বিশ্বকাপ বিদায়ের যন্ত্রণা: নেইমার-রিচার্লিসনের হৃদয়বিদারক স্বীকারোক্তি
বিশ্বকাপ ফুটবলে জয়ের আশায় খেলতে গিয়ে আগেভাগে বিদায় নেওয়ার যন্ত্রণা কেমন লাগে? ২০২২ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায়ের পর ব্রাজিলের তারকা ফরোয়ার্ড নেইমার ও রিচার্লিসন তাদের হৃদয়বিদারক অনুভূতির কথা প্রকাশ করেছেন। টাইব্রেকারে ক্রোয়েশিয়ার কাছে হারের পর ব্রাজিল দল টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয়, যা দুই খেলোয়াড়ের জন্য গভীর মানসিক আঘাত বয়ে এনেছে।
নেইমারের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া দেখার মতো অনুভূতি
ইউটিউবে সান্তোস সতীর্থদের দেওয়া সাক্ষাৎকারে নেইমার বলেছেন, ‘আমি নিজের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া দেখেছি। সৃষ্টিকর্তার নামে বলছি, আমার তখন এমনই মনে হচ্ছিল। একটা ছোট কক্ষে বসে ছিলাম, আর একের পর এক মানুষ আসছিল। আমার পরিবারের সদস্যরা এল, আরও অনেক মানুষ। সবার চোখ টকটকে লাল, কারও মুখে কোনো কথা নেই...মনে হচ্ছিল আমি কফিনের ভেতরে শুয়ে আছি আর সবাই এসে বলছে, “আরে, তুমি এখনো বেঁচে আছো?” ঠিক এমন অনুভূতিই হচ্ছিল আমার।’ এই বিবৃতি থেকে স্পষ্ট হয়, বিশ্বকাপে বিদায় নেওয়া তার জন্য কতটা কষ্টকর অভিজ্ঞতা ছিল।
রিচার্লিসনের হতাশা ও সংগ্রাম
সেই দলে নেইমারের সতীর্থ হিসেবে ছিলেন রিচার্লিসন, যিনি বিশ্বকাপে সার্বিয়ার বিপক্ষে বাইসাইকেল কিকে অবিশ্বাস্য এক গোল করেছিলেন। কিন্তু হেরে বিদায় নেওয়ার পর তিনি গভীর হতাশায় ডুবে যান। ফ্রান্সের সাময়িকী ‘ফ্রান্স ফুটবল’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রিচার্লিসন বলেন, ‘হতাশায় ডুবে গিয়েছিলাম। সব ধরনের দুর্ভাগ্যই যেন আষ্টেপৃষ্ঠে ধরেছিল আমাকে; টুর্নামেন্ট থেকে বিদায়, এজেন্টের বিশ্বাসঘাতকতা, সেই সঙ্গে যোগ হয়েছিল পারিবারিক ও স্বাস্থ্যগত সমস্যা। দেড় বছর ধরে আমি প্রতিদিন একের পর এক আঘাত সয়ে গেছি। এমন কোনো দিন ছিল না, যেদিন আমাকে নতুন কোনো ধাক্কা সামলাতে হয়নি।’
রিচার্লিসন আরও উল্লেখ করেন, একদিন গাড়ি চালানোর সময় তিনি এমন হতাশায় ছিলেন যে মনে হয়েছিল গাড়িটা দেয়ালে ধাক্কা দিতে পারেন। তিনি বলেন, ‘এখন সেই দিনের কথা মনে পড়লে নিজেকে বলি, কত অর্থহীন চিন্তা ছিল!’ এই সময়টাকে তিনি একটি অতল গহ্বরে তলিয়ে যাওয়ার মতো বলে বর্ণনা করেছেন।
বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যতের আশা
রিচার্লিসন টটেনহাম হটস্পারের হয়ে এ মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৩৮ ম্যাচে মাত্র ১০ গোল করেছেন, যা তার স্বাভাবিক পারফরম্যান্সের চেয়ে কম। ক্লাবটি ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ থেকে অবনমনের শঙ্কায় রয়েছে। ব্রাজিল জাতীয় দলেও তার জায়গা নিশ্চিত নয়, কারণ ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য আগামী ১৮ মে কোচ আনচেলত্তি স্কোয়াড ঘোষণা করবেন। রিচার্লিসন আশা করেন, এই স্কোয়াডে তার জায়গা হবে।
বিশ্বকাপের জন্য প্রস্তুতি ও সিদ্ধান্ত
বিশ্বকাপ দলে থাকলে রিচার্লিসন একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আগেভাগেই নিয়ে রেখেছেন। তার জাতীয় দলের সতীর্থ কাসেমিরোর পরামর্শ অনুযায়ী, তিনি মনোযোগে ব্যাঘাত না ঘটাতে বড় টুর্নামেন্টের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে দূরে থাকবেন। রিচার্লিসন বলেন, ‘সে সঠিক...এবার বিশ্বকাপে থাকলে আমি আমার ফোন বাসায় রেখে যাব।’
আগামী ১১ জুন শুরু হবে বিশ্বকাপ, যার আয়োজক যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা। ব্রাজিল ‘সি’ গ্রুপে মরক্কো, হাইতি ও স্কটল্যান্ডের মুখোমুখি হবে। নিউ জার্সিতে ১৩ জুন মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে তাদের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু হবে। পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল দল নতুন করে জয়ের স্বপ্ন দেখছে, আর নেইমার ও রিচার্লিসনের মতো তারকারা অতীতের ব্যর্থতা কাটিয়ে উঠতে চাইছেন।
এই খেলোয়াড়দের স্বীকারোক্তি শুধু ফুটবলের চাপই নয়, বরং খেলাধুলার সর্বোচ্চ পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্বও তুলে ধরে। তাদের সংগ্রাম ও আশা ভবিষ্যতের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সাফল্যের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করতে পারে।



