হারেও সম্মান পেলেন নারী ফুটবলাররা, নতুন স্বপ্ন দেখার প্রতিশ্রুতি
হারেও সম্মান পেলেন নারী ফুটবলাররা, নতুন স্বপ্ন দেখার প্রতিশ্রুতি

শিরোপা জিতলে বিমানবন্দরে ফুল থাকে, থাকে ক্যামেরার ঝলকানি। বিজয়ীদের ঘিরে তৈরি হয় উল্লাসের মঞ্চ, প্রশংসার ঢেউ আর অভিনন্দনের বন্যা। কিন্তু হারের পর সেই দৃশ্য বদলে যায়। অনেক মুখ হারিয়ে যায়, অনেক প্রতিশ্রুতি পূরণ হয় না। গোয়া থেকে রানার্সআপ হয়ে ফেরা বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের জন্য মঙ্গলবারের বিকেলটা ছিল কিছুটা ব্যতিক্রমী।

আরব সাগরের তীরে হ্যাটট্রিক শিরোপার স্বপ্ন ভেঙে দেশে ফিরেছে মারিয়া মান্দাদের দল। চোখে এখনও ফাইনালের আক্ষেপ, বুকের ভেতর এখনও অপূর্ণতার হাহাকার। তবু দেশে ফিরে তারা পেল সম্মান। মঙ্গলবার দুপুরে গোয়া থেকে ঢাকায় ফিরে বিমানবন্দর থেকে সরাসরি বাফুফে ভবনে যান ফুটবলাররা। সেখানে তাদের সঙ্গে দেখা করেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক।

হারের বেদনায় ভারাক্রান্ত মেয়েদের সামনে দাঁড়িয়ে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বললেন, ‘দেশের জন্য লড়াই করা যোদ্ধাদের মূল্য শুধু ট্রফি দিয়ে মাপা যায় না।’ বাফুফে ভবনের পরিবেশ তখন অন্যরকম। কয়েক ঘণ্টা আগেও যারা আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের পতাকা বুকে নিয়ে লড়াই করেছে, তারা বসে আছে নীরবে। ফাইনালের স্মৃতি তখনও তাজা। ভারতের বিপক্ষে হার, হাতছাড়া হওয়া শিরোপা আর অপূর্ণ স্বপ্নের ভার যেন এখনও তাদের কাঁধে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সেই মুহূর্তে আমিনুল হক জানালেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নারী ফুটবলারদের ছবি পত্রিকায় দেখেছেন। তার নির্দেশনাতেই আমি এখানে এসেছি। শুধু জিতলেই সংবর্ধনা হবে, এমন নয়। হারলেও খেলোয়াড়দের পাশে দাঁড়াতে হয়। দেশের জন্য যারা লড়াই করে, তাদের প্রতি সম্মান সবসময় একই থাকা উচিত।’ প্রতিমন্ত্রীর কথা শুনে উপস্থিত নারী ফুটবলারদের চোখেমুখে ফুটে ওঠে স্বস্তির ছাপ।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এই দলের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারকাদের একজন ঋতুপর্ণা চাকমা। মাঠে তার পায়ের জাদু বাংলাদেশের অসংখ্য জয় এনে দিয়েছে। প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ভেঙে গোল করার ক্ষমতা তাকে দেশের নারী ফুটবলের অন্যতম প্রতীক বানিয়েছে। অথচ মাঠের বাইরের জীবনটা এখনও সংগ্রামের। রাঙামাটির পাহাড়ি জনপদে ঋতুপর্ণার পরিবারের জীবনযাত্রা নিয়ে বহুবার আলোচনা হয়েছে। দেশের জন্য একের পর এক সাফল্য এনে দেওয়া এই ফুটবলারের বাড়ির প্রসঙ্গ টেনে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জানান, ‘সরকার থেকে দেওয়া জমি সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঋতুপর্ণা ছুটি শেষে ফিরে এলে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে তাকে আর্থিক সহায়তার চেক দেওয়া হবে।’

গত কয়েক মাস ধরে বিশ্রাম বলতে কিছু ছিল না বাংলাদেশের নারী ফুটবল দলের। একের পর এক টুর্নামেন্ট, প্রস্তুতি ক্যাম্প, আন্তর্জাতিক ম্যাচ আর দীর্ঘ সফরে কেটেছে সময়। এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বের সাফল্যের পর সাফের মঞ্চেও নিজেদের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছে মেয়েরা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্বপ্ন আর বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে গেছে ভারতের বাধা। এবার কিছুদিনের জন্য ছুটি পাচ্ছেন ফুটবলাররা। পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার সুযোগ মিলছে। কেউ ফিরবেন পাহাড়ে, কেউ সমতলে, কেউবা গ্রামের মাটিতে। হয়তো কয়েকদিনের জন্য ভুলে থাকার চেষ্টা করবেন গোয়ার সেই রাতের কথা।

অন্যদিকে দলের ব্রিটিশ কোচ পিটার বাটলারও বুধবার ইংল্যান্ডে ফিরে যাচ্ছেন। তার সঙ্গে নতুন চুক্তি নিয়ে কোনো সুরাহা হয়নি। আপাতত তিনি পরিবারকে সময় দেবেন। সেপ্টেম্বরে এশিয়ান গেমস সামনে রেখে আবারও মাঠে ফিরবে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ নারী ফুটবলের ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়গুলোর রচয়িতা এই দল। ২০২২ সালে প্রথমবার সাফ চ্যাম্পিয়ন হয়ে ইতিহাস গড়েছিল তারা। ২০২৪ সালে সেই সাফল্যের পুনরাবৃত্তি করে প্রমাণ করেছে তারাই সেরা। এবার হ্যাটট্রিকের স্বপ্ন পূরণ হয়নি, কিন্তু দুইবারের চ্যাম্পিয়নদের সম্মান মুছে যায়নি। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ চলাকালেই দলের ডিফেন্ডার শিউলি আজিম হারিয়েছেন তার মাকে। জাতীয় দলের দায়িত্ব পালনের কারণে মায়ের শেষ মুখটিও দেখতে পারেননি তিনি। দেশের জার্সি গায়ে নিজের শোককে চাপা দিয়ে মাঠে নেমেছিলেন। সেই ত্যাগের প্রতি সম্মান জানিয়ে বাফুফে ভবনে শিউলির মায়ের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

ট্রফি এবার আসেনি। কিন্তু এই মেয়েরা এখনও লাখো মানুষের ভালোবাসা, গর্ব আর বিশ্বাসের নাম। বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল এখন নতুন পথচলার অপেক্ষায়। নতুন কোনো বিজয়ের আলোয় লেখা হবে বাংলাদেশের নাম।