বিসিবির শাস্তিতে অসন্তুষ্ট জাহানারা আলম, প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর কাছে বিচার দাবি
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) নারী ক্রিকেটার জাহানারা আলমের করা যৌন হয়রানির অভিযোগে সাবেক ক্রিকেটার মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জুকে শাস্তি দিয়েছে। মঞ্জুকে ক্রিকেটের সকল কার্যক্রম থেকে দূরে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে, এই শাস্তিতে সন্তুষ্ট নন ভুক্তভোগী জাহানারা আলম। তিনি আজ শনিবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে একটি পোস্ট করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের কাছে তিনটি অনুরোধ জানিয়েছেন এবং বিচার দাবি করেছেন।
জাহানারা আলমের অভিযোগ ও দাবি
জাহানারা আলম তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, “ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক ভাইয়া, আমি আজ আপনার কাছে তিনটি অনুরোধ নিয়ে এসেছি। দয়া করে আমার অনুরোধগুলো বিবেচনা করে যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন বলে আশা করছি।” তিনি উল্লেখ করেছেন যে বিসিবি একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে এবং তদন্ত রিপোর্টে মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জুকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। শাস্তি হিসেবে তাকে শুধুমাত্র বাংলাদেশ ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ করা হয়। জাহানারা বলেন, “আমি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। তারা একটা স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন, মঞ্জুকে শাস্তি দিয়েছেন। কিন্তু, আমি খুশি হতে পারছি না। কারণ, আমার সঙ্গে যা যা হয়েছে, সেই তুলনায় এই শাস্তি খুব সামান্য মনে হয়েছে আমার কাছে।”
চার বছরের মানসিক নির্যাতনের বিবরণ
জাহানারা আলম দাবি করেন যে ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তৌহিদ মাহমুদ এবং মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু—এই দু’জনের কুপ্রস্তাবে তিনি রাজি না হওয়ায় তাদের একটি সহযোগী গ্রুপ তাকে চরম মাত্রার মানসিক নির্যাতন ও আর্থিক ক্ষতির শিকার করেছে। তিনি বলেন, “তৌহিদ মাহমুদ মারা গিয়েছেন। মঞ্জুর সামান্য শাস্তি হয়েছে। কিন্তু, ওই সহযোগী গ্রুপের তো কোনও বিচার হয় নাই, শাস্তিও হয় নাই।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে ২০২৩ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পর একটি ফিক্সিং ইস্যুতে মঞ্জুকে ওমেন্স উইং থেকে বাংলা টাইগার্সে সরিয়ে দেওয়া হয়, কিন্তু তারপরেও সহযোগী গ্রুপ তাকে নির্যাতন চালিয়েছে।
প্রধান তিনটি অনুরোধ
জাহানারা আলম তার পোস্টে তিনটি স্পষ্ট অনুরোধ উত্থাপন করেছেন:
- মঞ্জু ও সহযোগী গ্রুপের বিচার: তিনি মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু এবং তৌহিদ মাহমুদের সহযোগী গ্রুপের কঠোর বিচার দাবি করেছেন, যাতে ভবিষ্যতে অন্য কোনো নারী ক্রিকেটারকে এমন নির্যাতনের শিকার হতে না হয়।
- অন্যান্য ভুক্তভোগীদের বিচার: তিনি ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করেছেন যেন ক্রিকেটসহ অন্যান্য খেলাধুলার নারী ক্রীড়াবিদদের যৌন হয়রানির অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা হয়।
- নিরাপদ পরিবেশ নীতি: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে তিনি ক্রীড়াঙ্গনে, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের জন্য একটি শক্তিশালী নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নীতি প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন।
বিসিবি কর্মকর্তাদের সমালোচনা
জাহানারা আলম ওমেন্স উইংয়ের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাকের বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, “আব্দুর রাজ্জাক ভাই কোনও কিছু যাচাই-বাছাই না করে মন্তব্য করে বসলেন। আমি নাকি বাইরের লোক এবং আমি যা বলেছি সব ভিত্তিহীন।” তিনি আরও যোগ করেন যে রাজ্জাক পরবর্তীতে বলেছেন মঞ্জুকে খুব বড় শাস্তি দেওয়া হয়েছে, যা তিনি অযৌক্তিক মনে করেন। জাহানারা প্রশ্ন তোলেন, “আজকে যদি আপনার বোন, আপনার ওয়াইফ বা আপনার মেয়েরা ক্রিকেট খেলতো এবং তাদের সঙ্গে একই ঘটনা ঘটত তাহলে কি আপনি নোংরা মন্তব্য করতেন?”
অন্যান্য ভুক্তভোগীদের অবস্থা
জাহানারা আলম উল্লেখ করেছেন যে তার মতো আরও অনেক নারী ক্রীড়াবিদ যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন কিন্তু বিচার পাচ্ছেন না। তিনি একটি উদাহরণ দেন: “দুই-তিন বছর আগে আন্ডার এইটিনের একজন ক্রিকেটার আমার এক বোন, সে সেক্সুয়াল হ্যারাজ হওয়ায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে কমপ্লেইন করে। সিইও সুজন স্যার তদন্তের মাধ্যমে সুষ্ঠু বিচার নির্ধারণ করেন এবং ওমেন্স উইংয়ের একজন কর্মকর্তা গিল্টি ফাউন্ড হয়। কিন্তু, আমার ওই বোন আজ পর্যন্ত ক্রিকেটে কামব্যাক করতে পারে নাই।” তিনি বলেন যে অনেক নারী ক্রীড়াবিদ অভিযোগ করায় শাস্তির ভয়ে চুপ করে আছেন, যা একটি বড় সমস্যা।
সাহায্য ও সমর্থনের কথা
জাহানারা আলম ওয়ার্ল্ড ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশন এবং বিসিবির সাবেক সিইও সুজন সাহার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “ওয়ার্ল্ড ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশন আমাকে পূর্ণ সহযোগিতা দেয়। এমনকি, তারা বাংলাদেশের একটি ল ফার্ম মাহবুব অ্যান্ড কোম্পানিকে হায়ার করে এই তদন্ত প্রক্রিয়ায় আমাকে সাপোর্ট করে।” সুজন সাহার সাহায্যের কথাও তিনি স্মরণ করেন, কিন্তু উল্লেখ করেন যে তদন্তের পর তাকে টুর্নামেন্ট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল, যা তার জন্য একটি বড় আঘাত ছিল।
শেষ কথাঃ নিরাপদ ক্রীড়াঙ্গনের দাবি
জাহানারা আলম তার পোস্টের শেষে জোর দিয়েছেন যে ক্রীড়াঙ্গনে নারী ও শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। তিনি বলেন, “ক্রীড়াঙ্গনে বিশেষ করে নারী ও শিশুদের জন্য একটা স্ট্রং সেফেস্ট সেফগার্ডিং পলিসির ব্যবস্থা করে দিন যত দ্রুত সম্ভব। তাহলে আর এই নোংরা মানুষগুলো তাদের মুখ থেকে কুপ্রস্তাব দেওয়া তো দূরে থাক, চোখ তুলে মেয়েদের প্রতি তাকানোরও সাহস পাবে না।” তার এই দাবি ক্রীড়া জগতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং অনেকের সমর্থন পেয়েছে।



