১৯৯০ বিশ্বকাপের আসর বসেছিল ইতালিতে। এককথায় বলতে গেলে কোনো প্রতিযোগিতা ছাড়াই বিশ্বকাপের আসর নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে নিয়েছিল তারা। কারণ, তাদের প্রতিপক্ষ ছিল একমাত্র সোভিয়েত ইউনিয়ন। কিন্তু ১৯৮৪ অলিম্পিক বয়কট আর সোভিয়েত ভাঙনের সুর যত ঘনিয়ে আসছিল, বিশ্বকাপের আয়োজক হিসেবে তাদের প্রতি তত আস্থা কমছিল। অন্যরা আগেই নাম তুলে নেওয়ায় একমাত্র দেশ হিসেবে বাকি থাকে ইতালি। ফলে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ আয়োজনের সুযোগ পায় তারা। তবে বিশ্বকাপের ১৪তম আসরের শুরুই হয়েছিল চমক দিয়ে।
ক্যামেরুনের স্বপ্নযাত্রা
বিশ্বজয়ী আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে চমক দেখায় ক্যামেরুন। এমনকি রোমানিয়াকে হারিয়ে পৌঁছে যায় রাউন্ড অব সিক্সটিনে। সেখানে কলম্বিয়াকে হারিয়ে বিশ্বকাপের ডার্ক হর্স হয়ে ওঠে ক্যামেরুন। সেই সঙ্গে ৩৮ বছর বয়সী রজার মিলারের নাচ মন কেড়ে নিয়েছিল সবার। কোয়ার্টার ফাইনালে গিয়ে শেষ হয় সেই স্বপ্নযাত্রা। আর তাদের স্বপ্নযাত্রা থামিয়ে দেয় ইংল্যান্ড।
হলি ওয়াটার কেলেঙ্কারি
অন্যদিকে ক্যামেরুনের কাছে হারলেও মাত্র ৩ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপে তৃতীয় হয়ে ফাইনালের পথে পা বাড়ায় আর্জেন্টিনা। রাউন্ড অব সিক্সটিনে মুখোমুখি হয় ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা। আর সেখানেই সৃষ্টি হয় বিতর্কের। ‘হলি ওয়াটার কেলেঙ্কারি’-তে জড়িয়ে পড়েন আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়েরা। ঘটনার সূচনা ম্যাচের প্রথমার্ধে। আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়ের চোটে সেবা করতে মাঠে আসেন আর্জেন্টাইন ফিজিও। সেখান থেকে একটি বোতল চেয়ে নিয়ে পানি পান করেন ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডার ব্রাঙ্কো। কিন্তু এর পরপরই কেমন যেন ক্লান্ত বোধ করতে থাকেন তিনি। সেই ব্রাঙ্কোর পাশ দিয়েই ম্যাচের একমাত্র গোল দিয়েছিলেন ক্যানিজিয়া। ঘটনার ১৫ বছর পর এসে ম্যারাডোনা নিজেই স্বীকার করেন সেদিনের এই কেলেঙ্কারির ঘটনা। ব্রাজিলকে ১-০ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে চলে যায় আর্জেন্টিনা।
গয়কোচিয়ার নায়কত্ব
কোয়ার্টার-সেমি দুটোতেই আর্জেন্টিনার ভাগ্য নিষ্পত্তি হয় টাইব্রেকারে। কোয়ার্টারে যুগোস্লাভিয়া আর সেমিতে ইতালি। দুই দলই ম্যারাডোনাকে বোতলবন্দী করে রেখেছিল বটে, কিন্তু সবাইকে ছাড়িয়ে ম্যাচের রাজা হয়ে ওঠেন গোলরক্ষক সার্জিও গয়কোচিয়া। পরপর দুই ম্যাচে টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনাকে একা হাতে জেতান তিনি।
ফাইনাল: জার্মানির তৃতীয় শিরোপা
১৯৮৬ বিশ্বকাপের মতো ফাইনালে আবারও মুখোমুখি পশ্চিম জার্মানি আর আর্জেন্টিনা। এবারে প্রেক্ষাপটটা ভিন্ন। ফর্মের তুঙ্গে পশ্চিম জার্মানি দল। গ্রুপে যুগোস্লাভিয়া, নকআউটে এসে নেদারল্যান্ডস, চেকোস্লাভিয়া, ইংল্যান্ডের মতো দলকে হারিয়ে ফাইনালে তারা। অন্যদিকে ম্যারাডোনাও নেই তাঁর সেরা ফর্মে, ফাইনালে অনুপস্থিত ক্লদিও ক্যানিজিয়া। সব মিলিয়ে জার্মানির জন্য সুবর্ণ সুযোগ এবারের ফাইনালে। কোচ ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার আর কোনো ভুল করেননি। ম্যারাডোনাকে সামলানোর দায়িত্ব দিলেন গুইদো বুখভাল্ডের ওপর। একমুহূর্তের জন্য ম্যারাডোনাকে চোখের আড়াল হতে দেননি তিনি।
নিষ্প্রভ ম্যারাডোনা আর ক্যানিজিয়ার অনুপস্থিতির সুযোগটা কাজে লাগিয়েছেন পশ্চিম জার্মানি। তার ওপর যুক্ত হয়েছিল রেফারির ভুল সিদ্ধান্ত। ৬৫ মিনিটে ইয়ুর্গেন ক্লিন্সমানকে ফাউল করার কারণে লাল কার্ড দেখেন আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার পেদ্রো মোনজন, যেটা আসলে ফাউলই ছিল না। এমনকি ৮৫ মিনিটে রবার্তো সেনসিনির করা ফাউলে পেনাল্টি পায় পশ্চিম জার্মানি। রেফারির সঙ্গে বিতর্ক জড়িয়ে লাল কার্ড দেখেন আর্জেন্টাইন গুস্তাবো ডেজোত্তি। ৯ জনের দলে পরিণত হয় আর্জেন্টিনা। আর পেনাল্টি থেকে গোল করে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা ঘরে তোলে পশ্চিম জার্মানি।
একীভূত জার্মানির প্রতীক
যদিও নামে পশ্চিম জার্মানি বিশ্বকাপ জিতেছে, কিন্তু এটিই ছিল একীভূত জার্মানির অর্জন। কাগজে-কলমে পশ্চিম জার্মানি খেললেও তত দিনে বার্লিন দেয়ালের পতন হয়ে গিয়েছে। বাকি ছিল শুধু আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম। তাই বিশ্বকাপের পরপরই দুই জার্মানির ফুটবল দল এক হয়ে যায়। বার্লিন দেয়ালের পতনের আনন্দ দ্বিগুণ হয় জার্মানির বিশ্বজয়ে। পৃথিবীর সামনে জার্মানি আবারও নিজেদের নাম উজ্জ্বল করে ‘জায়ান্ট হান্টার’ হিসেবে।



