক্তিগত উদ্যোগে এত বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে মাঠ লিজ নেওয়ার ঘটনা বিরল। তাঁর ভাষ্য, 'আমাদের গ্রামে কোনো স্কুল বা কলেজ নেই। তারপরও ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা থেকেই মাঠটি তৈরি করা হয়েছে। এখানকার অনেক খেলোয়াড় এখন জেলার বিভিন্ন পরিচিত দলে খেলছে।'
সামাজিক বন্ধনের কেন্দ্র
স্থানীয় মানুষের মতে, মাঠটি এখন শুধু খেলাধুলার জায়গা নয়, সামাজিক বন্ধনেরও কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। মাঠের জন্য অর্থ সংগ্রহ, রক্ষণাবেক্ষণ ও বিভিন্ন আয়োজনের ক্ষেত্রে গ্রামের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আছে। যুবসংঘের সহসভাপতি মো. রনি বলেন, খেলাধুলার পাশাপাশি শীতবস্ত্র বিতরণ, ঈদে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো সামাজিক কাজও করা হয়। নিয়মিত খেলাধুলার মাধ্যমে তরুণদের মধ্যে শৃঙ্খলাবোধ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও দলগত চেতনা গড়ে উঠছে।
টিকিয়ে রাখার চ্যালেঞ্জ
কাঁঠালপাড়া যুবসংঘের যাত্রা শুরু হয় ২০১১ সালে। পরে ২০১৮ সালে সরকারি নিবন্ধনের সময় সংগঠনটির নাম রাখা হয় 'কাঁঠালপাড়া যুবসংঘ'। সংগঠনটির সভাপতি তারিক হোসেন বলেন, 'প্রতিবছর ১ লাখ ২০ হাজার টাকা জোগাড় করা সহজ নয়। তারপরও আমরা চাই মাঠটি টিকিয়ে রাখতে।'



