বিশ্বকাপ টিকিটের 'অযৌক্তিক' মূল্য নিয়ে ফিফার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে ইউরোপীয় সমর্থক জোট
বিশ্বকাপ টিকিটের 'অযৌক্তিক' মূল্য নিয়ে ফিফার বিরুদ্ধে মামলা

বিশ্বকাপ টিকিটের 'অযৌক্তিক' মূল্য নিয়ে ফিফার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে ইউরোপীয় সমর্থক জোট

২০২৬ বিশ্বকাপের টিকিটের আকাশচুম্বী দাম নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা দীর্ঘদিন ধরে চললেও এবার বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। ইউরোপের ফুটবল সমর্থকদের জোট 'ফুটবল সাপোর্টার্স ইউরোপ' (এফএসই) ফিফার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করে টিকিটের মূল্যকে 'অযৌক্তিক' দাবি করেছে। মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) এই মামলা দায়ের করা হয়, যা ফুটবল বিশ্বে নতুন বিতর্কের সূচনা করেছে।

টিকিটের দাম নিয়ে সমর্থকদের ক্ষোভ

২০২৬ সালের ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বিশ্বকাপে ৪৮ দল অংশ নেবে এবং মোট ১০৪টি ম্যাচ খেলা হবে। এফএসই এবং ইউরোকনজ্যুমারস গ্রুপ সরাসরি অভিযোগ করেছে যে, টিকিটের দাম মাত্রাতিরিক্তভাবে উচ্চ। তাদের মতে, ফিফা টিকিট বিক্রিতে নিজেদের একচেটিয়া ক্ষমতার অপব্যবহার করছে, যা প্রতিযোগিতামূলক বাজারে কখনোই গ্রহণযোগ্য হতো না।

এফএসইর একটি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, 'ফিফা ইউরোপীয় সমর্থকদের ওপর বিশ্বকাপের টিকিটের অযৌক্তিক দাম, অস্বচ্ছ ও অন্যায্য শর্ত চাপিয়ে দিচ্ছে। এই শর্তগুলো কোনোভাবেই ন্যায্য নয় এবং সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছে।'

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দামের তুলনামূলক বিশ্লেষণ

এফএসইর প্রদত্ত তথ্য অনুসারে, ২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালের টিকিটের সর্বনিম্ন দাম শুরু হয়েছে ৪,১৮৫ ডলার থেকে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা। এই দাম ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালের তুলনায় সাত গুণেরও বেশি! তুলনা করলে দেখা যায়, ইউরো ২০২৪-এর ফাইনালের সর্বনিম্ন টিকিটের দাম ছিল মাত্র ৯৫ ইউরো, যা বিশ্বকাপের দামের বিপরীতে অত্যন্ত স্বল্প।

ফিফার নিজস্ব দরপত্র নথিতে গড় টিকিটের দাম ১,৪০৮ ডলার ধরা হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে তা বহু আগেই সীমা ছাড়িয়ে গেছে। ফিফা ইতিমধ্যে প্রায় ৭০ লাখ টিকিট ছাড়ার কথা জানিয়েছে, তবে দামের ব্যাপারটি এখনো বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

টিকিট বিতরণ ও পুনর্বিক্রয় বাজার

একজন দর্শক এক ম্যাচের সর্বোচ্চ ৪টি এবং পুরো টুর্নামেন্টের ৪০টি টিকিট কিনতে পারবেন বলে ফিফা সূত্রে জানা গেছে। উত্তর আমেরিকার আয়োজক কমিটি প্রথমে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, মাত্র ২১ ডলার থেকে টিকিট পাওয়া যাবে, কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। উদাহরণস্বরূপ, ক্যালিফোর্নিয়ার লেভিস স্টেডিয়ামে গ্রুপ পর্বে অস্ট্রিয়া-জর্ডান ম্যাচের মতো অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ লড়াইয়ের টিকিটও বিক্রি হচ্ছে ৬০ ডলারে। বড় দলগুলোর ম্যাচের টিকিটের ন্যূনতম দাম ২০০ ডলারের নিচে নামছে না।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ৬০ ডলারের সস্তা টিকিটগুলো শুধু বিশ্বকাপে সুযোগ পাওয়া দলগুলোর সমর্থকদের জন্য সংরক্ষিত এবং তা প্রতিটি জাতীয় ফেডারেশনের বরাদ্দের মাত্র ১০ শতাংশ। এফএসই দাবি করেছে, 'সাধারণের জন্য সংরক্ষিত সেই টিকিটগুলো বিক্রির আগেই হাওয়া হয়ে যাচ্ছে, যা অত্যন্ত অস্বাভাবিক।'

সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা ঘটছে ফিফার নিজস্ব রিসেল বা পুনর্বিক্রয় সাইটে। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে হতে যাওয়া ফাইনালের একটি ক্যাটাগরি-৩ টিকিটের দাম হাঁকা হয়েছে ১ লাখ ৪৩ হাজার ৭৫০ ডলার! মূল দাম যেখানে ছিল মাত্র ৩,৪৫০ ডলার, সেখানে পুনর্বিক্রয় বাজারে দাম বেড়েছে ৪১ গুণেরও বেশি। বাংলাদেশি মুদ্রায় একটি টিকিটের দাম দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা, যা সাধারণ দর্শকদের জন্য অকল্পনীয়।

ফিফার প্রতিক্রিয়া ও সমর্থকদের প্রতিবাদ

টিকিটের এই অগ্নিমূল্য নিয়ে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর যুক্তি হলো—চাহিদা বেশি, তাই দামও বেশি। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজার অনুযায়ী তারা 'ডায়নামিক প্রাইসিং' বা পরিবর্তনশীল দামের নীতি অনুসরণ করছে, অর্থাৎ ম্যাচের গুরুত্ব ও চাহিদা অনুযায়ী টিকিটের দাম বাড়বে বা কমবে।

তবে সমর্থকদের দাবি, এই পদ্ধতির কোনো স্বচ্ছতা নেই। এফএসই উল্লেখ করেছে, এক ধাপ থেকে অন্য ধাপে যাওয়ার সময় টিকিটের দাম হুট করে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে এবং টিকিট কাটার প্রক্রিয়া শুরু করার আগে একজন সমর্থক জানতেই পারছেন না তাঁকে শেষ পর্যন্ত কত ডলার গুনতে হবে।

সব মিলিয়ে খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—এই উৎসব আসলে কার জন্য? সাধারণ ফুটবলপ্রেমী, নাকি শুধু ধনী দর্শকদের জন্য? এফএসইর মামলা এই বিতর্ককে আইনি মঞ্চে নিয়ে গেছে, যা বিশ্বকাপের ভবিষ্যৎ টিকিট নীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।