পেদ্রি: স্পেনের বিশ্বকাপ স্বপ্নের মূল চাবিকাঠি
পেদ্রি: স্পেনের বিশ্বকাপ স্বপ্নের মূল চাবিকাঠি

স্প্যানিশ ফুটবলের ইতিহাসে মাঝমাঠ সবসময়ই দলের প্রাণভোমরা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। একসময় আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, জাভি হার্নান্দেজ, জাভি আলোনসো ও সেস ফ্যাব্রিগাসরা সেই দায়িত্ব পালন করেছেন। সময়ের বিবর্তনে কিংবদন্তিরা আলোচনার কেন্দ্র থেকে সরে গেলেও স্পেনের ফুটবল দর্শন অপরিবর্তিত রয়েছে। বর্তমানে সেই উত্তরাধিকার বহন করছেন পেদ্রি। মাত্র ২৩ বছর বয়সে তিনি স্পেন ও বার্সেলোনার অন্যতম নির্ভরতার প্রতিকে পরিণত হয়েছেন।

বার্সেলোনার হৃদস্পন্দন

স্পেনের দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব লাস পালমাসে প্রতিভার ঝলক দেখিয়েই বড় মঞ্চে পা রাখেন পেদ্রি। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে বার্সেলোনার জার্সিতে অভিষেকের পর খুব দ্রুতই তিনি কাতালান ক্লাবটির খেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠেন। বার্সেলোনার সঙ্গে তার সম্পর্ক শুধু পেশাগত নয়, পারিবারিকও। ১৯৯৪ সালে, পেদ্রির জন্মের আট বছর আগে, তার দাদা তেনেরিফেতে একটি বার্সেলোনা সমর্থক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরে তার বাবা সেই সংগঠনের সভাপতি হন। বর্তমানে সেটির নাম ‘পেনিয়া বার্সেলোনিস্তা দে তেনেরিফে – পেদ্রি গনসালেস’। পেদ্রি নিজেই এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তাদের বাড়ির প্লেট ও পায়েয়া পরিবেশনের পাত্রেও বার্সেলোনার রং ছিল।

বার্সেলোনার ঐতিহ্যবাহী ‘টিকি-টাকা’ ফুটবলে পেদ্রি যেন নতুন যুগের প্রতিনিধি। ইতোমধ্যে ক্লাবটির হয়ে প্রায় আড়াইশ ম্যাচ খেলেছেন তিনি। সেই সঙ্গে জিতেছেন তিনটি লা লিগা, দুটি কোপা দেল রে এবং তিনটি স্প্যানিশ সুপার কাপ। পেদ্রি সম্পর্কে সাবেক বার্সেলোনা কোচ জাভি হার্নান্দেজ বলেন, “প্রতিভার বিচারে আমি তার মতো আর কাউকে দেখিনি। সে আমাকে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার কথা মনে করিয়ে দেয়। যদি শুধুই প্রতিভার কথা বলি, তাহলে সে বিশ্বের সেরা ফুটবলার।”

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আন্তর্জাতিক মঞ্চে দ্রুত উত্থান

বার্সেলোনায় প্রথম মৌসুম শেষ করেই ইউরো ২০২০-এ স্পেনের হয়ে আলো ছড়ান পেদ্রি। টুর্নামেন্টে তার পারফরম্যান্স অনেককে বিস্মিত করেছিল। স্পেনকে সেমিফাইনালে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন, যদিও শেষ পর্যন্ত ইতালির কাছে টাইব্রেকারে হার মানতে হয় স্পেনকে। এরপর ২০২২ কাতার বিশ্বকাপেও ছিলেন স্পেনের মাঝমাঠের অন্যতম ভরসা। টুর্নামেন্টে দলের চারটি ম্যাচেই শুরুর একাদশে ছিলেন তিনি। যদিও শেষ ষোলোতে মরক্কোর কাছে টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নেয় স্পেন। চোট-আঘাতের সঙ্গে লড়াই করেও ২০২৪ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে স্পেনের শিরোপা জয়ের পথে অবদান রাখেন এ মিডফিল্ডার।

পেদ্রির উত্থান

পেদ্রির ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই রয়েছে একের পর এক রেকর্ড। ২০১৯ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে লাস পালমাসের হয়ে পেশাদার ফুটবলে অভিষেক। অভিষেকের এক মাস পরই ক্লাব ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা হওয়ার কীর্তি। ২০২০ সালে বার্সেলোনার হয়ে লা লিগা ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগে অভিষেক। ইউরো ২০২০-এ মাঠে নেমে ইউরো কিংবা বিশ্বকাপে স্পেনের হয়ে খেলা সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হওয়ার রেকর্ড। ২৩ বছর বয়সেই জাতীয় দলের হয়ে ৪০টির বেশি ম্যাচ এবং বার্সেলোনার হয়ে প্রায় ২৫০ ম্যাচ খেলার মাইলফলক।

২০২৬ বিশ্বকাপে স্পেনের প্রত্যাশা

বর্তমান স্পেন দলে অভিজ্ঞতা ও তরুণ প্রতিভার দুর্দান্ত সমন্বয় রয়েছে। রদ্রি, ফাবিয়ান রুইস, মিকেল মেরিনো ও মার্তিন সুবিমেন্দির মতো মিডফিল্ডারদের সঙ্গে পেদ্রি গড়ে তুলেছেন শক্তিশালী এক কেন্দ্রভাগ। অন্যদিকে আক্রমণে রয়েছেন বিস্ময়বালক লামিন ইয়ামাল। এ ভারসাম্যপূর্ণ দলটিকে ইতোমধ্যেই ২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম শিরোপা প্রত্যাশী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে স্পেনের স্বপ্ন কতদূর যাবে, তার বড় একটি উত্তর লুকিয়ে আছে পেদ্রির পারফরম্যান্সে। যদি তিনি নিজের সেরা ছন্দে থাকেন, তাহলে স্পেনের জন্য নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপ ফাইনালের পথ অনেকটাই মসৃণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ আধুনিক ফুটবলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ যাদের হাতে থাকে, জয়ও অনেক সময় তাদের দিকেই ঝুঁকে পড়ে। আর সেই নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ক্ষমতা পেদ্রির আছে বলেই তাকে ঘিরে স্পেনের প্রত্যাশাও এতটা আকাশছোঁয়া।

এবারের বিশ্বকাপে ১৪ জুন কেপ ভার্দের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে স্পেন। ‘এইচ’ গ্রুপে তাদের অন্য দুই প্রতিপক্ষ সৌদি আরব এবং উরুগুয়ে। অভিজ্ঞ নেতৃত্ব ছাড়াই তরুণ এ দলটি বিশ্বকাপে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।