বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) অ্যাডহক কমিটির সফল অধ্যায় শেষে এবার নির্বাচিত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন জাতীয় দলের সাবেক সফল অধিনায়ক তামিম ইকবাল। মাঠের ক্রিকেট ছাড়ার বছরখানেকের মাথায় এবার ক্রিকেট রাজনীতির শীর্ষ মঞ্চে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করলেন তিনি। বিসিবি নির্বাচনে ক্লাব ক্যাটাগরিতে সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে পরিচালক হওয়ার পর, রোববার (৭ জুন, ২০২৬) নবনির্বাচিত পরিচালকদের গোপন ব্যালট ও সর্বসম্মত ভোটে একক প্রার্থী হিসেবে বিসিবির ১৭তম সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন এই কিংবদন্তি ওপেনার।
পরিচালনা পর্ষদ গঠন
দেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে তামিম ইকবালসহ ক্লাব ক্যাটাগরি থেকে ১২ জন, জেলা ও বিভাগীয় কোটা থেকে ১০ জন, বিভিন্ন শিক্ষা ও বিশেষ সংস্থা (ক্যাটাগরি-৩) থেকে ১ জন পরিচালক নির্বাচিত হয়েছেন। এর পাশাপাশি জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) থেকে ২ জন পরিচালক মনোনীত করা হয়েছে। এই ২৫ সদস্যের নবনির্বাচিত ও শক্তিশালী পরিচালনা পর্ষদই আগামী চার বছর দেশের ক্রিকেটের নীতিনির্ধারণ, উন্নয়ন ও সংস্কারের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবেন।
তামিমের রেকর্ড ভোট
এবারের বিসিবি নির্বাচনে সবচেয়ে আকর্ষণীয় লড়াই হওয়া ক্লাব ক্যাটাগরিতে মোট ৭৪টি ভোটের মধ্যে সর্বোচ্চ ৭৩টি রেকর্ড ভোট পেয়ে পরিচালক নির্বাচিত হন তামিম ইকবাল। তার এই বিশাল বিজয়ের পর বোর্ডের একমাত্র সহ-সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন ঐতিহ্যবাহী আবাহনী লিমিটেডের কাউন্সিলর ফাহিম সিনহা। বিসিবির বর্তমান গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বোর্ডে দুজন সহ-সভাপতি থাকার নিয়ম থাকলেও প্রথম বোর্ড সভার পর তামিম ইকবাল সাংবাদিকদের জানান, পরিচালকদের সর্বসম্মতিক্রমে আপাতত ক্রিকেটীয় কার্যক্রমে গতি আনতে এবং পদের ইগো বা অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এড়াতে একজন সহ-সভাপতি মনোনীত করা হয়েছে; পরবর্তীতে প্রয়োজন সাপেক্ষে আরও একজনকে এই পদে অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। নবনির্বাচিত সহ-সভাপতি ফাহিম সিনহা মূলত দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী ‘একমি গ্রুপ’-এর অন্যতম স্বত্বাধিকারী এবং তিনি এবারের নির্বাচনে ৬৬টি ভোট পেয়ে জয়লাভ করেন। উল্লেখ্য, তিনি তামিমের নেতৃত্বাধীন সর্বশেষ ১১ সদস্যের অ্যাডহক কমিটির অন্যতম সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং এর আগের বোর্ডেও সফলভাবে পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন।
ক্লাব ক্যাটাগরির অন্যান্য বিজয়ী
নির্বাচনে ক্লাব ক্যাটাগরি থেকে যৌথভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৭২টি ভোট পেয়ে চমক দেখিয়েছেন ইসরাফিল খসরু ও সাঈদ ইব্রাহিম আহমেদ, যারা দুজনেই সদ্য বিদায়ী অ্যাডহক কমিটির সদস্য ছিলেন। এর মধ্যে এক্সিউম ক্লাবের কাউন্সিলর ইসরাফিল খসরু হলেন বর্তমান সরকারের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর পুত্র এবং ফেয়ার ফাইটার্স ক্লাবের সাঈদ ইব্রাহিম আহমেদ হলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের পুত্র। তৃতীয় সর্বোচ্চ ৭০ ভোট পেয়ে প্রথমবারের মতো বিসিবি পরিচালক হয়েছেন ঐতিহ্যবাহী মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের কাউন্সিলর ও অভিজ্ঞ ক্রীড়া সংগঠক মাসুদুজ্জামান।
গত ৭ এপ্রিল আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন বিতর্কিত বোর্ড ভেঙে দেওয়ার পর তামিমের অ্যাডহক কমিটিতে যুক্ত হওয়া এবং সাবেক বোর্ড থেকে শেষ মুহূর্তে পদত্যাগ করা দুই তরুণ মুখ মির্জা ইয়াসির মোহাম্মদ ফয়সাল (৬৮ ভোট) ও শানিয়ান তানিম (৬৬ ভোট) এবারও বড় ব্যবধানে পরিচালক নির্বাচিত হয়েছেন। বসুন্ধরা রাইডার্সের কাউন্সিলর ইয়াসিরের পিতা আবুল কালাম কুমিল্লা-৯ আসন থেকে বিএনপির টিকিটে নির্বাচিত সংসদ সদস্য, এবং ঢাকা মেরিনার ইয়াং ক্লাব থেকে আসা শানিয়ান তানিম হলেন বিপিএলের শক্তিশালী ফ্রঞ্চাইজি রংপুর রাইডার্স ও বসুন্ধরা স্ট্রাইকার্সের শীর্ষ কর্মকর্তা। এছাড়া অভিজ্ঞ ক্রীড়া সংগঠক ও অ্যাডহক কমিটির সদস্য রফিকুল ইসলাম ৫৩ ভোট পেয়ে পুনরায় পরিচালক হয়েছেন।
এই ক্যাটাগরি থেকে প্রথমবারের মতো বাজিমাত করেছেন শাইনপুকুর ক্রিকেট ক্লাবের আসিফ রব্বানি (বগুড়া-৫ আসনের এমপি গোলাম সিরাজের ছেলে), আজাদ স্পোর্টিংয়ের ইয়াসির আব্বাস (ঢাকা-১০ আসনের এমপি ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাসের ছেলে), পূর্বাচল ক্রিকেট ক্লাবের সাকিফ আহমেদ (বিশিষ্ট ব্যবসায়ী) এবং ঢাকা ওয়ান্ডারার্সের মাহবুব আহমেদ শামীম, যিনি দেশের চিকিৎসকদের শীর্ষ সংগঠন ড্যাবের একজন প্রভাবশালী কেন্দ্রীয় নেতা।
জেলা ও বিভাগীয় ক্যাটাগরি
জেলা ও বিভাগীয় ক্যাটাগরিতে মোট ১০টি পদের মধ্যে ৭ জন পরিচালক আগেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে গিয়েছিলেন। তবে বাকি আসনগুলোতে তুমুল ভোটযুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়। বরিশাল বিভাগ থেকে বিপিএলের জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি ফরচুন বরিশালের স্বত্বাধিকারী মিজানুর রহমান ৫ ভোট পেয়ে বড় ব্যবধানে ভোলার কাউন্সিলর মুনতাসির আলমকে (১ ভোট) পরাজিত করে পরিচালক হয়েছেন। খুলনা বিভাগের দুটি পরিচালক পদের বিপরীতে ত্রিমুখী লড়াইয়ে খুলনার প্রভাবশালী বিএনপি নেতা শফিকুল আলম ও যশোরের তরুণ নেতা ও দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের সহোদর শান্তনু ইসলাম ১০টি করে ভোট পেয়ে বিজয়ী হন; যেখানে চুয়াডাঙ্গার কাউন্সিলর আব্দুছ ছালাম পান মাত্র ২ ভোট।
বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া ঢাকা বিভাগের দুই পরিচালকের মধ্যে সাঈদ বিন জামান বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাতের পুত্র এবং অন্যজন আবদুল্লাহ আল ফুয়াদ, যিনি আগেও বিসিবি পরিচালক ছিলেন। চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে নির্বাচিত দুই পরিচালকের মধ্যে মিনহাজুল আবেদীন নান্নু জাতীয় দলের সাবেক সফল অধিনায়ক ও প্রধান নির্বাচক এবং অন্যজন লক্ষ্মীপুরের কাউন্সিলর মঈন উদ্দিন চৌধুরী, যিনি বর্তমান সরকারের পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানির আপন চাচা। এছাড়া রংপুর বিভাগ থেকে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ছোট ভাই ফয়সল আমীন, রাজশাহী থেকে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর পুত্র মীর শাকরুল আলম এবং সিলেট থেকে সিলেট সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রশাসক ও সাবেক পরিচালক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী পরিচালক নির্বাচিত হয়েছেন।
ক্যাটাগরি-৩ ও এনএসসি মনোনীত
ক্রিকেটের অন্যান্য খাত ও শিক্ষা সংস্থা সংবলিত ক্যাটাগরি-৩ থেকে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সরাসরি পরিচালক নির্বাচিত হয়েছেন দেশের প্রবীণ ও অভিজ্ঞ ক্রীড়া সংগঠক সিরাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর, যিনি পূর্বের বিভিন্ন বোর্ডেও সফলতার সাথে কাজ করেছেন। এ ছাড়া জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) এর বিশেষ কোটায় সরকারিভাবে মনোনীত হয়ে বোর্ডে যুক্ত হওয়া দুজন নতুন পরিচালক হলেন বাগেরহাটের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী শেখ মোহাম্মদ রুহুল আমিন এবং ঐতিহ্যবাহী আরাফাত রহমান কোকো মেমোরিয়াল ট্রাস্টের সম্মানিত কোঅর্ডিনেটর সরফরাজ আহমেদ, যাঁর পৈতৃক নিবাস সিলেটের মৌলভীবাজারে।



