‘দরকার হলে আমি ১০ গুণ বেশি পরিশ্রম করে দেখাব।’ ২০২৪ সালের ব্যালন ডি’অর অনুষ্ঠানের রাতে বলেছিলেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। শান্ত কণ্ঠে, কিন্তু চোখে আগুন নিয়ে। একটা ট্রফি না পাওয়ার ক্ষোভ থেকে বলা কথা ভেবে উড়িয়ে দেওয়া যেত সহজেই। কিন্তু ভিনিসিয়ুসকে যাঁরা চেনেন, তাঁরা জানেন, ওটা স্রেফ আবেগের বাষ্প ছিল না। ছিল একটা প্রতিশ্রুতি, নিজের কাছে।
সেবার পুরস্কারটা গিয়েছিল রদ্রির হাতে। অনেকেই মনে করেন, ন্যায্যই ছিল। কিন্তু যদি ভিনিসিয়ুস পেতেন, সেটা নিয়েও কেউ বিশেষ আপত্তি তুলতেন না। রিয়াল মাদ্রিদে তাঁর সেই মৌসুম ছিল অসামান্য—লা লিগা ও চ্যাম্পিয়নস লিগ একসঙ্গে জেতা, দুর্দান্ত ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স।
তাহলে কোথায় হোঁচট খেয়েছিলেন? জাতীয় দলের হয়ে। ২০২৪ কোপা আমেরিকায় ভিনিসিয়ুসের দরকার ছিল জ্বলে ওঠার। পারেননি। দুই হলুদ কার্ডের কারণে উরুগুয়ের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে ছিলেন না মাঠে। ব্রাজিল হেরেছিল পেনাল্টিতে। গ্যালারি থেকে দেখেছিলেন সব। পরে বলেছিলেন, এটা তাঁর দোষ। সেই মুহূর্তটা হওয়ার কথা ছিল তাঁর ব্রাজিল-মুহূর্ত। হয়নি।
দুই বছর পর। এখনো ব্যালন ডি’অর জেতা হয়নি ভিনির। বিশ্বকাপ এসেছে, সুযোগও এসেছে তাঁর।
এমনিতে ক্লাবে ভিনির গল্পটা উত্তরোত্তর উন্নতির। মাদ্রিদে গিয়েছিলেন কাঁচা, অপরিচিত এক ব্রাজিলিয়ান হিসেবে। কয়েক মৌসুমের মধ্যে হয়ে উঠলেন লা লিগার সেরা, বিশ্বের সেরাদের একজন। কিন্তু ব্রাজিলের হলুদ জার্সিতে সেই রূপান্তরটা হয়নি।
আগামীকাল ভোরে মরক্কো ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ মিশন শুরু করবে ব্রাজিল। ৪৯ ম্যাচে গোল মাত্র ৯টি। এর মধ্যে ৬টি আবার প্রীতি ম্যাচে। বাকি ৩টির মধ্যে ২টি এসেছে কোপা আমেরিকায় প্যারাগুয়েকে গোলবন্যায় ডোবানোর সময়। ৯টি অ্যাসিস্ট আছে, সত্যি। কিন্তু টুর্নামেন্টে মাত্র ২টি। তার মানে একটাই, বড় মঞ্চে এলেই নিভে যায় ভিনির আলো।
এর পেছনে কৌশলগত কারণও আছে। নেইমার যখন থেকে চোটে ভুগছেন, তখন থেকে ‘সব দায়িত্ব ভিনির’, এই ফর্মুলায় চলছে ব্রাজিল। প্রতিপক্ষেরও রেসিপিটা জানা। দুজন দিয়ে আটকাও, সুযোগ পেলে লাথি মারো। অর্ধেক গজ জায়গাও নেই নিশ্বাস নেওয়ার। হতাশা আসে, মাথা গরম হয়, গোলের সুযোগ মাঠে পড়ে থাকে।
একাকিত্বের বোঝা
অতীতের ব্রাজিলে এই একাকিত্ব ছিল না। রোনালদিনহোকে থামালে রোনালদো নাজারিও ছিলেন। কাকাকে আটকালেও আদ্রিয়ানো। তারকার ভার ভাগ করে নেওয়ার মতো মানুষ ছিল দলে। এখন নেই।
নেইমারের কথাই ধরুন। অনেক বিতর্ক, অনেক সমালোচনা, কিন্তু তাঁর একটা গুণ ছিল নির্বিবাদ। ব্রাজিলের জার্সিতে তিনি জ্বলে ওঠেন। পেলের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড তো আর এমনি এমনি ভাঙেননি। গোল করার অভ্যাস আছে তাঁর। ২০১৪ বিশ্বকাপে কলম্বিয়ান জুনিয়া তাঁর মেরুদণ্ড ভেঙে না দিলে গল্পটা হয়তো অন্য রকম হতো।
কিন্তু এখন সেই নেইমার চোটের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছেন। ২০২৩ সালের অক্টোবরে এসিএল ছিঁড়ে গেছে। শেষের শুরু হয়ে গেছে। কৈশোরের ক্লাব সান্তোসে ফেরার আবেগের গল্পটুকু আছে, কিন্তু বারবার পেশির সমস্যা মাথাচাড়া দিচ্ছে। বিশ্বকাপ স্কোয়াডে আছেন ঠিকই, তবে চোটের কারণে মরক্কোর বিপক্ষে আজ খেলতে পারবেন না নিশ্চিত। গ্রুপে পরের ম্যাচগুলো খেলতে পারেন কি না, সেটাও প্রশ্ন।
সঙ্গী কে?
ভিনির পাশে দাঁড়ানোর মতো তাহলে কেউ কি নেই? রাফিনিয়া আছেন। বার্সেলোনায় পুনর্জন্ম নিয়েছেন, লামিনে ইয়ামালের পাশে চমৎকার ‘কমপ্লিমেন্টারি পিস’। গোল করেন, অ্যাসিস্টও। কিন্তু রাফিনিয়া সেই ধরনের খেলোয়াড়, যিনি দলের মেশিনে কলকবজা হতে পারেন, একা পুরো যন্ত্রটা চালাতে পারেন না।
এনদ্রিক লিওঁতে দারুণ মৌসুম কাটিয়ে ফিরেছেন জাতীয় দলে। রদ্রিগো, এত মেধা থাকার পরও কোথায় যেন হারিয়ে গেলেন, চোটে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকেও গেছেন। এবার ভিনি সত্যিই একা। ব্রাজিলের কিংবদন্তিরা অবশ্য তাঁর পাশে আছেন। ‘ভিনিসিয়ুস সত্যিই দারুণ একটা মৌসুম কাটিয়েছে’, বলেছেন কাকা, ‘কিন্তু রিয়াল কিছু জেতেনি বলে সবাই মনে করছে তাঁর মৌসুমটা ব্যর্থ।’
আনচেলত্তির ভরসা
অন্য একটা কারণে এবার ভিনিকে নিয়ে একটু আশার আলো আছে। কার্লো আনচেলত্তি ব্রাজিলের কোচ। ভিনির কাছ থেকে সেরাটা বের করে আনার রেকর্ড তাঁর আছে, রিয়ালেই তো সেটা করেছেন। সম্প্রতি বলেছেন, ভিনির মধ্যে ব্রাজিলের কিংবদন্তি খেলোয়াড়দের মতো ‘বিশেষ গুণ’ আছে। বারবার তাঁকে জাতীয় দলে জ্বলে ওঠার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন। ভিনিসিয়ুস নিজেও জানেন, এবার ডেলিভারি দিতে হবে। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে বলেছিলেন, ‘যদি বিশ্বকাপে যাই, চার-পাঁচটা গোল করি, চ্যাম্পিয়ন হই, তাহলে পুরো গল্পটা পাল্টে যাবে। সবাই বলবে, যেসব ম্যাচে ভালো খেলিনি, সেগুলোতে আসলে বিশ্বকাপের জন্য নিজেকে তৈরি করছিলাম।’
আন্ডারডগ তকমা
এবারের বিশ্বকাপে ব্রাজিলকে ফেবারিট বলছেন না খুব বেশি মানুষ। স্পেন, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, আর্জেন্টিনার ভিড়ে তারা এক ধাপ পেছনেই বলা যায়। এই ‘আন্ডার ডগ’ তকমাটা হয়তো ভিনিসিয়ুসের জন্য আশীর্বাদ। কোপা আমেরিকায় চাপ ছিল অন্য রকম—ব্রাজিলকে জিততেই হবে। বিশ্বকাপে সেই চাপটা একটু হালকা।
আগামী ৪০ দিন হতে পারে ভিনির নিজেকে প্রমাণের সময়। সেই যে দুই বছর আগে ব্যালন ডি’অরের রাতে বলেছিলেন, ‘১০ গুণ’ করবেন। এবার সেই সময় এসেছে। বিশ্বকাপের মাঠ তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে। যেখানে গল্প লেখা হয় বা চিরতরে মুছে যায়।



