ফিফা ক্লাব ওয়ার্ল্ড কাপ ২০২৫ এর ফাইনাল ম্যাচ শেষে মেডেল হাতে কাতার এয়ারওয়েজের কেবিন ক্রুরা। এবারের ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনালে যে দলই ট্রফি জিতুক না কেন, তাদের গলায় মেডেল পরিয়ে দেবেন কাতার এয়ারওয়েজের কেবিন ক্রুরা। উপসাগরীয় অঞ্চলের এই বিমান সংস্থার সঙ্গে ফিফার সর্বোচ্চ স্তরের অংশীদারত্ব চুক্তি রয়েছে। এর আগে ২০১৮ সালের রাশিয়া এবং ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপেও একই দৃশ্য দেখা গিয়েছিল।
তবে পুরো বিষয়টির মধ্যে একধরনের প্রচ্ছন্ন কৌতুক রয়েছে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে কাতার এয়ারওয়েজের প্রভাব খর্ব করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। শুধু কাতারের এই বিমান সংস্থা নয়, আরব আমিরাতের এমিরেটস ও ইতিহাদ এয়ারওয়েজের ওপরও তাঁর চোখ ছিল। কাতারের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কাতার এয়ারওয়েজ দীর্ঘদিন ধরে নিজ সরকারের কাছ থেকে বিপুল ভর্তুকি পেয়ে আসছে। এমনকি করোনা মহামারির সময়েও সংস্থাটি ২ বিলিয়ন ডলারের বড় প্রণোদনা পেয়েছিল।
ট্রাম্পের ক্ষোভ ও বাণিজ্য যুদ্ধ
ট্রাম্প মনে করতেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই বিমান সংস্থাগুলো মার্কিন রুটে ব্যবসার ক্ষেত্রে বাড়তি ও অন্যায্য সুবিধা পাচ্ছে। এই ক্ষোভ থেকে তিনি উপসাগরীয় অঞ্চলের বিমানের যাত্রীদের জন্য ল্যাপটপ বহনের ওপর নিষেধাজ্ঞাও জারি করেছিলেন। পরবর্তীতে মার্কিন প্রশাসন ও বিমান সংস্থাগুলোর মধ্যে একটি চুক্তি সই হয়। তবে এই ঘটনা মনে করিয়ে দেয় যে, স্পন্সরশিপ কেবলই মাঠে বিভিন্ন জায়গায় প্রদর্শিত হওয়া নিরীহ কোনো নাম নয়; এর পেছনে গভীর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থাকে।
দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই-কিয়া কোম্পানির ক্ষেত্রেও ট্রাম্পের এমন ক্ষোভ দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি না করেও সেখানে বিপুল পরিমাণ বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) বিক্রি করায় ট্রাম্প তাদের ওপর অসন্তুষ্ট ছিলেন। ২০২৪ সালে ট্রাম্প আবার ক্ষমতায় আসতে পারেন—এই আশঙ্কায় হুন্দাই-কিয়া যুক্তরাষ্ট্রে তাদের রাজনৈতিক লবিংয়ের বাজেট প্রায় ১৫০ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছিল।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে ট্রাম্প দক্ষিণ কোরিয়ার পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। এই শুল্কের মূল নিশানা ছিল তাদের বৈদ্যুতিক গাড়ি।
চীনের প্রযুক্তি কোম্পানি ও উদ্বেগ
এদিকে, চীনের বহুজাতিক প্রযুক্তি কোম্পানি লেনোভো এবার ফিফার অফিশিয়াল প্রযুক্তি পার্টনার হিসেবে কাজ করছে। তারা বিশ্বের বৃহত্তম কম্পিউটার বিক্রেতা। হংকংয়ের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত এই কোম্পানির সঙ্গে চীন সরকারের সম্পর্ক নিয়ে অনেক মার্কিন কর্মকর্তার মনে সন্দেহ রয়েছে। ফলে আমেরিকার শহরগুলোতে লেনোভোর বড় উপস্থিতি মার্কিন প্রশাসনকে কিছুটা বিচলিত করতে পারে।
একই ধরনের উদ্বেগ থাকবে চীনের আরেক ব্র্যান্ড হাইসেন্স কোম্পানিটিকে নিয়েও। এটি ফিফার দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের স্পন্সর। ইলেকট্রনিক্স ও গৃহস্থালি পণ্য প্রস্তুতকারক এই প্রতিষ্ঠানটির সিংহভাগ শেয়ার রয়েছে চীন সরকারের হাতে। এই চীনা ব্র্যান্ডগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য কোনো হুমকি তৈরি করছে কি না—সেটিও মার্কিন সরকারকে ভাবনায় ফেলেছে।
সৌদি আরবের সমীকরণ
তবে ফিফার স্পন্সর তালিকা আমেরিকার জন্য পুরোপুরি চিন্তার কারণ নয়। যেমন, সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। বর্তমানে বিশ্ব ফুটবলে সবচেয়ে বড় স্পন্সরদের একটি আরামকো।
২০২৫ সালের মে মাসে, আরামকো মার্কিন কোম্পানিগুলোর সঙ্গে প্রায় ৯০ বিলিয়ন ডলারের প্রাথমিক চুক্তি সই করে। এর মধ্যে এআই অবকাঠামোর জন্য প্রযুক্তি জায়ান্ট ‘এনভিডিয়া’ এবং শোধনাগার আধুনিকায়নের জন্য জ্বালানি খাতের জায়ান্ট ‘এক্সনমোবিল’ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এছাড়াও টেক্সাসে অবস্থিত মোটিভা শোধনাগারের সম্প্রসারণসহ যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সৌদি আরব। স্বাভাবিকভাবেই, বিশ্বকাপ চলাকালীন সৌদি আরবের জাতীয় ফুটবল দল টেক্সাসকেই তাদের প্রধান কেন্দ্র বানিয়েছে।
অতীত ঐতিহ্যে ফেরা
অন্যান্য দিক থেকে বিচার করলে, ফিফার বর্তমান স্পন্সরদের তালিকাটি যেন এক অতীত সোনালী যুগের কথা মনে করিয়ে দেয়। শেষবার যখন ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তখন কোকা-কোলা ও ম্যাকডোনাল্ডস ছিল ফিফার সবচেয়ে বড় স্পন্সর। তাদের পাশে তখন দেখা যেত জাপানের ক্যানন, ফুজিফিল্ম ও জেভিসির মতো ব্র্যান্ড।
জাপানের কোম্পানিগুলো এখন বৈশ্বিক স্পন্সরশিপের দৃশ্যপট থেকে অনেকটাই হারিয়ে গেছে। তবে কোকা-কোলা এবং ম্যাকডোনাল্ডস এবারও আছে, আর তাদের সাথে যুক্ত হয়েছে আর্থিক লেনদেনের প্রযুক্তি জায়ান্ট ‘ভিসা’।
বিশ্বকাপজুড়ে কোটি কোটি দর্শক টিভির পর্দায় চোখ রাখবে। ফলে পূর্ব এশিয়াসহ বাইরের দেশগুলোর প্রতিযোগিতার মুখে আমেরিকান ব্র্যান্ডগুলোর সামনে এটি বড় সুযোগ নিজেদের শিল্প পরাশক্তি হিসেবে তুলে ধরার।
মার্কিন ক্রীড়া সামগ্রী বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ‘ফ্যানাটিকস’ ইতিমধ্যেই এই সুযোগ লুফে নিয়েছে। ২০৩১ সাল থেকে ফিফা তাদের সঙ্গে স্টিকার এবং অন্যান্য সংগ্রহযোগ্য সামগ্রী বিক্রির চুক্তি করেছে। এর মাধ্যমে ইতালীয় কোম্পানি ‘পানিনি’র সঙ্গে ফিফার দীর্ঘ ৫০ বছরের সম্পর্কের অবসান ঘটতে যাচ্ছে।
একটা সময় ছিল যখন স্পন্সরশিপ বলতে কেবল স্টেডিয়ামের মাঠের চারপাশের কিছু বিলবোর্ড লাগানোকেই বোঝাত। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে খেলাধুলার চারপাশের সমীকরণ বদলে গেছে। বর্তমান যুগে জাতীয় স্বার্থ এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাই স্পন্সরশিপের মূল চালিকাশক্তি। যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে এবারের বিশ্বকাপেই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ মিলবে।
সাইমন চ্যাডউইক ক্রীড়াবিষয়ক গবেষক, লেখক, পরামর্শদাতা। বিশ্ব ক্রীড়া শিল্পে বিশেষ করে আফ্রিকা–ইউরেশিয়া অঞ্চলে কাজ করার দীর্ঘ তিন দশকের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
[বিশ্বকাপ ফুটবলকে সামনে রেখে ১২ মে ২০২৬ মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ফোর্বসে এ লেখা প্রকাশিত হয়। প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনায় সেটি অনুবাদ করা হলো।]



