২০২৬ বিশ্বকাপ: তিন দেশের যৌথ আয়োজনে ফুটবল উৎসবের অপেক্ষা
ফুটবল বিশ্বকাপের আসন্ন আসর নিয়ে বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে উত্তেজনা ও আলোচনার জোয়ার। এই মহাআয়োজনকে ঘিরে দর্শকদের মধ্যে উন্মাদনা ছড়িয়ে দিতে কিশোর আলোর নিয়মিত আয়োজন ‘বিশ্বকাপের হাওয়া’। বিশ্বকাপ শুরু হতে এখন বাকি মাত্র ৫০ দিন। আজ থেকে প্রতিদিন বিশ্বকাপ নিয়ে নানা দিক তুলে ধরা হবে কিশোর আলোর ওয়েবসাইটে।
ইতিহাস গড়বে তিন আয়োজক দেশ
২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসের প্রথম আসর হিসেবে তিনটি ভিন্ন দেশের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডা একসঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আয়োজন করবে ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’। এর আগে ২০০২ সালে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া যৌথভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন করলেও এবারই প্রথম তিন দেশ মিলে এই মহাআয়োজন পরিচালনা করবে। মেক্সিকোর তপ্ত মরুভূমি থেকে কানাডার বরফাচ্ছন্ন মেরু অঞ্চল পর্যন্ত বিশ্বকাপের ম্যাচ ছড়িয়ে পড়বে উত্তর আমেরিকা জুড়ে। মেক্সিকো ইতিহাস গড়তে যাচ্ছে প্রথম দেশ হিসেবে তিনবার বিশ্বকাপ আয়োজনের গৌরব অর্জন করে (১৯৭০, ১৯৮৬ ও ২০২৬)। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ১৯৯৪ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো আয়োজন করছে এই টুর্নামেন্ট।
ফরম্যাটে বড় পরিবর্তন
এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে ফরম্যাটে। ১৯৯৮ সাল থেকে চলে আসা ৩২ দলের ফরম্যাট বদলে এবার অংশ নেবে ৪৮টি দল। ফিফার অধীনস্থ দলগুলোর এক-চতুর্থাংশ সরাসরি বিশ্বকাপের মূল আসরে খেলার সুযোগ পাবে। ম্যাচের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ৬৪ থেকে ১০৪-এ। ৪৮ দলকে ১২টি গ্রুপে ভাগ করা হবে, যেখানে প্রতিটি গ্রুপে থাকবে চারটি করে দল। গ্রুপ পর্বের সেরা দুটি দল এবং সেরা আটটি তৃতীয় স্থান অধিকারী দল নকআউট পর্বে উন্নীত হবে। গ্রুপ পর্ব থেকে মোট ৩২ দল নকআউট রাউন্ডে খেলার সুযোগ পাবে, যা আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করবে।
প্রযুক্তি ও মাসকটে নতুনত্ব
প্রযুক্তির দিক থেকেও এবারের বিশ্বকাপ এগিয়ে থাকবে। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ব্যবহৃত ‘সেমি-অটোমেটেড অফসাইড’ প্রযুক্তি আরও উন্নত করা হয়েছে। গোললাইন প্রযুক্তি এবং বলের ভেতর সেন্সরসহ নানা উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে এই আসরে। বিশাল আয়োজন সামলাতে ফিফা পুরো টুর্নামেন্টকে তিনটি জোনে (পশ্চিম, মধ্য ও পূর্ব) ভাগ করেছে, যাতে দলগুলোর যাতায়াতের ঝামেলা কম হয়।
এবারের বিশ্বকাপে তিনটি মাসকট উপস্থাপন করা হয়েছে:
- ক্লাচ: একটি আমেরিকান বল্ড ইগল, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করে।
- ম্যাপল: কানাডার জাতীয় প্রাণী মুস, নামকরণ করা হয়েছে কানাডার জাতীয় প্রতীক ম্যাপলপাতা থেকে।
- জায়ু: মেক্সিকোর দক্ষিণাঞ্চলের জঙ্গল থেকে আসা একটি জাগুয়ার।
বিশ্বকাপের বল ‘ত্রিয়োন্দা’ তৈরি করেছে অ্যাডিডাস। স্প্যানিশ শব্দ ‘ত্রিয়োন্দা’ দুটি শব্দের সমন্বয়: ‘ত্রিও’ অর্থ তিন এবং ‘ওন্দা’ অর্থ ঢেউ। লাল, নীল ও সবুজ রং দিয়ে যথাক্রমে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোকে বোঝানো হয়েছে। বলের ডিজাইনে তিন দেশের প্রতীক—কানাডার ম্যাপলপাতা, যুক্তরাষ্ট্রের তারকা ও মেক্সিকোর ইগল—অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আয়োজন নিয়ে বিতর্ক ও চ্যালেঞ্জ
বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়ে বিতর্কেরও শেষ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের মাঠের কৃত্রিম ঘাসের বদলে প্রাকৃতিক ঘাস লাগানো হলেও তা খেলোয়াড়দের জন্য কতটা উপযোগী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে ফাইনাল পর্যন্ত সব ম্যাচ যুক্তরাষ্ট্রে হওয়ায় অন্য দুই আয়োজক দেশ কম প্রাধান্য পাচ্ছে বলে মত দিয়েছেন অনেকে। এছাড়া ফাইনালে হাফ টাইম শো হিসেবে ৪০ মিনিটের গান শোনানো হবে, যা খেলার ছন্দে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মাঠের বাইরেও বিশ্ব পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ইরানের যুদ্ধ ও তেল সংকটের মতো বিষয়গুলো বিশ্বকাপে তাদের অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে খেলোয়াড় ও ভক্তদের ভিসা প্রক্রিয়ায় গড়িমসিও একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
তবে ফুটবলপ্রেমীদের বিশ্বাস, বল মাঠে গড়ালেই সব শঙ্কা কেটে যাবে। মেসি, রোনালদোর মতো তারকাদের শেষ বিশ্বকাপ হিসেবে এই আসর বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। বিশ্বকাপের হাওয়ায় ভাসতে এখন সবাই প্রস্তুত, যেখানে ফুটবলই হয়ে উঠবে মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।



