২০২২ বিশ্বকাপে সৌদি আরবের কাছে হেরে বিশ্বকাপ শুরু করেছিল আর্জেন্টিনা। এবারের বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো মাঠে নামবে আর্জেন্টিনা। আলজেরিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টায় ম্যাচ তাদের। এবারের বিশ্বকাপের আগে আরও ১৮টি বিশ্বকাপ খেলেছে আর্জেন্টিনা। সেই ম্যাচগুলোতে আর্জেন্টিনা কেমন করেছে? সেটাই দেখে নেওয়া যাক—
উরুগুয়েতে ১৯৩০ বিশ্বকাপ: আর্জেন্টিনা ১–০ ফ্রান্স
১৯৩০ সালের ১৫ জুলাই আর্জেন্টিনা তাদের ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলে। ফ্রান্সের বিপক্ষে ওই ম্যাচে লুইস মন্তির ৮১ মিনিটের একমাত্র গোলে জয় নিশ্চিত করে আলবিসেলেস্তেরা। মজার ব্যাপার হলো, পরের বিশ্বকাপে এই মন্তিই ইতালির হয়ে বিশ্বকাপ জিতেছিলেন। নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপে স্বাগতিক উরুগুয়ের কাছে ফাইনালে ৪–২ ব্যবধানে হেরে রানার্স-আপ হয়েছিল আর্জেন্টিনা।
ইতালিতে ১৯৩৪ বিশ্বকাপ: আর্জেন্টিনা ২–৩ সুইডেন
নিজেদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপে গিয়ে প্রথম ম্যাচে হারের স্বাদ পায় আর্জেন্টিনা। আলবিসেলেস্তেদের জন্য প্রথম ম্যাচটিই শেষ ম্যাচ হয়ে গিয়েছিল সেবার। কারণ টুর্নামেন্টটা হয়েছিল সরাসরি নকআউট পদ্ধতিতে।
সুইডেনে ১৯৫৮ বিশ্বকাপ: আর্জেন্টিনা ১–৩ পশ্চিম জার্মানি
টানা তিনটি বিশ্বকাপে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর এই আসর দিয়ে আবার বিশ্বমঞ্চে ফেরে আর্জেন্টিনা। তবে ফেরাটা তাদের জন্য সুখকর হয়নি। ওরেস্তে করবাত্তার গোলে শুরুতে এগিয়ে গিয়েছিল আর্জেন্টিনাই। তবে হেলমুট রানের জোড়া গোল ও উভে জিলারের গোলে জয় নিশ্চিত করে পশ্চিম জার্মানি। পরে চেকোস্লোভাকিয়ার কাছে ৬–১ গোলের বিশাল হারে গ্রুপ পর্বেই বাদ পড়তে হয় আর্জেন্টিনাকে। ওই বিশ্বকাপে শুধু উত্তর আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে জয় পেয়েছিল তারা।
চিলিতে ১৯৬২ বিশ্বকাপ: আর্জেন্টিনা ১–০ বুলগেরিয়া
রানকাগুয়ায় হেক্টর ফ্যাকুন্দোর একমাত্র গোলে আর্জেন্টিনা জয় দিয়েই বিশ্বকাপ শুরু করে এই আসরে। কিন্তু গ্রুপের বাকি দুই ম্যাচে ইংল্যান্ডের কাছে ৩–১ ব্যবধানে হার ও হাঙ্গেরির বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করায় পরের রাউন্ডে যাওয়া হয়নি তাদের।
ইংল্যান্ডে ১৯৬৬ বিশ্বকাপ: আর্জেন্টিনা ২–১ স্পেন
লুইস আরতিমের জোড়া গোলে স্পেনের বিপক্ষে জয় দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করে আর্জেন্টিনা। পশ্চিম জার্মানির সঙ্গে ড্র ও সুইজারল্যান্ডকে হারিয়ে গ্রুপে রানার্স-আপ হয় তারা। তবে কোয়ার্টার ফাইনালে স্বাগতিক ইংল্যান্ডের বিপক্ষে হেরে বিদায় নেয় তারা।
জার্মানিতে ১৯৭৪ বিশ্বকাপ: আর্জেন্টিনা ২–৩ পোল্যান্ড
১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে বাছাইপর্ব পার করতে পারেনি আর্জেন্টিনা, সেটিই এখন পর্যন্ত এমন একমাত্র ঘটনা। পরের বিশ্বকাপের শুরুটাও তাদের জন্য হয় হার দিয়ে। অবশ্য ইতালি ও হাইতির বিপক্ষে ভালো করে পরের রাউন্ডে গেলেও নেদারল্যান্ডস, ব্রাজিল ও পূর্ব জার্মানির কাছে হেরে দ্বিতীয় রাউন্ড থেকে বিদায় নেয় তারা।
আর্জেন্টিনায় ১৯৭৮ বিশ্বকাপ: আর্জেন্টিনা ২–১ হাঙ্গেরি
নিজেদের মাটিতে আয়োজিত একমাত্র বিশ্বকাপে বেশ কষ্টার্জিত জয় দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল তারা। ড্যানিয়েল বার্টোনির শেষ মুহূর্তের গোলে হাঙ্গেরির বিপক্ষে জয় পায় তারা। ফাইনালে নেদারল্যান্ডসকে ৩–১ গোলে হারিয়ে নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপ ট্রফি জেতে আর্জেন্টিনা। সেটিই ছিল আলবিসেলেস্তেদের প্রথম বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হওয়া।
স্পেনে ১৯৮২ বিশ্বকাপ: আর্জেন্টিনা ০–১ বেলজিয়াম
বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে খেলতে এসে প্রথম ম্যাচেই ধাক্কা খেয়েছিল আর্জেন্টিনা। ক্যাম্প ন্যু স্টেডিয়ামে এরউইন ভ্যান্ডেনবার্গের একমাত্র গোলে তাদের বিপক্ষে জয় পায় বেলজিয়াম। হাঙ্গেরি ও এল সালভাদরকে হারিয়ে পরের রাউন্ডে গেলেও দ্বিতীয় রাউন্ডে ইতালি ও ব্রাজিলের কাছে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যায় আর্জেন্টিনা।
মেক্সিকোতে ১৯৮৬ বিশ্বকাপ: আর্জেন্টিনা ৩–১ দক্ষিণ কোরিয়া
ডিয়েগো ম্যারাডোনার বিশ্বকাপ জেতার টুর্নামেন্টটিও আর্জেন্টিনা শুরু করেছিল জয় দিয়েই। মেক্সিকো সিটির অলিম্পিক স্টেডিয়ামে হোর্হে ভালদানোর দুটি ও অস্কার রুগারির গোলে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে জয় পায় তারা। এই বিশ্বকাপের ফাইনালে আজতেকা স্টেডিয়ামে জার্মানিকে ৩–২ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা।
ইতালিতে ১৯৯০ বিশ্বকাপ: আর্জেন্টিনা ০–১ ক্যামেরুন
১৯৮২ সালের মতোই এবারও শিরোপা ধরে রাখার মিশনে নেমে প্রথম ম্যাচেই বড় অঘটনের শিকার হয় আর্জেন্টিনা। ফ্রাঁসোয়া ওমাম–বিয়িকের গোলে আর্জেন্টিনাকে স্তব্ধ করে দেয় ক্যামেরুন। তবে আর্জেন্টিনা সেবারও ফাইনাল খেলেছিল। কিন্তু আন্দ্রেয়াস ব্রেহমের পেনাল্টি গোলে জার্মানির কাছে ১–০ ব্যবধানে হেরে রানার্স-আপ হতে হয় তাদের।
যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৯৪ বিশ্বকাপ: আর্জেন্টিনা ৪–০ গ্রিস
মাঠজুড়ে ম্যারাডোনার জাদুকরী উপস্থিতি ও গোল করার পর ক্যামেরার সামনে এসে তাঁর সেই বুনো উদযাপনের ম্যাচ এটা। গ্রিসকে উড়িয়ে দেওয়ার ম্যাচে হ্যাটট্রিক করেন গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতাও। তবে এই বিশ্বকাপের মাঝপথেই আসে সেই অন্ধকার অধ্যায়—ডোপ টেস্টে পজিটিভ হন ম্যারাডোনা। এই ধাক্কার পর ফেভারিট আর্জেন্টিনা রোমানিয়ার কাছে ৩–২ গোলে হেরে বিদায় নেয় দ্বিতীয় রাউন্ডে।
ফ্রান্সে ১৯৯৮ বিশ্বকাপ: আর্জেন্টিনা ১–০ জাপান
ওই বিশ্বকাপেই প্রথমবারের মতো অংশ নেওয়া জাপানের বিপক্ষে জিততে বেশ কষ্টই করতে হয়েছিল আর্জেন্টিনাকে। কঠিন হয়ে ওঠা ম্যাচটির ডেডলক ভাঙেন গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা। তবে আর্জেন্টিনার তৃতীয় শিরোপার স্বপ্ন কোয়ার্টার ফাইনালেই শেষ হয়ে যায় নেদারল্যান্ডসের কাছে ২–১ গোলে হেরে।
কোরিয়া–জাপানে ২০০২ বিশ্বকাপ: আর্জেন্টিনা ১–০ নাইজেরিয়া
এবারও বাতিস্তুতার একমাত্র গোলে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে জয় পায় আর্জেন্টিনা। এই টুর্নামেন্টে তাদের জন্য একমাত্র স্বস্তি ছিল নাইজেরিয়ার বিপক্ষে জয়টিই। মার্সেলো বিয়েলসার অধীনে বাছাইপর্বে দুর্দান্ত খেলে ফেবারিট হিসেবে আসা দলটি ইংল্যান্ডের কাছে হেরে ও সুইডেনের সঙ্গে ড্র করে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়।
জার্মানিতে ২০০৬ বিশ্বকাপ: আর্জেন্টিনা ২–১ আইভরি কোস্ট
এবার বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে তাদের প্রতিপক্ষ ছিল নবাগত আইভরি কোস্ট। হার্নান ক্রেসপো ও হাভিয়ের স্যাভিয়োলার গোলে আর্জেন্টিনা ২–০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়, পরে দিদিয়ে দ্রগবা একটি গোল শোধ করলেও জয় পায় আলবিসেলেস্তেই। এই বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে স্বাগতিক জার্মানির কাছে পেনাল্টি শুটআউটে হেরে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা।
দক্ষিণ আফ্রিকায় ২০১০ বিশ্বকাপ: আর্জেন্টিনা ১–০ নাইজেরিয়া
টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে আফ্রিকান প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয় আর্জেন্টিনা। জোহানেসবার্গের এলিস পার্ক স্টেডিয়ামে নাইজেরিয়ান গোলরক্ষক ভিনসেন্ট এনিয়েমা দেয়াল হয়ে দাঁড়ালেও গ্যাব্রিয়েল হাইনসের দুর্দান্ত হেডে ম্যাচের একমাত্র গোলটি পায় তারা। তবে আগের আসরের মতোই কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে ৪–০ গোলের বড় ব্যবধানে হেরে বিদায় নিতে হয়। এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার কোচের দায়িত্বে ছিলেন কিংবদন্তি ম্যারাডোনা।
ব্রাজিল ২০১৪ বিশ্বকাপ: আর্জেন্টিনা ২–১ বসনিয়া
এই বিশ্বকাপেই প্রথমবারের মতো খেলে বসনিয়া। ম্যাচের শুরুতেই আত্মঘাতী গোল ও পরে লিওনেল মেসির দর্শনীয় গোলে আর্জেন্টিনা এগিয়ে যায়। তবে বেদাদ ইবিসেভিচের গোল ম্যাচে কিছুটা রোমাঞ্চ ছড়িয়েছিল বসনিয়ার পক্ষে। আলেহান্দ্রো সাবেলার অধীনে আর্জেন্টিনা ফাইনালে উঠলেও অতিরিক্ত সময়ে মারিও গোৎজের গোলে জার্মানির কাছে শিরোপা হারায় আর্জেন্টিনা।
রাশিয়া ২০১৮ বিশ্বকাপ: আর্জেন্টিনা ১–১ আইসল্যান্ড
আইসল্যান্ডের বিপক্ষে সার্জিও আগুয়েরো গোল করলেও আলফ্রেড ফিনবোগাসনের গোল ও লিওনেল মেসির পেনাল্টি মিসের কারণে ম্যাচটি ড্র হয়। হোর্হে সাম্পাওলির দলের পতনের শুরু ওখানেই। গ্রুপ পর্ব পার হলেও শেষ ষোলোতে ফ্রান্সের কাছে ৪–৩ ব্যবধানে হেরে বিদায় নেয় তারা।
কাতারে ২০২২ বিশ্বকাপ: আর্জেন্টিনা ১–২ সৌদি আরব
আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপের এই প্রথম ম্যাচটির ধাক্কার স্মৃতিটা বেশ তরতাজাই। লিওনেল মেসির পেনাল্টি গোলে ম্যাচের শুরুটা সহজ মনে হলেও সালেহ আল–শেহরি ও সালেম আল–দাওসারির গোলে জয় ছিনিয়ে নেয় সৌদি আরব। এই হারে আর্জেন্টিনার টানা ৩৬ ম্যাচের অপরাজিত থাকার রেকর্ড ভেঙে যায়। পরের ঘটনাটা সবারই জানা—ফাইনালে ফ্রান্সকে হারিয়ে বিশ্বকাপ জেতে আর্জেন্টিনা।
সার্বিক পরিসংখ্যান
বিশ্বকাপে সবমিলিয়ে ১৮টি উদ্বোধনী ম্যাচের ১১টিতেই জয় পেয়েছে আর্জেন্টিনা, ছয়টিতে হেরেছে এবং একটি ড্র করেছে। সবমিলিয়ে এই ম্যাচগুলোতে তারা গোল করেছে ২৭টি, হজম করেছে ১৯টি। শুধু ১৯৮২ ও ১৯৯০ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে তারা গোল করতে পারেনি।



