কানসাস সিটির একটা কিন্ডারগার্টেন স্কুলের দেয়াল। সাধারণত এখানে বাচ্চাদের আঁকা ছবি, বর্ণমালা, রঙিন প্রজাপতি ঝোলে। সেই দেয়ালে গত রোববার সকালে কেউ এঁটে দিয়ে গেছে আকাশি নীল-সাদা পতাকা, তিন তারার জার্সি, আর দুটো মুখ। একজন—যিনি ছিলেন, আরেকজন—যিনি আছেন। একজনের চুলে এখন রুপালির ছোঁয়া, অন্যজনের স্মৃতি এখনো সেই পতাকার সুতোয় বোনা। স্মৃতি আর বর্তমান। ম্যারাডোনা আর মেসি।
এই দুই নামের মাঝখানে কোথাও দাঁড়িয়ে আছে আর্জেন্টিনা ফুটবলের সমস্ত ইতিহাস, সমস্ত যন্ত্রণা, সমস্ত উৎসব।
বিশ্বকাপের সূচনা
বুধবার বাংলাদেশ সময় সকাল সাতটায় আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ শুরু হচ্ছে। প্রতিপক্ষ আলজেরিয়া। ভেন্যু কানসাস সিটির অ্যারোহেড স্টেডিয়াম, যেটির ধারণক্ষমতা ৭৬ হাজার। কিন্তু ম্যাচটা শুধু ভেন্যুতে আবদ্ধ নেই। ছড়িয়ে পড়েছে শহরের রেস্তোরাঁ পাড়ায়, রাস্তার মোড়ে মোড়ে, সেই দেয়ালে। আর তুলার ঢোলে!
তুলা মার্তিনেজ। ফিফার ‘দ্য বেস্ট’ পুরস্কারে বিশ্বের সেরা সমর্থক হিসেবে স্বীকৃত হয়েছিলেন। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে চলে গেছেন অন্যলোকে। কিন্তু তাঁর ঢোল থামেনি। তুলার পরিবারের অনুরোধে আরেক সমর্থক গিলেরমো সেটি নিয়ে গেছেন কানসাস সিটিতে। বললেন, ‘১৯৭৪ সাল থেকে এই ঢোল প্রতিটি বিশ্বকাপে গেছে। এবারও থাকবে। সব সমর্থককে এক করবে।’
সমর্থকেরা আসলে এরই মধ্যে এক হয়ে গেছেন, পানীয়র গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে স্বপ্ন দেখছেন। পরপর দুবার বিশ্বকাপ জেতার স্বপ্ন।
অনুশীলনে হাসিখুশি মেসি
মাত্র দুটি দল পেরেছে এর আগে। ১৯৩৪–৩৮ সালে ইতালি, ১৯৫৮–৬২ সালে ব্রাজিল। এরপর ছয় দশক কেটে গেছে। কেউ পারেনি। বলা হয়, ফুটবলের ইতিহাসে এটি সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি, বিশ্বকাপ ধরে রাখা, যখন সবাই সেটা কেড়ে নিতে চায়।
লিওনেল স্কালোনির দলের সামর্থ্য আছে। এখনো তাঁরা ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বর। সর্বশেষ ৭ ম্যাচেই জয়, ২১ গোল, মাত্র একটি গোল হজম। প্রতিপক্ষ সব সময় শক্তিশালী ছিল না, এটা সত্যি। কিন্তু ছন্দ, আত্মবিশ্বাস, আর ওই রক্ষণের দৃঢ়তা, এগুলো তো মূল্যহীন নয়।
তবে কথা হলো, এর চেয়েও দারুণ ফর্ম নিয়ে আর্জেন্টিনা ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের কাছে হেরেছিল। আবার ওই ম্যাচ হেরেও শেষমেশ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। গল্পটা শুনতে এখন রূপকথার মতো লাগে। কিন্তু বিশ্বকাপে ইতিহাস এমন একটা ঢাল, যা সব সময় গোলপোস্ট রক্ষা করে না।
আলজেরিয়ার চ্যালেঞ্জ
আলজেরিয়া ১২ বছরের অনুপস্থিতির পর ফিরেছে। শেষবার ছিল ২০১৪ সালে, যেখানে তারা ইতিহাসে প্রথমবার দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠেছিল। শেষ ষোলোর অতিরিক্ত সময়ে তাদের ছিটকে দিয়েছিল জার্মানি। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ২৮তম দলটা আফ্রিকান বাছাইপর্বে শুধু একটি ম্যাচ হেরে গ্রুপ জিতেছে। আক্রমণভাগ ঈর্ষণীয়। ভ্লাদিমির পেতকোভিচের দল সর্বশেষ ছয় ম্যাচে মাত্র ২ গোল হজম করেছে। নেদারল্যান্ডসকে হারিয়েছে, উরুগুয়েকে রুখেছে। এই দল শুধু শরীর দিয়ে খেলে না, মাথা দিয়েও খেলে।
রিয়াদ মাহরেজ সেই আগের মতো নেই, কিন্তু দলে আছেন আমিনে গুইরি, আনিস হাজ মুসা, ফারেস শাইবি। আর আছে দীর্ঘ অনুপস্থিতির পর ফেরা সেই ক্ষুধা। ২০০৭ সালে তারা আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হয়েছিল একটা প্রীতি ম্যাচে, ক্যাম্প ন্যুতে। আর্জেন্টিনা জিতেছিল ৪-৩। মেসি করেছিলেন আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের প্রথম জোড়া গোল।
মেসির ষষ্ঠ বিশ্বকাপ
সেই মেসি এবার ষষ্ঠ বিশ্বকাপে খেলবেন ইতিহাসের প্রথম ফুটবলার হিসেবে। হ্যামস্ট্রিং চোটের পর ফিরেছেন। সেই অলৌকিক বাঁ পা, দৃষ্টিতে সেই শান্ত তীক্ষ্ণতা। বয়স ৩৮, কিন্তু যে মানুষ সময়ের গতিকে বল পায়ে থামিয়ে দিতে পারেন, তাঁর ক্ষেত্রে বয়সের অঙ্ক একটু আলাদা হিসেবে কাজ করে।
রক্ষণ নিয়ে এখনো প্রশ্নচিহ্ন। তাগলিয়াফিকো চোটে বাইরে। স্কালোনি প্রশিক্ষণে চার ডিফেন্ডার পরীক্ষা করেছেন, আবার তিন স্টপারের ফরমেশনও। মাঝমাঠে এনজো ফার্নান্দেজ, আলেক্সিস ম্যাক আলিস্টার ও রদ্রিগো দি পল। তিনজন মিলে একটা প্রাচীরও গড়েন, আবার আক্রমণের সেতুও। হুলিয়ান আলভারেজকে নিয়ে এখনো সংশয় আছে। তাই শেষ পর্যন্ত হয়তো সামনে থাকবেন মেসি ও লাউতারো মার্তিনেজ, পেছন থেকে উঠে আসবেন থিয়াগো আলমাদা।
সবাই তুমুল অপেক্ষায়। আগামীকাল ভোরে আর্জেন্টিনার সেই যাত্রা শুরু হবে। আলজেরিয়ার বিপক্ষে, ৭৬ হাজার দর্শকের সামনে। আর তুলার ঢোলের বাদ্যে।



