টানা কয়েকদিনের বৃষ্টি ও ঘন কালো মেঘে ঢেকে ছিল কিশোরগঞ্জের আকাশ। ঈদের দিন সকালে আবহাওয়া কিছুটা স্বাভাবিক থাকলেও জামাত শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই নামে ভারী বর্ষণ। তবে বৃষ্টিকে উপেক্ষা করেই দেশের অন্যতম বৃহত্তম ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী শোলাকিয়া ঈদগাহে। ভেজা ও কাদামাখা মাঠেই অনুষ্ঠিত হয় ঈদুল আজহার ১৯৯তম জামাত।
মুসল্লিদের উপস্থিতি ও প্রস্তুতি
ভোর থেকেই দলে দলে মুসল্লিরা বৃষ্টির মধ্যেই ঈদগাহ ময়দানে আসতে শুরু করেন। কেউ রেইনকোট, কেউ ছাতা, আবার কেউ প্লাস্টিকের আবরণ মাথায় দিয়ে জামাতে অংশ নেন। মাঠজুড়ে কাদা ও পানি জমে গেলেও মুসল্লিদের উপস্থিতিতে কোনো ঘাটতি ছিল না। নিরাপত্তার স্বার্থে জায়নামাজ ও মোবাইল ফোন ছাড়া অন্য কিছু মাঠে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।
জামাতের সময় ও ইমামতি
প্রচলিত রেওয়াজ অনুযায়ী, জামাত শুরুর ১৫ মিনিট আগে তিনটি, ১০ মিনিট আগে দুটি এবং ৫ মিনিট আগে একটি শর্টগানের গুলি ফুটিয়ে নামাজের সংকেত দেওয়া হয়। সকাল ৯টায় শুরু হয় জামাত। এতে ইমামতি করেন মুফতি আবুল খায়ের মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ। নামাজ শেষে দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর শান্তি, ঐক্য ও সমৃদ্ধি কামনায় বিশেষ মোনাজাত করা হয়।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা
২০১৬ সালের জঙ্গি হামলার বিষয়টি মাথায় রেখে এবারও নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা। বৃষ্টিভেজা মাঠ ও আশপাশের এলাকায় মোতায়েন ছিল দুই প্লাটুন বিজিবি, শত শত পুলিশ, র্যাব, আর্মড পুলিশ ও আনসার সদস্যরা। গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা বৃষ্টির মধ্যেই দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট পুরো মাঠ পরীক্ষা করে নিশ্চিত করে নিরাপত্তা। মাঠজুড়ে ছিল সিসিটিভি ক্যামেরা ও ওয়াচ টাওয়ার।
বিশেষ ব্যবস্থা ও পরিবহন
বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও মুসল্লিদের যাতায়াতের সুবিধার্থে দুটি বিশেষ ট্রেন চালু করা হয়। একটি ভৈরব থেকে এবং অন্যটি ময়মনসিংহ থেকে শোলাকিয়ার উদ্দেশে ছেড়ে আসে। ভেজা সড়ক ও বৃষ্টি উপেক্ষা করেও হাজারো মানুষ ছুটে আসেন শোলাকিয়ায়।
উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিরা
জামাতে অংশ নেন কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ মোজহারুল ইসলামসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতারা।
মুসল্লিদের অনুভূতি
ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার বাসিন্দা মো. আলাউদ্দিন জানান, তিনি টানা ১২ বছর ধরে শোলাকিয়ায় ঈদের নামাজ আদায় করছেন। তাই বৃষ্টিতে ভিজেই এবারও এসেছেন। তিনি বলেন, “বৃষ্টি থাকলেও শোলাকিয়ার নামাজ মিস করি না। এই অনুভূতি অন্যরকম।”
কুলিয়ারচরের আলী আকবর সাইকেলে ভিজতে ভিজতে এসে বলেন, “বৃষ্টি হোক বা রোদ-এখানে নামাজ পড়ার শান্তিটাই আলাদা।”
প্রশাসনের বক্তব্য
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মিজাবে রহমত বলেন, “বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও আমরা সব প্রস্তুতি সম্পন্ন রেখেছিলাম। মুসল্লিদের সহযোগিতায় শান্তিপূর্ণভাবে জামাত সম্পন্ন হয়েছে।”
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, “বৃষ্টি ও প্রতিকূলতা সত্ত্বেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল অটুট। এটি আমাদের জন্য সফল আয়োজন।”
শোলাকিয়া ঈদগাহের ঐতিহ্য
কিশোরগঞ্জ শহরের পূর্ব প্রান্তে নরসুন্দা নদীর তীর ঘেঁষে অবস্থিত শোলাকিয়া ঈদগাহ ১৭৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। জনশ্রুতি রয়েছে, ১৮২৮ সালে এখানে সোয়া লাখ মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করেছিলেন। সেই ‘সোয়া লাখ’ শব্দ থেকেই পরবর্তীতে নাম হয় ‘শোলাকিয়া’।



