কলকাতার ফুটপাত থেকে শুরু করে বড় হাসপাতালের সামনে, সবখানেই গত কয়েক বছর ধরে একটি অতি পরিচিত দৃশ্য ছিল দীর্ঘ লাইন। ৫ রুপিতে ডাল-ভাত আর ডিমের ঝোল পেতে দুপুর গড়ানোর আগেই ভিড় জমাতেন প্রান্তিক মানুষেরা। কিন্তু সেই চেনা ছবিটা হঠাৎই বদলে গেছে। অনিশ্চয়তার মেঘ ঘনিয়ে আসায় কলকাতার অন্তত ৫০টি ‘মা’ ক্যান্টিন বন্ধ হয়ে গেছে।
প্রকল্পের শুরু ও স্থগিতাদেশ
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে করোনাকালে দরিদ্র মানুষের খাদ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এই প্রকল্প চালু করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে সরকার পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থমকে গেছে এই জনপ্রিয় উদ্যোগ। ক্যান্টিনগুলো পরিচালনাকারী কলকাতা পৌরসভা (কেএমসি) এবং বিভিন্ন এনজিও জানিয়েছে, রাজ্য সরকার থেকে খাদ্যসামগ্রী আসা বন্ধ হয়ে গেছে। চাল, ডাল, সবজি বা ডিমের নতুন কোনও সরবরাহ না থাকায় রান্নাঘর চালু রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
সরকারি কর্মকর্তার উদ্বেগ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সরকারি কর্মকর্তা জানান, নতুন বিজেপি সরকার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চালু করা এই প্রকল্পের বিলগুলোতে সই করবে কি না তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এনজিওর বক্তব্য
একটি এনজিওর সদস্য জানান, তারা প্রতিদিন আট হাজার মানুষের জন্য রান্না করতেন। কিন্তু শুক্রবার থেকে সব রসদ ফুরিয়ে যাওয়ায় তারা রান্না বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন। এসএসকেএম হাসপাতালের ভেতরকার দুটি ক্যান্টিন, কালীঘাট ব্রিজের পাশের ক্যান্টিন এবং ভবানীপুরের পূর্ণা সিনেমার সামনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলো এখন জনশূন্য।
সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ
শনিবারই নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীর শপথ নিয়েছেন। এই রাজনৈতিক ডামাডোলের মাঝে সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন সেই সাধারণ মানুষগুলো, যাদের দুপুরের ভরসা ছিল এই ৫ রুপির থালি। পূর্ণা সিনেমার সামনে কাজ করা এক মুচি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমি প্রায়ই এখান থেকে দুপুরের খাবার খেতাম। মাত্র ৫ রুপিতে পেট ভরে খাওয়া যেত। আমাদের মতো অনেক মানুষ এই ক্যান্টিনের ওপর নির্ভরশীল, এটি বন্ধ করা একদম ঠিক হবে না।’
ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
সরবরাহকারী সংস্থাগুলো এনজিওদের জানিয়েছে, রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে তারা নতুন কোনও কাজের আদেশ পায়নি। আপাতত সোমবার বা মঙ্গলবার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে। সেদিনই হয়তো জানা যাবে, ৫ রুপির এই ‘মা’ ক্যান্টিনগুলো আবার খুলবে নাকি রাজনৈতিক পালাবদলের হাওয়ায় চিরতরে হারিয়ে যাবে ইতিহাসের পাতায়।
প্রকল্পের বিস্তৃতি
গত পাঁচ বছর ধরে দুপুর ১২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত চলা এই ক্যান্টিনগুলোতে চাহিদার চাপে ৩টার অনেক আগেই খাবার শেষ হয়ে যেত। কলকাতা ছাড়িয়ে রাজ্যের অন্যান্য পৌরসভাতেও এই প্রকল্প ছড়িয়ে পড়েছিল। এখন সেই উনুনগুলো ফের জ্বলবে কি না, সেই উত্তর খুঁজছেন তিলোত্তমার শত শত ক্ষুধার্ত মানুষ।



