মঙ্গলবার ডালাসে ফুটবল বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এর ম্যাচে মুখোমুখি হবে আইভরিকোস্ট ও নরওয়ে। এই প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক ফুটবলে একে অপরের বিপক্ষে খেলতে নামছে দল দুটি। নকআউট ফুটবলের চরম বাস্তবতা হলো এখানে কোনো আগামীকাল নেই। অতীতের অর্জন, গ্রুপ পর্বের পরিসংখ্যান, দর্শকদের ভবিষ্যদ্বাণী সবকিছু ৯০ মিনিটের ভেতরে এসে দাঁড়ায়। একটি বাঁশি, একটি গোল, একটি ভুল, একটি মুহূর্তে ইতিহাস নতুন করে লেখা হয়।
আইভরিকোস্টের প্রথম নকআউট
আইভরিকোস্ট এখানে এসেছে এমন এক ইতিহাস নিয়ে, যেখানে বহুবার তারা বড় আসরে এসে থেমে গেছে দরজার সামনে। ২০০৬, ২০১০, ২০১৪ বিশ্বকাপ ছিল, প্রতিভা ছিল, বড় নাম ছিল, কিন্তু নকআউট ছিল না। দিদিয়ের দ্রগবার প্রজন্ম যে দরজা খুলতে পারেনি, সেই দরজায় এবার কড়া নাড়ছে নতুন প্রজন্ম। এই আসরের গ্রুপ পর্বে প্রথম ম্যাচে ইকুয়েডরের বিপক্ষে ১-০ গোলের জয়, এরপর জার্মানির কাছে ২-১ গোলে হার, এবং শেষ ম্যাচে কুরাসাওকে ২-০ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট নিশ্চিত করে আইভরিকোস্ট।
নরওয়ের ২৮ বছরের অপেক্ষা
নরওয়ে ১৯৯৮ সালের পর বিশ্বকাপে ছিল না। প্রায় তিন দশক ধরে নরওয়ের ফুটবল বড় টুর্নামেন্টের বাইরে থেকেছে। এবার সেই অপেক্ষার অবসান হয়েছে। তারা এসেছে নতুন মুখ, নতুন আত্মবিশ্বাস আর পুরোনো ক্ষুধা নিয়ে। গ্রুপ পর্বে তাদের যাত্রা ছিল ভয়ংকর। প্রথম ম্যাচে ইরাককে ৪-১ গোলে হারানো, দ্বিতীয় ম্যাচে সেনেগালের বিপক্ষে ৩-২ গোলের নাটকীয় জয়। দুই ম্যাচেই নকআউট নিশ্চিত হওয়ায় ফ্রান্সের বিপক্ষে মূল একাদশের অনেককে বিশ্রাম দেওয়া হয়; ফল ৪-১ গোলের হার। নরওয়ে গ্রুপ পর্বে মোট আটটি গোল করেছে এবং সাতটি গোল হজম করেছে। আক্রমণ যতটা ভয়ংকর, রক্ষণ ততটাই প্রশ্নবিদ্ধ।
হলান্ডের চার গোল
আইভরিকোস্টের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন হলান্ড। যিনি পুরো ম্যাচের মানচিত্র বদলে দিতে পারেন। এখন পর্যন্ত চার গোল করেছেন, মাত্র দুই ম্যাচে। এমনভাবে গোল করছেন যেন সময়ের সঙ্গে তার আলাদা কোনো চুক্তি আছে। ইরাক ও সেনেগালের বিপক্ষে যেখানে সুযোগ পেয়েছেন, সেখানেই আঘাত করেছেন। গ্রুপের শেষ ম্যাচে তাকে বিশ্রাম দেওয়া হয়েছিল। তাই ডালাসে তিনি ফিরছেন নতুন শক্তি নিয়ে।
আইভরিকোস্টের রক্ষণ ও দলগত শক্তি
আইভরিকোস্টের রক্ষণ এই বিশ্বকাপে অনেক বেশি পরিণত। তিন ম্যাচে মাত্র দুই গোল হজম করেছে তারা। জার্মানির মতো দলও তাদের সহজে ভাঙতে পারেনি। আর সেই দেয়ালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাম ওসমান দিয়োমান্দে। এই ম্যাচে তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কঠিন দায়িত্ব হলান্ডকে থামানো। আইভরিকোস্টের আক্রমণ কোনো এক ফুটবলারের কাঁধে দাঁড়িয়ে নেই। নিকোলাস পেপে কুরাসাওর বিপক্ষে জোড়া গোল করে ছন্দে ফিরেছেন। আমাদ দিয়ালো গতি আনেন। ইয়ান দিয়োমান্দে সাহস নিয়ে খেলেন। আঞ্জ-ইওয়ান বনি জায়গা তৈরি করেন। তাদের ফুটবলে ব্যক্তির চেয়ে দলগত শক্তি বড়।
প্রথম সাক্ষাৎ ও ভবিষ্যৎ
দুই দল এর আগে কখনও আন্তর্জাতিক ফুটবলে মুখোমুখি হয়নি। কোনো পুরোনো প্রতিশোধ নেই। কোনো অতীত নেই। কোনো হিসাব নেই। শুধু প্রথম সাক্ষাৎ। আর সেটাও সরাসরি নকআউটে। ডালাসে আজকের রাতে হয়তো নির্ধারিত হবে হলান্ড কি আবারও সব আলো নিজের দিকে টেনে নেবেন, নাকি আইভরিকোস্ট প্রমাণ করবে বড় নামের চেয়েও বড় হতে পারে দল। একদল খেলবে ইতিহাসের প্রথম নকআউট জয় পাওয়ার জন্য। আরেক দল খেলবে ২৮ বছরের অপেক্ষাকে আরও দীর্ঘ যাত্রায় রূপ দেওয়ার জন্য। শেষ বাঁশির পর হয়তো পৃথিবী দেখবে হাতিরা যখন দৌড়ায়, তখন ইতিহাসও তাদের পথ ছেড়ে দেয়।



